খালেদা জিয়ার শাসনামল: রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দখল, দুর্নীতি, অশ্লীলতা ও বর্বর সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বিপর্যস্ত রাষ্ট্র!

547

Published on নভেম্বর 19, 2022
  • Details Image

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেকয়টি পরিবার মুক্তিযোদ্ধা এবং অসহায় নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের মধ্যে শীর্ষতম হলো রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তাকে নিজের উপদেষ্টা বানান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে শত শত বিঘা জমি দখল করে সে। ভোট জালিয়াতি, হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার, সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, এমনকি লবিস্ট নিয়োগ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচারের অন্যতম হোতা এই ব্যক্তি।

২০০৭ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার অবৈধ সম্পদের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেয়েছে স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৩ মার্চ ২০০৭ সালের দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দুদকে জমা দেওয়া তথ্যের সাথে সাকা চৌধুরীর সম্পদ এবং আয়ের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। দেশে বিদেশে নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। বর্তমান হিসেবে সেটি হাজার কোটির বেশি। দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তার কিছু সম্পদের মধ্যে- ঢাকার ধানমন্ডিতে ৩৩ শতক জমির ওপর বাড়ি, দক্ষিণখানে ৯১ শতক জমির ওপর বাড়ি, চট্টগ্রামের বাকালিয়া-রাঙ্গুনিয়া-রাউজানে জমি ও বাড়ি নিজের নামে। এছাড়াও গৃহিণী স্ত্রীর নামে গুলশানে ১০ একর জমির ওপর বাড়ি এবং ধানমন্ডিতে ২টি ফ্লাট। এছাড়াও কিউসি গ্রুপের ১৫টি প্রতিষ্ঠানে নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে-বেনামে শত কোটি টাকার শেয়ার উল্লেখযোগ্য। এমনকি একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালু প্রক্রিয়াও চলছিল সাকা চৌধুরীর মালিকানায়।

এর বাইরে দুদকে জমা দেওয়া সম্পদের হিসেবে চট্টগ্রামের ১৫টি বাড়ি এবং প্রায় ৫০ বিঘা জমি, কিউসি গ্রুপের ১৫টি কোম্পানির শেয়ারের মূল্যসহ মোট আয় দেখিয়েছে সে মাত্র ৬ লাখ টাকা। অথচ সব সম্পদের মূল্য কয়েকশ কোটি টাকা। নিয়মিত অশ্লীল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দেশব্যাপী সমালোচিত এই ব্যক্তি জালিয়াতিতেও ছিল মাস্টারমাইন্ড। এমনকি নামে-বেনামে প্রায় হাজার কোটির বেশি অর্থ পাচারের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা খুঁজে পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেইসব অর্থ দিয়েই পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের অপচেষ্টা করে সে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদারদের এই সহযোগী শুধু অশ্লীলতাতেই থেমে ছিল না। সন্ত্রাস ও জবর-দখল ছিল তার নিয়মিত কর্মযজ্ঞের একটি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার আমলে, চট্টগ্রামে ১৪৪ একর সরকারি জমি দখল করে যুদ্ধাপরাধী এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার। সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা এই জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা এবং কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে কুখ্যাত সাকা চৌধুরী। অবৈধভাবে দখলকরা এসব সম্পদের দেখাশোনা করতো তার ছোট ভাই সাইফউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০০৭ সালের ৯ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশ হয়।

মূলত, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর, স্থানীয়দের সুপারিশের ভিত্তিতে ৭ আগস্ট বেদখলকৃত এসব জমি উদ্ধার করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি সেখানে অভিযান চালিয়ে ৩ প্লাটুন পুলিশ এবং ওয়াসার ৭০ জন কর্মীর মাধ্যমে ১৭৩টি অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেন আদালত। প্রতিকাঠা জমি ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা করে ধরলেও, তৎকালীন সাকা চৌধুরী পরিবার কর্তৃক দখলিকৃত এই ভূমির দাম ছিল ৫০০ কোটি টাকা। উদ্ধারের পর সেখানে লাল পতাকা উড়িয়ে দিয়ে, নিরাপত্তার জন্য একটি আনসার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

এদিকে বিএনপি-জামায়াত জোটের করা ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকা ধরা পড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। ভোটার তালিকা জালিয়াতিতেও পাওয়া যায় সাকা চৌধুরীর নাম। দেখা যায়, সম্পূর্ণ অসাংবিধানিকভাবে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া দুই জায়গা থেকে ভোটায় হয়েছে এই সাকা। এছাড়াও অবৈধপথে আয় করা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন তখন আটক করে তাকে।

পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়- মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড এবং খুন ও ধর্ষণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান সহযোগী ছিল এই সাকা চৌধুরী। পাকিস্তাদের কাছে এদেশের রাস্তাঘাট অচেনা থাকায়, সাকা চৌধুরী নিজে তাদের প্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা রাখতো। এমনকি তার 'গুডস হিল'-এর বাসায় নিয়মিত আসর বসাতো পাকিস্তানি সেনারা। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো ওই বাসার এর টর্চার সেল-এ।

চট্টগ্রামে টানা পাঁচ দিন অবস্থান করে শত শত মানুষের সাক্ষ্য নিয়ে এসব তথ্য-প্রমাণ পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল। তদন্ত দলের সদস্য এএসপি নুরুল ইসলাম জানান, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটে সাকা চৌধুরীর ভূমিকা ছিল গভীর। সেসব স্মৃতিচারণ করে সাধারণ মানুষ এখনো ভীত হয়ে ওঠে। ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি যুগান্তর পত্রিকার সংবাদে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্থ এবং নির্যাতনের শিকার যেসব পরিবার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জানিয়েছে, সাকা চৌধুরী তাদের ওপর সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দেয়। শিবির ক্যাডারদের সহায়তায় মামলার বাদীদের হত্যার হুমকি দিয়ে নির্যাতন চালায় সাকা চৌধুরীর কুখ্যাত পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

সাকার বিরুদ্ধে করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বাদী আবু তাহের এ ব্যাপারে সাকা চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ফাইয়াজ চৌধুরী এবং নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাদতের নামে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর বেপরোয়া হয়ে রাজাকার সাকা চৌধুরীর পক্ষ নিয়ে পুলিশের ওপর হামরা করে হুম্মাম কাদেরসহ বিএনপির জামায়াতপন্থী নেতাকর্মীরা। এদের হামলায় আহত হয় সিএমপির এসি জেদান আল মুসা। মূলত চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে ফেলেছিল সাকা ও হুম্মাম গং।

২০০৭ সালের ১১ জুন প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বহুবিধ নাশকতায় কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়ায় খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয় সাকা। একারণে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি ভুয়া ভোটার তালিকার মাধ্যমে একচেটিয়া নির্বাচনের যে পরিকল্পনা করেছিল বিএনপি-জামায়াত সরকার, তা বাস্তবায়নের জন্য অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। এমনকি ক্ষমতা ছাড়ার আগে, নির্বাচনের জন্য পাকিস্তান থেকে পাওয়া ১০০ কোটি টাকা রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছেই জমা রাখেন খালেদা। দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌথ বাহিনীর কাছে স্বীকারোক্তিতে এই তথ্য জানায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের পথ প্রদর্শক এবং বাঙালি যুবক, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘুদের গণহত্যার সহযোগী হয়ে ভীতিকর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় সাকা চৌধুরী। পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনীকে সঙ্গে করে নিয়ে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের নারীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাতো এই যুদ্ধাপরাধী। একারণে স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং দেশদ্রোহীদের তালিকায় শীর্ষে ছিল এই পরিবারের সদস্যরা। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের নির্মমভাবে হত্যার পর স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের ছায়ায় আবারো নাশকতায় মেতে ওঠে তারা।

ফলে ২০১০ সালের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর, ডিসেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক করা হয় রাজাকার, খুনি ও ধর্ষক সাকা চৌধুরীকে। কিন্তু ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময় ইউরোপ-আমেরিকায় লবিস্ট নিয়োগ করে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার চালাতে শুরু করে সে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে র্যাব সাকাকে নির্যাতন করেছে বলে দাবি করে তার পেইড এডেন্টরা। কিন্তু ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জনকণ্ঠ পত্রিকার সংবাদে জানা যায়- যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধে পুলিশের হাতে আটকের পর থেকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে জেল হেফাজতে আটক ছিল সাকা। এই সময়ে তার সঙ্গে বাংলাদেশের আরও কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীও জেলে একত্রে ছিল। এটি পুরোপুরি পুলিশ, জেল প্রশাসন এবং আদালতের বিষয়। এর সাথে র্যাবের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্থ ও বিতর্কিত করতে ইউরোপ-আমেরিকাতে চিঠি লিখে নানাবিধ নির্যাতনের কথা বলে অপপ্রচার ছড়ায় সাকা চৌধুরী। এই কুখ্যাত রাজাকারের চিঠিগুলোকে ব্যবহার করে তার বিদেশি লবিস্টরা বিদেশের পত্রিকাগুলোয় এনিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। এরপর সেই বানোয়াট ও বিভ্রান্তমূলক সংবাদগুলো ব্রিটিশ, আমেরিকার সরকারের কাছে উপস্থাপন করে। অথচ কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ফেব্রুয়ারি মাসেই সাকা সাংসদের গাড়ি ব্যবহার করে নিজে সংসদ অধিবেশনে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে সরকারকে চিঠি দেয়। এমনকি বন্দিদের রেগুলার মেডিক্যাল চেকাপের সময়ও সে নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ দাবি করে চিকিৎসকদের কাছে চেকাপ করাতেও অস্বীকার করে।

পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ বিদেশি গণমাধ্যমের কাছে সাকা চৌধুরীর এই ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা খোঁজ-খবর নেওয়ার পর সাকার লবিস্টদের ফাঁদ এড়িয়ে যায়। কিন্তু ২৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় থাকা কয়েকটি গণমাধ্যম, বাংলাদেশের কয়েকটি বিদেশি এনজিও এবং তাদের পেইড এজেন্টরা, বিএনপি-জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং উগ্রবাদী অংশটি সক্রিয় থাকে; এবং ১৯৭১-এর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আবারো হত্যার হুমকি দেয়। এমনকি পরবর্তীতে চলন্ত গাড়িতে পেট্টোল মেরে, সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন দিয়ে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা করে যুদ্ধপরাধের বিচারকে বানচালের সর্বোচ্চ অপচেষ্টা করে সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত