সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার: অনন্য উচ্চতায় বঙ্গবন্ধু

915

Published on ফেব্রুয়ারি 21, 2023
  • Details Image

ড. জেবউননেছা:

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে নীতি গ্রহণ করেন। তারপরও কেউ কেউ নানা অজুহাতে সরকারি নথি ইংরেজি ভাষায় লিপিবদ্ধ করতেন। বঙ্গবন্ধু এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারি দাফতরিক কাজে রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে সর্বশেষ নির্দেশনা জারি করেন ১২ মার্চ, ১৯৭৫।

গণভবন হতে ৭২১/১ (৪০০) নং প্রজ্ঞাপন উল্লেখ করা হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।– শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি।’

এই প্রজ্ঞাপনটি চোখে পড়ার পর ভাষা আন্দোলনের সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জীবনের পেছনে তাকিয়ে দেখি, ব্যক্তিগতভাবে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাঠক্রমে কিছুই পাইনি। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে বঙ্গবন্ধুকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে কেন বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল? খুঁজতে থাকি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা রকমের তথ্য ও উপাত্ত। তথ্য উদ্ধার করি ও বিস্মিত হই এই ভেবে যে একজন মানুষের কতটা অধ্যবসায় থাকলে তিনি হতে পারেন জাতির পিতা।

১৯৪৭ সালে ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দানের কথা ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজের ‘সিরাজউদ্দৌলা হলে ছাত্র ও যুব নেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে মিলিত হয়েছিলেন। সেই সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়, হয়তো বাংলার মাটিতে নতুন করে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে।’ এই সভার উদ্যোক্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৪৭ সালের ২৭ জুন ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই রচনায় বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা ভাষা হবে এটা বলাই বাহুল্য। এই পত্রিকার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে আমরা তা জানতে পারি। সুতরাং রচনাটি যিনিই লিখেছেন এই মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে পত্রিকার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রত্যক্ষ যোগ থাকা অসম্ভব কিছু নয়। বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন ১৯৪৭ সালে সেপ্টেস্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। ঢাকার রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে তাঁর প্রথম যোগসূত্র তৈরি হয় ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুবলীগ সম্মেলনে। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য করা হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন বঙ্গবন্ধু সংগঠনের প্রস্তাবনার এক পর্যায়ে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হোক’। এই বক্তব্য থেকে বুঝা যায় মাতৃভাষার বিষয়ে সচেতনতা যুবলীগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রচারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

অতঃপর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হয়। এই সংগঠনের দশটি দাবির মধ্যে ৭ নম্বর দাবি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজ সমূহে বাংলাভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান এবং পরীক্ষা গ্রহণের আশু ব্যবস্থা’। পরবর্তীকালে তমুদ্দন মজলিশের জন্ম হয় ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালেই আইন বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অনাবাসিক ছাত্র হিসেবে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থী হলেও তিনি অধিকাংশ সময় কাটাতেন ফজলুল হক মুসলিম হলে।

১৯৪৭ সালে ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সংবাদে ঢাকার শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হন। তারা জানতে পারে ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবন বর্ধমান হাউসে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই সভা যেন বাংলাভাষার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেজন্য শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ বর্ধমান হাউসকে ঘিরে ফেলে। সেই বিক্ষুব্ধ একটি অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এছাড়াও বিক্ষোভ প্রদর্শন ছাড়াও বঙ্গবন্ধু প্রচার পুস্তিকার মাধ্যমেও জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে ‘২১ দফা ইস্তেহার’ ছিল ১৪ জন রাজনৈতিক নেতার স্বাক্ষরে একটি প্রচারপত্র। যে প্রচারপত্রে দুটি দফা ছিল রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত। এই প্রচারপত্রে ১৪ জন রাজনৈতিক নেতা স্বাক্ষর প্রদান করেন। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্যতম। ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসে মুসলিম লীগের সভা চলাকালে বর্ধমান হাউসের বাইরে একটি পুস্তিকা বিক্রি হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ এবং কৈফিয়ত দিতে হবে- আমাদের দাবি’। এই পুস্তিকাটি বঙ্গবন্ধু এবং নঈমুদ্দিন আহমদের নামে প্রকাশিত হয়। এই সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই কমিটিতে মুসলীম ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যেহেতু ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তাই সেখানে তাঁর কর্মীদের উপস্থিতি মানে তারই অংশগ্রহণ। এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান সরকারের মুদ্রা এবং ডাকটিকিটে বাংলা ভাষা পরিত্যক্ত হওয়ায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সদস্যগণ বিক্ষুব্ধ হন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, সরকারকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। যাতে হাজার হাজার জনতার স্বাক্ষর থাকবে। এই স্মারকলিপির জন্য বঙ্গবন্ধু নিজে বহু স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। সেইসাথে ছাত্রলীগের বহু সদস্য তমুদ্দন মজলিশের সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন ক্রমে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পেতে শুরু করে। সংগ্রাম পরিষদের সক্রিয় সদস্য শামসুল হক ১৯৫২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সংগ্রাম পরিষদের কয়েকজন সদস্যের মধ্যে নাম বলেন। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নামটিই প্রথম উচ্চারণ করেন।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘটনাগুলো লক্ষ্য করলে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততার প্রকৃতি বোঝা যায়। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সাল, বৃহস্পতিবার ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। যদিও বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে দিবসটির নাম লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষা দিবস’। এই দিবসটি যথাযথভাবে পালনের লক্ষ্যে একাধিক প্রচারপত্র ঢাকা সহ সারাদেশে বিতরণ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ মার্চ নয়জনের স্বাক্ষরে একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়, যার চার নম্বরে ছিল বঙ্গবন্ধুর নাম। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল এই প্রচারপ্রত্রের মূল বক্তব্য। ১১ মার্চের কর্মসূচি সফল করার জন্য বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর, যশোর, খুলনা (দৌলতপুর) এবং বরিশাল হয়ে ঢাকায় ফিরেন। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় বঙ্গবন্ধু যোগদান করেন। সভার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমাদের প্রায় সত্তর পচাত্তর জনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।’ ভাষা আন্দোলনরে প্রথম সারির নেতা অলি আহাদ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন, ‘১০ মার্চ সভায় বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম পরিষদের যোগদান না করলে ১১ মার্চের রাষ্ট্রভাষা দিবস কর্মসূচি সফল হতো না’।

পরেরদিন পুলিশের নির্যাতন এবং গ্রেফতারের প্রতিবাদে দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। ১৩ এবং ১৪ মার্চ সর্বত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ বিকেলে মুসলিম লীগ পরিষদের সদস্য এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের সাথে খাজা নাজিমুদ্দীনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করতে সম্মত হন। এই বৈঠকের জন্য আটটি চুক্তির খসড়া তৈরি করা হয়। খসড়া চুক্তিটি তৈরি হওয়ার পর আবুল কাশেম এবং কামরুদ্দীন আহমেদ জেলখানায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু সহ নেতৃবৃন্দকে দেখান। চুক্তিপত্রের ১ নং শর্ত অনুযায়ী ১৫ মার্চ বিকেলেই বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম লীগ কর্মীদের আয়োজনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান। পরের দিন সকালেই প্রতিবাদসভা হিসেবে সাধারণ ছাত্রসভা আয়োজনের জন্য বঙ্গবন্ধু সবাইকে একত্রিত করেন। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে সাধারণ সভায় বঙ্গবন্ধু সভাপতিত্ব করেন। ১৭ মার্চ ১৯৪৮ সালে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন অনেকগুলো ঘোষণার মধ্যে একটি ঘোষণা দেন যে, প্রাদেশিক পরিষদের পরবর্তী অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সুপারিশ করা হবে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন এই ফলাফলের মাধ্যমে শেষ হয়। পরবর্তীকালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাষা সংক্রান্ত স্বৈরতান্ত্রিক বক্তব্য দেন এবং এর বিরোধিতা করেন ছাত্র সমাজ। এরপর ফজলুল হক হলে জিন্নাহর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাবো। তাতে যাই হোক না কেন আমরা প্রস্তুত আছি। বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যের রেষ ধরেই ১৯৫২ সালে ভাষা শহীদদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে তা সত্যিকার অর্থেই প্রমাণিত হয়।

পরবর্তীকালে নতুন গভর্নর জেনারেল লিয়াকত আলী খান ঢাকায় এলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। সেই সভায় ও বঙ্গবন্ধু উপস্থিত ছিলেন। নানা পথ পরিক্রমায় আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন শুরুর পর থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু মাত্র ২৮৩ দিন মুক্ত রাজনীতির সুযোগ পেয়েছিলেন। বাকি সময় কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে আটকে রাখার অর্থ ছিল আন্দোলন যেন যথেষ্ট গতি লাভ না করে। কারণ যখনই তিনি সুযোগ পেতেন তখনই জনমত গঠন করতেন। এমনকি কারাগারে থেকেও বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনকে গতিশীল করেছেন। এমনকি আন্দোলনের চূড়ান্ত দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখকে বঙ্গবন্ধু নির্বাচন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এ বিষয়টির পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বুঝতে পেরে ১৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার জেল থেকে ফরিদপুরে জেলে স্থানান্তর করে তৎকালীন সরকার। বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর জেলে অনশন শুরু করেন। এই অনশনের অন্যতম কারণ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। ২৭ এপ্রিল ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সম্মেলনে ১৬টি জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিদের সামনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির জন্য জোরালো বক্তব্য রাখেন এবং ২৯ এপ্রিল তিনি দুটি বিষয়ের ওপর বিবৃতি প্রদান করেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি।

একজন রাজনৈতিক নেতা এবং সংগঠক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা যেমন গুরুত্ব বহন করে। কারাগারের বাইরে থাকুক আর ভেতরে থাকুক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর সফল নেতৃত্ব সমান গুরুত্ব বহন করে। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বিভিন্নভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যা স্বল্প পরিসরে বলা কঠিন। অথচ কৌশলগতভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততাকে কেউ কেউ এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু সত্য কখনও চাপা থাকে না। ইতিহাস কথা বলবেই। সেই ধারাবাহিকতায় বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ এবং সংগ্রামের ইতিহাস। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ৭৫’এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর তৎকালীন সরকার বাংলা একাডেমির ওপর নানা চাপ সৃষ্টি করে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত ‘শেখ মুজিব’,‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’,‘বঙ্গবন্ধুর জীবন কথা’, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’ বইয়ের সকল কপি ধ্বংস করতে বাধ্য করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে। ০৬.১০.১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ব্যক্তিগত প্যাডে এক পর্যায়ে লিখেন ভাষা সৈনিক অলি আহাদকে লিখেন,‘স্নেহের ওলি আহাদ, মনে রেখো কোনও ত্যাগই বৃথা যায় না, শরীরের প্রতি যত্ন নিও, তোমার মুজিব ভাই।’ সত্যিই কোনও ত্যাগ বৃথা যায় না।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ভাষা শহীদদের যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন এবং ভাষা আন্দোলনের সংগঠকদের। সেই সাথে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যিনি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য দিনান্ত পরিশ্রম করেছেন। লেখাটি শেষ করব সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতার কয়েকটি চরণ দিয়ে -‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সৌজন্যে: বাংলা ট্রিবিউন

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত