শেখ হাসিনার কারাবরণ দিবস: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

279

Published on জুলাই 16, 2022
  • Details Image

এম নজরুল ইসলামঃ 

বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোয় মাখা দিন যেমন আছে, তেমনি আছে অনেক কালো দিন। কালো দিন শুধু বলি কেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আসতে হয়েছে আজকের বাংলাদেশকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সূর্য এক উদ্ভাসিত নতুন দিনের সূচনা করেছিল। আবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সূর্যটা কেউ যেন ঢেকে দিয়েছিল। এরপর তো ২১ বছরের অন্ধকার।

এমনি আরেক অন্ধকার নেমে এসেছিল ২০০৭ সালে। চেপে বসেছিল দুঃশাসন, গালভরা নাম নিয়ে। এর আগের বাংলাদেশবিরোধী জামায়াতি-জাতীয়তাবাদী জোট অপশাসন রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলে। আর সেই সুযোগেই চেপে বসে তত্ত্বাবধায়ক নামের নতুন এক দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থা।


চেপে বসা শাসকদের চাপে পিষ্ট তখন গণতন্ত্র। রাজনীতি যেন ছিল গর্হিত অপরাধ। রাজনীতিক পরিচয় দিতেও অনেকে কুণ্ঠিত। চার বছরের জোট অপশাসনের পর চেপে বসা শাসককূল তখন রীতমতো ত্রাস। রাতারাতি সবকিছু বদলে ফেলার আভাস দেওয়া হচ্ছে। রাজনীতি থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার কথা তখন এমন করে বলা হচ্ছে, যেন রাজনীতি এক গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশকে সত্যিকার অর্থেই দুর্যোগের মেঘে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ওয়ান-ইলেভেন নামের পট পরিবর্তনের পর সরকার পরিচালনায় আসা এই সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়।

সেই গ্রেফতার-নাটক দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরাপত্তারক্ষীদের অপ্রয়োজনীয় অথচ অতিনাটকীয়তায় ‘সেই বার্তা’ রটে যেতে সময় লাগেনি। ঢাকায় তখন রাত পৌনে ৪টা। যৌথ বাহিনী ঘিরে ফেলল সুধা সদন- জননেত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন। অপ্রত্যাশিত এক ঘটনার খবরে আশপাশের বাড়িঘরের জানালা খুলতে থাকল একটা একটা করে। টেলিভিশন খুলতেই সবাই দেখতে পেল সেই দৃশ্য।

সেদিনের স্মৃতি আজও অম্লান। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় তখন মধ্যরাত। হঠাৎ সেল ফোনটা বেজে উঠল। কানে দিতেই ভেসে এলো আওয়ামী লীগের তৎকালীন পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কণ্ঠস্বর। তিনি জানালেন, ‘এইমাত্র আপাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।’ এটুকু বলেই ছেড়ে দিলেন তিনি। মাত্র একটি বাক্যেই কথা শেষ। আমি বিস্মিত, বিমূঢ়। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তখনই ফোন করলাম লেখক-সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীকে (প্রয়াত)। তিনি বললেন, ‘শেখ হাসিনাকে সুধা সদন থেকে কোর্টে নিয়ে যাওয়াটা টিভিতে লাইভ দেখছি, এই মুহূর্তে তাঁকে নিয়ে যৌথ বাহিনীর গাড়িবহর নবাবপুর রোড দিয়ে কোর্টের দিকে যাচ্ছে।

সিদ্ধান্ত নিতে একটুও বিলম্ব করিনি। সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও অনুসারীদের ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে নেত্রীর গ্রেফতারের খবর দিতে থাকি। স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় স্টার্ড পার্কে শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করি।

ফোন করি লন্ডনে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা আপাকে। ফোনের ওপারে তাঁর কণ্ঠেও হতাশা। আমি আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাই তাঁকে। তিনি আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের পরামর্শ দেন। সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি অনিল দাশ গুপ্ত, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের তৎকালীন অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করি।

অস্ট্রিয়া সময় সকাল ৮টায় বিপুলসংখ্যক বাঙালি নারী-পুরুষ উপস্থিত হন বিক্ষোভ সমাবেশে। অস্ট্রিয়া প্রবাসী সর্বস্তরের বাঙালিদের নিয়ে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। নেত্রী গ্রেফতারের পর থেকে তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রতি মাসে ভিয়েনায় চারটি করে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়ে আসছিল। আমরা গণস্বাক্ষর, অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্টের সামনে মানববন্ধন, গণ-অনশন কর্মসূচিও পালন করেছি।

দেশের মানুষের দাবির মুখে ২০০৮ সালের জুন মাসে তিনি মুক্তি পেলেন। আর, একই বছর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে তো পাল্টে গেল পুরো চালচিত্র। বিপুলভাবে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা বিপন্ন এবং বিপদাপন্ন দেশকে বাঁচালেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের আপামর দুঃখী জনসাধারণের নেতা, তাঁর পরিবারকে সমূলে উৎপাটনের ষড়যন্ত্র আজকের নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগ থেকেই চলছে। সাহসী রাজনীতির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলে দেওয়ার কী কুৎসিত-নির্মম ও ভয়াবহ চক্রান্তই না করেছিল প্রতিক্রিয়াশীল চক্র-রাজনৈতিক নিষ্ঠুর প্রতিহিংসাপরায়ণতার সেই চক্রান্তের জাল ক্রমেই বিছিয়েছে গোপনে! শুধু কী তাই, চেষ্টা করেছে সংকীর্ণ রাজনীতির হীনমন্যতার ছদ্মাবরণে তাঁর ভাবমূর্তিকে নস্যাৎ করতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ষড়যন্ত্রকারী চক্র দীর্ঘদিন থেকেই এই ঘৃণ্য কাজে সক্রিয়। সেই চক্রই চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। কিন্তু জনগণের ভালবাসায় চক্রটি সফল হতে পারেনি।

আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী কোনো দেশ পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়।

বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয় এবং মাছ-মাংস, ডিম, শাক-সবজি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুবিধা আজ শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি-নির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ- এই পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার দিনও সামনে আসছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হয়েছে। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মিত হচ্ছে।

২০০৭ সালের চেপে বসা শাসকরা পরিকল্পিত ব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা কিনা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও বিশ্বাসের সঞ্চার করেছিল। স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওয়াদা করেই তো তারা এসেছিল এবং দুর্নীতি, ঘুষ, কালোটাকা, মাস্তানি উৎখাতের অঙ্গীকার করেছিল। ফলে জরুরি আইন জারির মাধ্যমে শুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ ভোটার লিস্ট প্রণয়ন আর ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নির্মাণের কাজগুলো নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে চাইল। ঘোষণা দিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা ও সংস্কার সাধন করতে হবে। শুরু হলো রাজনীতি ও ব্যবসায় দুর্নীতিবাজদের পাকড়াও করা।

ক্ষমতাদম্ভে উন্মাদ, রাজনীতির দলীয় পদ দখল করা অনভিজ্ঞ যুবক, বেশুমার অপকীর্তির নায়কদের ধরপাকড় করা হলো। সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতি সচেতন জনগণ পর্যন্ত সবার মধ্যেই সরকার আস্থার সঞ্চার করেছিল। এমন কি আওয়ামী লীগের অনেকেই গ্রেফতার হলেও জনগণ ভেবেছিল যদি চাঁদাবাজি, ঘুষ নেওয়া কিংবা এমন কোনো অপরাধের সঙ্গে সত্যিই গ্রেফতারকৃতরা জড়িত থেকে থাকেন, তাহলে তাঁদের সুষ্ঠু বিচার হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু অযথা হয়রানি যেন না হয় কেউ। বিএনপির বহুজনই গ্রেফতার হলেন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য। কিন্তু মানুষকে তাজ্জব করে ঐ চেপে বসা সরকার জামায়াতের কাউকেই গ্রেফতার করেনি। এসব কি কোনো চক্রান্তের অংশ ছিল? সেই চক্রান্ত কি আজো চলছে? আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে কি নিরন্তর ষড়যন্ত্র করছে কোনো গণবিরোধী চক্র? দেশটিকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৎপর। ঘাপটি মেরে আছে রাজনৈতিক অপশক্তিও। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সম্মিলিত প্রয়াস।

শেখ হাসিনার পরিচিতি আজ বিশ্বজুড়ে। বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি দুবাহু প্রসারিত করে লড়াই করছেন। বাংলাদেশে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার অশুভ উদ্দেশ্যে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আজ তিনি নিজেই একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের নতুন যুগের সূচনা হয়েছে তাঁর হাত ধরে। আজ তিনি নিজেই একটি যুগ। হাসিনা যুগের প্রতীক হয়ে পদ্মার বুকে গড়ে উঠেছে এ যুগের বিস্ময় পদ্মা সেতু।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। কেবল জনগণই পারে এই কাজটি করতে। যেমন ১৬ জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা সকাল মানুষকে হতোদ্যম করতে পারেনি, তেমনি সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে বাংলার মানুষ সবসময় থাকবে জননেত্রী শেখ হাসিনার পাশে। তিনিও তো সবসময় আছেন জনগণের পাশে, তাদের দুঃখ-সুখের অংশীদার হয়ে।
জনগণের জয় হোক। নতুন মন্ত্রে উজ্জীবিত হোক বাঙালি। জয়তু শেখ হাসিনা।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক
সৌজন্যেঃ সময় নিউজ 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত