নির্বাসিত জীবনের সেই দুঃসহ দিনগুলি

769

Published on মে 18, 2023
  • Details Image

জাকির হোসেন:

পাকিস্তান-মার্কিন চক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার যে ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি করেছিল, এর বাইরে ছিলেন না তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ওই সময় তারা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ওইদিন তারা ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পেলেও বিদেশে তাদের হত্যা করতে চক্রান্তকারীদের ‘প্ল্যানিং সেল’ ছিল বেশ তৎপর। কিন্তু ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ায় তাদের সেই মিশন সফল হয়নি। শ্রীমতী গান্ধীর নির্দেশনা মোতাবেক নির্বাসিত জীবনেও শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলতে হয়েছে। ফলে সব হারানোর বেদনা, আর্থিক অনটন, নিঃসঙ্গতা, দেশ ও দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার বঞ্চনাসহ নানা অস্বস্তি ও বিড়ম্বনার মধ্যে কেটেছে শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর স্বামী, সন্তান ও ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে নয়াদিল্লিতে কাটান।

১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর জিয়াউর রহমান তাকে দেশে ফিরতে দেননি, এ কথা তিনি বহুবার বলেছেন—‘১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আমাদের বিদেশের মাটিতেই পড়ে থাকতে হয়। খুনি জিয়া আমাকে ও আমার বোন শেখ রেহানাকে দেশে আসতে দেয়নি।’

এম ওয়াজেদ মিয়ার গবেষণার কারণে পঁচাত্তরের ৩০ জুলাই জার্মানিতে যান শেখ হাসিনা; তার সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও সেখানে যান বেড়াতে। ১৫ আগস্ট তারা সবাই ছিলেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়। এদিন সকালে তাদের প্যারিস যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন (১৪ আগস্ট) গাড়ির দরজায় ড. ওয়াজেদ মিয়ার হাতে চাপা লাগে, ফলে তারা ওই অবস্থায় প্যারিসে যাবেন কি না, এ নিয়ে ভাবছিলেন।

১৫ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে ওয়াজেদ মিয়ার ঘুম ভাঙে সানাউল হকের স্ত্রীর ডাকে। জার্মানির বন থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী ফোন করেছেন, তিনি জরুরি কথা বলতে চান ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য ওয়াজেদ মিয়া স্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঠিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর শেখ হাসিনা ফিরে এসে জানান, হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চান। টেলিফোন ধরতে ওয়াজেদ মিয়া দ্রুত নিচে নামেন। তখন সেখানে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় মাথা নিচু করে পায়চারি করছেন সানাউল হক। ওয়াজেদ মিয়া ফোন ধরতেই অন্যপ্রান্ত থেকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘আজ ভোরে বাংলাদেশে ক্যু-দে-টা হয়ে গেছে। আপনারা প্যারিস যাবেন না। রেহানা ও হাসিনাকে এ কথা জানাবেন না। যত দ্রুত সম্ভব আপনারা সবাই আমার এখানে চলে আসুন।’

সানাউল হক যখন শুনলেন ঢাকায় সেনা বিদ্রোহ হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, সেই মুহূর্তে থেকেই তিনি শেখ হাসিনা, রেহানা এবং ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বৈরী আচরণ শুরু করেন এবং কোনো প্রকার সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সবাইকে যত দ্রুত সম্ভব বাসা থেকে চলে যেতে বলেন। বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য গাড়িটা পর্যন্ত দিতে অস্বীকৃতি জানান। যদিও বঙ্গবন্ধু এই সানাউল হককে রাজনৈতিক বিবেচনায় বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পর ওয়াজেদ মিয়া যখন বাসার ওপরে যান তখন শেখ হাসিনা অশ্রুজড়িত কণ্ঠে ওয়াজেদ মিয়ার কাছে জানতে চান রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে তার কী কথা হয়েছে। ওয়াজেদ মিয়া জানান, রাষ্ট্রদূত চৌধুরী তাদের প্যারিস যাত্রা বাতিল করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জার্মানির বনে ফিরে যেতে বলেছেন। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা—দুজনই কাঁদতে কাঁদতে বলেন, নিশ্চয়ই কোনো দুঃসংবাদ আছে যেটি ওয়াজেদ মিয়া তাদের বলতে চাইছেন না। আর তখন তারা দুজন বলেন, প্যারিসের যাত্রা বাতিল করার কারণ পরিষ্কারভাবে না বললে তারা বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না। বাধ্য হয়ে ওয়াজেদ মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশে কী একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে, এ জন্য আমাদের প্যারিস যাওয়া যুক্তিসংগত হবে না।’ এ কথা শুনে তারা দুই বোন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের কান্নার শব্দে জয় ও পুতুলের ঘুম ভেঙে যায়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা ব্রাসেলস ছেড়ে জার্মানির বনের উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর বাসায় গিয়ে পৌঁছান। বিকেলে ড্রইংরুমে বসে হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী এবং ওয়াজেদ মিয়া উৎকণ্ঠিত অবস্থায় বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও অন্যান্য রেডিও স্টেশন থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন।

এরই এক ফাঁকে হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীকে ঘরের বাইরে নিয়ে ওয়াজেদ মিয়া ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে কোনো কিছু জানানো হবে না, এ শর্তে হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী ওয়াজেদ মিয়াকে বলেন, ‘বিবিসির এক ভাষ্যানুসারে রাসেল ও বেগম মুজিব ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই এবং ঢাকাস্থ ব্রিটিশ মিশন কর্তৃক প্রচারিত এক বিবরণীতে বলা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ বেঁচে নেই।’

২৩ আগস্ট সকালে ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তা ওয়াজেদ মিয়াকে টেলিফোন করে জানান, ভারতীয় দূতাবাসের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারি কার্লসরুয়েতে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন। সেদিন দুপুর ২টার দিকে ওই কর্মকর্তা ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে দেখা করে বলেন, পরের দিন অর্থাৎ ২৪ আগস্ট সকাল ৯টায় তাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা ২৪ আগস্ট তাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তবে তাদের গন্তব্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে ২৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছান শেখ রেহানা, শেখ হাসিনা, ওয়াজেদ মিয়া এবং তাদের দুই সন্তান জয় ও পুতুল। বিমানবন্দরে নামার পর তাদের প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। মন্ত্রিপরিষদের একজন যুগ্ম সচিব তাদের স্বাগত জানান। তাদের প্রথমে ৫৬ নম্বর রিং রোডের একটি ‘সেফ হাউস’-এ রাখা হয়। পরে ডিফেন্স কলোনির একটি বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বাসায় ছিল একটি ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুম এবং দুটি বেডরুম। ওই বাড়ির বাইরে না যাওয়া, সেখানকার কারও কাছে তাদের পরিচয় না দেওয়া এবং দিল্লির কারও সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা—ভারতের কর্মকর্তারা তাদের এ তিনটি পরামর্শ দেন। জরুরি অবস্থার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনো খবরাখবর ভারতের পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে না। কাজেই তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

১০ দিন পর, ৪ সেপ্টেম্বর, ভারতের গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’-এর একজন কর্মকর্তা তাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসায় (১ নম্বর সফদরজং রোড) পৌঁছান। ইন্দিরা গান্ধীকে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করেন, ‘১৫ আগস্ট ঠিক কী হয়েছিল?’ সেখানে উপস্থিত একজন অফিসার শেখ হাসিনাকে বলেন, তার পরিবারের আর কেউ জীবিত নেই। এটা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শেখ হাসিনা।

ইন্দিরা গান্ধী হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রীমতী গান্ধী বলেন, ‘তোমার যা ক্ষতি হয়েছে, তা তো পূরণ করা যাবে না। তোমার তো এক ছেলে, এক মেয়ে আছে। আজ থেকে ছেলেকে নিজের বাবা আর মেয়েকে নিজের মা বলে মনে কোরো।’

শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবনে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং তার পরিবার শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। জয় ও পুতুলকে মাঝেমধ্যেই প্রণব মুখার্জির সরকারি বাসভবনে খেলতে দেখা যেত। নিজের বই ‘ড্রামাটিক ডিকেড’-এ প্রণব মুখার্জি স্মৃতিচারণ করেছেন যে, দুটি পরিবারের মধ্যে মাঝেমধ্যে শুধু দেখাই হতো না, দিল্লির বাইরে পিকনিকেও যাওয়া হতো।

এরই মধ্যে ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী হেরে যান। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ‘র’-এর কাজকর্মে খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। রেহানাকে দিল্লিতে নিয়ে আসার ব্যাপারে কথা বলার জন্য শেখ হাসিনা এবং ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। মোরারজি দেশাই রেহানাকে দিল্লি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে দেন। রেহানা ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লি আসেন। পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে শেখ হাসিনার সঙ্গেই ছিলেন। তবে ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা থেকে হাত গোটাতে শুরু করেন মোরারজি দেশাই। সেই সঙ্গে ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনার ওপর একরকম চাপ তৈরি করা হয়, যাতে তারা নিজেরাই ভারত ছেড়ে চলে যান। প্রথমে তাদের ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল দেওয়া বন্ধ করা হয়। তারপর গাড়ির ব্যবস্থাও তুলে নেওয়া হয়। ডক্টর ওয়াজেদ নিজের ফেলোশিপটা এক বছর বাড়ানোর আবেদন করেন। প্রায় তিন মাস এর কোনো জবাব আসেনি। সে কারণে তাকে বেশ আর্থিক সমস্যায়ও পড়তে হয়। শেষমেশ মোরারজি দেশাই অবশ্য ঠিক এক বছরের জন্য তার ফেলোশিপ বাড়ানোর অনুমতি দেন। তবে ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। সেইসঙ্গে শেষ হয় শেখ হাসিনার সব দুশ্চিন্তা। ওই বছর আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে দিল্লিতে যান, অনুরোধ করেন তাকে ঢাকায় ফিরে আসার জন্য। ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া অবশ্য চাইছিলেন না যে শেখ হাসিনা ঢাকা ফিরে আসুক। তিনি মনে করতেন, শেখ হাসিনার সরাসরি রাজনীতিতে আসা উচিত নয়।

তবে শেষমেশ ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা আবদুস সামাদ আজাদ ও কোরবান আলী ঢাকা আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানাতে সেদিন হাজির হন। পরের বছর, ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেওয়ার আবেদন জানান। মহাখালীতে দুই কামরার একটা ফ্ল্যাট বরাদ্দ করেছিল পরমাণু শক্তি কমিশন। শেখ হাসিনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বামীর সঙ্গে থাকতেন।

লেখক: সাংবাদিক

সৌজন্যেঃ কালবেলা

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত