আগরতলা মামলা: স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র প্রচেষ্টার প্রামাণ্য দলিল

1525

Published on জানুয়ারি 3, 2022
  • Details Image

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঐতিহাসিক 'ছয় দফা' ঘোষণার পর বাঙালি জাতির একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মার্চের কাউন্সিলে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, 'বাঙালির মুক্তির সনদ' ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে দেশজুড়ে ছুটতে থাকেন বঙ্গবন্ধু। সেই ধারাবাহিকতাতেই আপামর জনতার পাশাপাশি, সরকারি কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের একটি অংশ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা নিতে থাকেন। যেসব তথ্যপ্রমাণ পরবর্তীতে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের হাতে চলে যায়, এবং তারা তখন ১৯৬৮ সালের শুরুতেই 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্যান্য' নামে একটি মামলা দায়ের করে।

'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্যান্য' শিরোনামে পাকিস্তানিদের দায়ের করা মামলাটির মূল অভিযোগ ছিল: 'অভিযুক্তরা অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র সংগ্রাম ঘটিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠা করতে চায়'। এই মামলাকেই পরিকল্পিতভাবে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নামে প্রচারণা করতে শুরু করে পাকিস্তানিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির প্রচেষ্টাকে পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্র বলে এক নোংরা খেলায় মেতে ওঠার চেষ্টা করেছিল সেসময়, ফলে মুখে মুখে সেই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে এই মামলা। 

মূলত, স্বাধীনতার জন্য এই তীব্র জাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি, যখন পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে বিরোধীদলের এক বৈঠকে প্রথম ছয়দফা উত্থাপনের চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু জান্তারা তাকে প্রতিহত করে। এরপর বাংলার মাটিতে ফিরে পরবর্তী তিন মাসে সারাদেশে ৩২টি জনসভা করেন তিনি। এসময় ছয় দফার পক্ষে গণজোয়ার দেখে ভীত হয় পাকিস্তানিরা। ফলে তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে ৮ বার আটক করে জান্তারা। অবশেষে ৮ মে (১৯৬৬) বঙ্গবন্ধুকে চূড়ান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদের জন্য জেলে ঢোকায় পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা।

কিন্তু ছয় দফার ফলে যে জাগরণ শুরু হয়েছে ততদিনে, তারফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার জন্য সর্বমুখী প্রচেষ্টা চালাতে থাকে বাঙালি জাতি। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ৭ জুন, ছাত্রসমাজের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো শ্রমিকসমাজও রাজপথে নামে ছয়দফার সমর্থনে। সেদিন জান্তাদের গুলিতে প্রাণ হারায় ১১ জন। 

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। কিন্তু তারপরও কীভাবে বাংলার মাটিতে মুক্তির আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে- এটির কারণ খুঁজতে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা জানতে পারে যে, ছয় দফা ঘোষণার আগে ও পরে- আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, কিছু বিশ্বস্ত বাঙালি সেনা সদস্য ও কিছু সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে চূড়ান্ত বিপ্লবের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন বঙ্গবন্ধু। ফলে এই সম্পর্কিত কিছু তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে, ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ও তাদের নামে মামলা দায়েরের পর, ৬ জানুয়ারি একটি সরকারি প্রেসনোট জারি করে পাকিস্তান সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গণগ্রেফতার।

বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অভিযুক্ত করে সেই মামলায় মোট ৩৫ রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও সামরিক কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। মূলত ছয়দফা ঘোষণার পর, পেশাজীবী ও সামরিক বাহিনীর একটি অংশ পাকিস্তানের দাসত্ব থেকে মুক্তির ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য গ্রেফতারের আগেই একাধিকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফলে স্বাধীনতাকামী জনগণের পক্ষে বাঙালি সুশৃঙ্খলিত বাহিনীর কিছু সদস্যের এই সমর্থনকে দমানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় পাকিস্তানি জান্তারা। তাদের পরিকল্পনা ছিল, দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এবং বাকিদের কাউকে জেলের মধ্যে এবং কাউকে সেনাআইনে কোর্টমার্শাল করে হত্যা করা। তবে আপামর বাঙালির তীব্র প্রতিবাদের মুখে পাকিস্তানিদের সেই হীন অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের পদক্ষেপ এবং পাকিস্তানিদের পতনের শুরু

বঙ্গবন্ধুকে ছয়দফা ঘোষণার কারণে গ্রেফতার করে ১৯৬৬ সালের ৮মে থেকে কারাগারে অন্তরীণ রাখে পাকিস্তানিরা। এরপর ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কমপক্ষে দেড় হাজার বাঙালি রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্যকে আটক করা হয়। এরমধ্যেই ১৯৬৮ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধু এবং আরো ৩৪ জন সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে মূল আসামি করে দায়ের করা হয় মামলা। জেলে থাকা অবস্থাতেই এসময় বঙ্গবন্ধুকে এই নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে শুরু করা হয় বিচার।

১৯৬৮ সালের ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে এক বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য' নামের এই মামলার শুনানি শুরু হয়। এসময় মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো বাংলা। ছয়দফা ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো শ্রমিক সমাজ যেমন আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি এই মামলার পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বাংলার কৃষক সমাজও রাজপথে নেমে এলো। ফলে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক ও আপামর জনতার সম্মিলিত আন্দোলনে টলে উঠলো পাকিস্তানি জান্তাদের মসনদ। স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে এই গণআন্দোলন বাংলার ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মহেন্দ্রক্ষণ।

বেসামাল পাকিস্তানিরা ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, জেলের ভেতরে গুলি করে হত্যা করে এই মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে, অমানবিক নির্যাতন চালায় অন্যান্য আসামিদের ওপর, বঙ্গবন্ধুকে রাখা অজ্ঞাত স্থানে। কিন্তু মামলার বিভিন্ন শুনানির দিনে, পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মীদের সঙ্গে ক্ষণিক সাক্ষাতের মাধ্যমে ছাত্রনেতা ও দেশবাসীকে সাহস ধরে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে থাকেন বঙ্গবন্ধু। ফলে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুকের গুলি উপেক্ষা করে রাজপথ দখল করে মুক্তিকামী বাঙালি।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র ও শ্রমজীবী মানুষরা। ড. শামসুজ্জোহা, আসাদ, মতিউরদের রক্তধারা থেকে সারা বাংলায় ছড়িয়ে যায় একটাই স্লোগান: 'জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো'। আপামর বাঙালির অগ্নিঝরা স্লোগানে অবশেষে ভীত হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। অবশেষে তারা ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মামলার আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এরপরের দিন, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক বিশাল জনসভায় লাখ লাখ ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতার উপস্থিতিতে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। এরপর, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানিদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে চিরমুক্তির প্রতিশ্রুতি দেন বঙ্গবন্ধু। এরপর বাঙালিদের তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় সামরিক জান্তা জেনারেল আইয়ুব খান। এবং ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি জান্তারা।

পরবর্তীতে সেই বছরের শেষেই, ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর, নিজের রাজনৈতিক পথনির্দেশক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় বঙ্গবন্ধু এই ভূখণ্ডের নাম 'বাংলাদেশ' বলে অভিহিত করেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ''জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত