আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম: শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার উপাখ্যান

315

Published on জুন 22, 2022
  • Details Image

সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গত বছর (২০২১ সালে) স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছে বাংলাদেশ। মহান বিজয়ের ৫০ বছর পেরিয়ে গত ২৬ মার্চ (২০২২) স্বাধীনতার ৫১তম বার্ষিকী উদযাপন করেছি আমরা, বিজয়ের ৫১তম (১৬ ডিসেম্বর, ২০২২) বার্ষিকী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এখন স্যালুট পাচ্ছে বাঙালি জাতি। অথচ দেড় যুগ আগেও উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে  আমাদে। কিন্তু মাত্র এক যুগে সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। কারণ, সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রদর্শন এবং কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ প্রধান- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডিজিটাল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত এই নতুন মানবিক বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু এতো অল্প সময়ে একটি জাতির গতিপথ কীভাবে বদলে গেলো? অনেকেরই প্রশ্ন এটি। তবে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্র-নেতারা বাংলাদেশের এই অবিশ্বাস্য বিবর্তনের কারণ হিসেবে শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার কথাই উল্লেখ করছেন। এদিকে আজকের বাংলাদেশে উত্তরণের কারণ হিসেবে নিজের লেখা নিবন্ধেও তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমেই তিনি বলেছেন- বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ গড়ার আদর্শিক প্রচেষ্টার কথা, যার ওপর ভিত্তি করেই দ্বিতীয় ধাপে জনগণের সাতটি মৌলিক চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা ও শ্রমের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। একইসঙ্গে তৃতীয় ধাপে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবনের জন্য দেশকে প্রস্তুত করতে আরো সাতটি মহাকর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উদ্যোগের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দেখানো সুপরিকল্পিত পথেই এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় স্বদেশ। 

এদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে গণমানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে পদ্মা সেতুর মতো দুঃসাধ্য নির্মাণকাজও সফলভাবে সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও অদম্য সাহসের কারণে। যার ফলে সারা বিশ্বে আজ মর্যাদাবান ও সক্ষম জাতি হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-অমাবশ্যার অন্ধকার দূর করে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আলো ঝলমলে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুই এখন শিক্ষামুখী। অবকাঠামো নির্মাণ ও ইন্টারনেটের সুবাদে প্রতিটি এলাকাতেই কর্মসংস্থান হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের। শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর থাকায় আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে গড়ে উঠতে শুরু করেছে একটি সুস্থ-সবল নতুন প্রজন্ম। এছাড়াও সার্বজনীন পেনশনের চালু হওয়ার কারণে প্রতিটি মানুষের বৃদ্ধ বয়সের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন শেখ হাসিনা, যার রাষ্ট্রদর্শন ও উন্নয়নের মূল কথাই হলো মানবকল্যাণ। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়োপযুগী ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে করোনা মহামারির মতো দুর্যোগেও ভেঙে পড়েনি দেশের অর্থনীতি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনা মতো সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে সরকার, ইতোমধ্যে দেশের অন্তত ২৪ শতাংশ মানুষ এসব কর্মসূচির আওতায় বহুমুখী রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন। ১৯৯১ সালে যেখানে দারিদ্রের হার ছিল ৫৬ শতাংশের বেশি, একবেলা খেয়ে থাকতে হতো দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে, সেখানে দেশের একটি মানুষকেও আর না খেয়ে থাকতে হচ্ছে না। শেখ হাসিনার স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণেই আজ ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তি ঘটেছে বাঙালি জাতির। আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করার মাধ্যমে হতদরিদ্রদের জন্য ভূমি ও ঘর করে দেওয়া হচ্ছে, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম করে তোলা হচ্ছে ছিন্নমূলদের, নিজের আয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কৃষক-শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের মানুষদের কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে বিনাসুদে বা স্বল্পসুদে ঋণ।

শেখ হাসিনার টেকসই দারিদ্র বিমোচন মডেলের মূল কথাই হলো: প্রতিটি মানুষের থাকার জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা, এরপর তাদের জন্য কাজের ক্ষেত্র ও পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে তারা পরিশ্রম করে নিজেদের রোজগার উপার্জন করতে পারে, তথা প্রান্তিক মানুষদের স্বাবলম্বী করে তোলা। দেশকে সামগ্রিকভাবে উন্নত করতে হলে, গ্রামের মানুষের উন্নয়ন করতে হবে- আওয়ামী লীগের উন্নয়নের নীতি এটা। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু গণমানুষের জীবনমান উন্নতির জন্য যে সংগ্রাম করে গেছেন, তা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে শেখ হাসিনার কারণে। এক যুগ আগের অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে আজকের স্বনির্ভর বাংলাদেশে উত্তরণের মূলমন্ত্রই এটা। একারণেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে এতো কম সময়ের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। স্বপ্নের সোনার বাংলার লক্ষ্য অর্জন শেসে এখন ডিজিটাল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে প্রিয় স্বদেশ। এখন ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এক কাতারে চলার জন্য ধাবমান হচ্ছি আমরা।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম:

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার পর দুর্যোগ নেমে আসে বাঙালি জাতির ভাগ্যে। গণগ্রেফতার ও দমনপীড়ন চলতে থাকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর, হত্যা করা হয় হাজার হাজার সদস্যকে। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেও কিংকর্তব্যবিমুঢ় করে দেওয়া হয় মহান মৃক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ওঁত পেতে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী মোশতাক চক্র খুবলে খেতে শুরু করে সদ্য স্বাধীন শিশু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে। এরপর নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে খুনি জিয়াউর রহমান এবং স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদ, দেশের সরলপ্রাণ মানুষদের ধোঁকা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদের বিষবাস্প ছড়ায় তারা। মানবিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে শুরু হয় জঙ্গিবাদের উত্থান। স্বৈরশাসকদের শোষণ ও অপশাসনে অতিষ্ট জনগণ মুক্তির জন্য হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। এরকম একটি চরম ক্রান্তিকালে বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

দীর্ঘ ছয় বছরের নির্বাসন জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এর আগে দল বাঁচানোর স্বার্থে ও জনতার দাবির মুখে (ফেব্রুয়ারি মাসের কাউন্সিলে) শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় তাকে। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী ছয় বছরে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস ও প্রেরণা পায়। বৃষ্টিমুখর সেই জ্যৈষ্ঠের দিনে ঢাকার রাস্তায় ঝুম ভেজা হয়ে লাখ লাখ মানুষ অভ্যর্থনা জানান শেখ হাসিনাকে। 'জয় বাংলা' স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বাংলা। স্বজন হারানোর বেদনা বুকে চেপে দেশের মাটিতে পা রেখেই বাঙলার গণমানুষকে নিজের স্বজন হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। অকৃত্রিম ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বুকে টেনে নেয় আপামর বাঙালি। একই সঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বৈরাচার ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথেই স্বাধীন বাংলার মাটিতে আবারো নবজীবন লাভ করে আওয়ামী লীগ। এরপর কয়েক বছর ধরে সারা দেশের প্রতিটি প্রান্ত ঘুরে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব জীবনচিত্র উপলব্ধি করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, একই সঙ্গে বহুমুখী প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নতুনভাবে সুসংগঠিত করে তোলেন পিতা মুজেবর হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগকে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নব্বইয়ের দশকে তীব্র স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন গড়ে ওঠে দেশে। এসময় একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয় শেখ হাসিনাকে, প্রাণ ঝরে শতাধিক নেতা-কর্মীর। কিন্তু বুলেট-বোমার ভয়ে দমে যাননি তিনি, বরং জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরো জোরদার করেন। ফলশ্রুতিতে পতন ঘটে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার। কিন্তু সুক্ষ্ম কারচুপি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কারণে সংখ্যায় বেশি ভোট পেয়েও আসন সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা না পেলেও, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তখন আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে বিরোধী দলের আসনে বসে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন শেখ হাসিনা। ফলে বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র বাস্তবায়নে বাধ্য হন খালেদা জিয়া। এরপর ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জনগণকে নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার সামাজিক আন্দোলনে নামেন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা।

রাজপথে শেখ হাসিনার সাহস ও জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার সরকার। একারণে স্বৈরাচার জিয়াউর রহমানের লোক দেখানো ভোটের স্টাইলে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি নাটকীয় ভোট করে জোর করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে বিএনপি। কিন্তু আবারো তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ভোট ব্যবস্থাপনার ইতিহাসকে স্বামী জিয়াউর রহমানের মতোই আরো একবার কলঙ্কিত করেন তিনি। এরপর জুন মাসের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। অদম্য শেখ হাসিনার হাত ধরে দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেই কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই (১৯৯৯ সালে) খাদ্য উৎপাদনে প্রথমবারের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ১৯৯৭ সালে দেশের পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের জন্য সম্পাদন করেন পার্বত্য শান্তিচুক্তি। সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালেই নিশ্চিত করেন গঙ্গা নাদীর পানির ন্যায্য হিস্যা। এছাড়াও সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিঃস্বার্থ সেবাদানের কারণে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলার মডেলে পরিণত করেন বাংলাদেশকে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ববাসীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয় শেখ হাসিনার কারণেই। সব হারানোর ব্যথা নিয়ে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগকে নবজীবন দানের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশকেই আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর হাতে আওয়ামী লীগের প্রথম পুনর্জীবন এবং রাজনীতিতে শেখ হাসিনার হাতেখড়ি:   

বাঙালি জাতির যাত্রাপথ যেমন সহজ ছিল না কখনোই, তেমনি আওয়ামী লীগের পথচলাও ছিল সবসময় দুর্গম। দেশভাগের পর বাঙালি জাতির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে যখন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হলো, তখন সারা দেশ চষে বেড়িয়ে দলকে গণমানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান। দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের পোস্টারে  পরিণত হন তিনি। ফলে পাকিস্তানিরা তার ওপর জেল-জুলুম-নির্যাতন চালাতে থাকে। তবুও কখনোই দমে যাননি তিনি। এমনকি ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের মহাবিজয়ের পর আওয়ামী লীগকে নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানিরা। যার ফলে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়। মূল উদ্দেশ্য গণমানুষের দলে পরিণত হওয়া আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে দেওয়া। একারণে রাজনীতি নিষিদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে আবারো আটক করা হয় আওয়ামী লীগের মধ্যমণি শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বর্ষীয়ান নেতারা এসময় স্বৈরাচার আইয়ুব খানের চাপে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার মুচলেকা দিতে বাধ্য হন। এরপর মূলত ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবকে কখনো জেলে, কখনো গৃহবন্দি, কখনো এক মামলা থেকে থেকে মুক্তি দিয়ে আরেক মামলায় গ্রেফতার করে জান্তারা। ফলে এই দীর্ঘ সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে দলীয় কার্যক্রম।

তবে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি নিজের বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠক ডাকেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় আয়োজিত কেন্দ্রীয় নেতাদের সেই বৈঠকে আবারো আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবিত করার ঘোষণা দেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে তেজস্বী পুরুষ শেখ মুজিবের হাত ধরে আবারো রাজপথে নেমে আসে আওয়ামী লীগ। এরপর সারা দেশের প্রতিটি প্রান্তে সফর করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে তোলেন তিনি। স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে শেখ মুজিবের সাহসী নেতৃত্বে। ফলে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানি জান্তারা আবারো জেলে নেয় তাকে। বের হওয়ার পর ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আয়োজিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে 'আমাদের বাঁচার দাবি' শিরোনামে 'ছয় দফা' পেশ করেন তিনি। এই দাবির সমর্থনে গণজোয়ার সৃষ্টি হয় বাংলার মাটিতে।

এই তীব্র গণজোয়ারের মধ্যেই উপমহাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফার প্রচারে তিন মাসে ৩২টি জনসভা করার পর, ৮ মে চূড়ান্তভাবে গ্রেফতার করা হয় তাকে। ৭ জুন ছয় দফার সমর্থনে এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে। শেখ মুজিব, ছয় দফা, আওয়ামী লীগ ও বাঙালির অধিকার- একে অপরের পরিপূরক হয়ে যায় এসময়।

বঙ্গবন্ধু যে সময়টায় আওয়ামী লীগের পুনর্জীবন, ছয় দফা ঘোষণা ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত সময় পার করছেন; ঠিক এই দশক জুড়েই ছাত্র রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার। আজিম গার্লস স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা এবং উচ্চমাধ্যমিকে বকশীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা কলেজ)-থেকে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এরপর ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সক্রিয়ভাবে ছয়-দফার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং মুক্তি সংগ্রামের শেখ হাসিনার উপস্থিতি:   

এর আগে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই বাঙালি জাতির প্রতি পাকিস্তানিদের ঘৃণ্য মনোভাব আঁচ করতে পারেন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরপর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রভাবশালী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানি জান্তারা। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ১৫ মার্চ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। এরপর ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তিনি। সেখানে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেওয়ার পর অ্যাসেম্বলি ঘেরাওয়ের জন্য সবাইকে নিয়ে অগ্রসর হন। পরবর্তীতে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের মতো বর্ষীয়ান নেতাও শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মিছিলে যোগ দিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলন দমানোর জন্য ১১ সেপ্টেম্বর আবারো শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে অল্প দিনের জন্য ছাড়া পেলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকারের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলার কারণ দেখিয়ে ১৯ এপ্রিল তাকে আবারো জেলে ঢোকায় পাকিস্তানিরা। মূলত ভাষা আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার জন্যই তারুণ্যের প্রতীকে পরিণত হওয়া শেখ মুজিবকে বারবার জেলে ঢোকানো হয়। তবে কারাবন্দি অবস্থাতেই ১৯৪৯ সালের জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক হন তিনি। কারামুক্ত হয়ে, ২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে ছাত্রলীগের প্রকাশ্য সম্মেলনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং পাকিস্তানের নৌবাহিনীর সদরদফতর করাচি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরের দাবি জানান তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

পরবর্তীতে, ছয় দফা দেওয়ার পর ১৯৬৬ সাল থেকে জেলে থাকা শেখ মুজিবকে ১৯৬৮ সালে দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসি দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে স্বৈরাচার আইয়ুবের সামরিক জান্তারা। তবে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ফলে বাংলার মানুষের একক কণ্ঠস্বরে পরিণত হন তিনি। এরপর, ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ  সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় এই ভূখণ্ডকে 'বাংলাদেশ' বলে অভিহিত করেন বঙ্গবন্ধু। 

এরপরের ইতিহাস হলো- আওয়ামী লীগের জয়, আপামর বাঙালির জয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে একচেটিয়াভাবে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। এরপরেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ এর মার্চ মাসজুড়ে তীব্র অসহযোগ আন্দোলন চলার সময় ৩ মার্চ পল্টনের বিশাল জনসভায় জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। এরপর ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত রণকৌশল ঘোষণা করেন তিনি। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে গড়ে ওঠে সংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। অবশেষে ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা ঘুমন্ত বাঙালির ওপর হামলে পড়লে, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

লক্ষ্য করলে দেখা যায়- বঙ্গবন্ধুর যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী (১৯৬৭ সালে ভর্তি)। কলেজ জীবনে ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে যেমন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতির হাতেখড়ি হয় শেখ হাসিনার, তেমনি ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময়েও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে মিছিল করেছেন তিনি। এর আগে ছয় দফা আন্দোলনের সক্রিয় মিছিলেও অংশ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। শুধু তাই নয়- তিনি যখন আজিমপুর গার্লস স্কুলে পড়তেন, তখন হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলন চলছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেসময় সেই দাবির পক্ষে স্কুল থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

এমনকি তিনি যখন ক্লাস নাইনে পড়তেন, তখন পাঠ্যপুস্তকে পাকিস্তান নামে একটি চ্যাপ্টার ছিল, সেই চ্যাপ্টারে ছিল শুধুই আইয়ুব খানের গুণগান। পরীক্ষায় সেগুলোর ওপর লিখতে হতো। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে যা শিখেছেন, একজন স্বৈরাচার সম্পর্কে ঠিক তাই লিখে আসেন খাতায়। একারণে তার খাতায় কোনো নম্বর দেননি শিক্ষক। এরপর বাবা শেখ মুজিবকে একথা জানান কন্যা শেখ হাসিনা। উত্তরে বঙ্গবন্ধু তার আদরের কন্যা হাঁসুকে (শেখ হাসিনা) বলেছিলেন: 'ওই পাকিস্তান চ্যাপ্টার আর পড়া লাগবে না। পাকিস্তান বলে কিছু থাকবে না। কাজেই ওটা আর পড়াও লাগবে না, লেখাও লাগবে না।' এরপর থেকে আর ওই চ্যাপ্টার আর কখনোই পড়েননি তিনি, এমনকি স্বৈরাচার আইয়ুব খানের গুণগান লিখবেন না জন্য এসএসসি পরীক্ষাতেও ওই  চ্যাপ্টারের ২০ নম্বর ছেড়ে দিয়েছেন। বাকি ৮০ নম্বরের উত্তর দিয়ে বের হয়ে এসেছেন পরীক্ষার হল থেকে।

এটাই শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা। যিনি বাবার মতোই ছাত্রজীবন থেকে পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার, পরবর্তীতে বাংলাদেশি স্বৈরাচারদের গ্রাস থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। একাধিকবার বুলেট-বোমা-গ্রেনেডের হামলা মোকাবিলা করে আহত হয়েছেন। সুস্থ হয়ে আবারো ফিরেছেন। বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করা লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছেন। আওয়ামী লীগের হাত ধরেই যেমন বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তি এনে দিয়েছেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান; তেমনি আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাঙালি জাতির মুক্তিকে পূর্ণতা দেওয়া পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত