কর্মীনির্ভর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

488

Published on জুন 23, 2022
  • Details Image

অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেনঃ

“রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চারটি জিনিসের প্রয়োজন এবং তা হচ্ছে- নেতৃত্ব, ম্যানিফেস্টো বা আদর্শ, নিঃস্বার্থ কর্মী এবং সংগঠন। আমি আনন্দের সাথে বলতে পারি যে, আওয়ামী লীগের ১৯৪৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নেতৃত্ব ছিল, আদর্শ ছিল, নিঃস্বার্থ কর্মী ছিল এবং সংগঠন ছিল। এই ভিত্তির উপরই সংগ্রামে এগিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে।” (১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর উদ্বোধনী ভাষণ)

“বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মীদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যা কিছু অর্জন করেছে, তা কেবল সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী কর্মীদের দ্বারাই, সুসংগঠিত এই সংগঠনের মাধ্যমে।”-শেখ হাসিনা [‘আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে’ প্রবন্ধ থেকে]

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার উপরোল্লিখিত উদ্ধৃতিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ কর্মীনির্ভর রাজনৈতিক দল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ বাঙালি জাতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, সবই সম্ভব হয়েছে জনগণের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস জনগণ এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। নেতা-কর্মীদের মনোবল এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তির কারণে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র কখনই সফল হয়নি।

’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুবের এক দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয় অর্জনসহ বাঙালির সকল আন্দোলন সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। স্বৈরাচারের লাঠি, বন্দুক, টিয়ার গ্যাসের সামনে বুক টান করে আওয়ামী লীগের কর্মীরাই দাঁড়ায়। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সাথে বঙ্গবন্ধুর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। নেতা-কর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন, খোঁজখবর নিতেন। তৃণমূলের কর্মীরাও প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর মতো তার যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও সারাদেশের নেতা-কর্মীদের চেনেন, জানেন। ব্যক্তিগত খোঁজখবর রাখেন। বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ান।

জনগণ এবং নেতা-কর্মীদের আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছেন বলেই ৭ মার্চের অমর কাব্য রচিত হয়েছে। এই ভালোবাসার অধিকারেই বঙ্গবন্ধু বলতে পেরেছেন- “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দিবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।” নেতা-কর্মীদের সর্বোচ্চ ত্যাগের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন, “বাংলাদেশের লক্ষ যুবক, লক্ষ লক্ষ কৃষক, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক রক্ত দিয়েছে। আর কারো কথায় নয়, শেখ মুজিবের ডাকেই তারা জীবন দিয়েছে।” [১৯৭৪ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ]

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছর সাত মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন তার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে বিভোর, তখনই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সেনা ছাউনিতে বন্দী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নবতর সংগ্রামে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বীরোচিত ভূমিকা পালন করে। জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সেনাশাসকদের পরাস্ত করে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সফলভাবে নেতৃত্ব দেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। অগণিত শহিদের আত্মদান ও জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণ ২১ বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়। সামরিক বাহিনীর গর্ভে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার, নির্যাতন ও হত্যা করে।

২০০১ সালের ষড়যন্ত্র ও কারচুপির নির্বাচনের পর বিএনপি-জামাত জোট সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার, সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য মমতাজ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামসহ হত্যা করা হয় ২১ হাজার নেতাকর্মীকে। এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ান দেশরত্ন শেখ হাসিনা। রাজপথে নেমে আসে আপামর জনগণ ও আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মীবৃন্দ। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়। তথাকথিত সংস্কারের নামে আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় কারও কারও বিতর্কিত ভূমিকা থাকলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ইতিহাস নির্ধারণী ভূমিকা রাখতে পিছপা হয়নি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অসুস্থ পুত্রবধূকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তাকে দেশে আসতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়। প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসে।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতারকালে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যে চিঠি লিখে যান, সেখানেও মহান সৃষ্টিকর্তার পর জনগণ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেছেন। পাঠকের জ্ঞাতার্থে চিঠির কিছু অংশ উল্লেখ করছি-

“উপরে রাব্বুল আলামিন ও আপনারা দেশবাসী আপনাদের উপর আমার ভরসা। আমার প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছে আবেদন কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই।”

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কারও কথায় কান না দিয়ে নেত্রীর মুক্তির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাব-জেলের সামনে মানববন্ধন, ২৫ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদে একটা পর্যায়ে ১১ মাস পর দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথচলায় দেখা গেছে, নেতারা ভুল করলেও কর্মীরা নেতৃত্ব দিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু-কন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রায় ১৩ বছর একটানা ক্ষমতায় আছে। দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হচ্ছে। পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। আমরা স্যাটেলাইটের যুগে প্রবেশ করেছি, টানেলের যুগে প্রবেশ করেছি। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, শতভাগ বিদ্যুতায়িত হয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের সাথে দেশবাসীকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে দলের নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী কর্মীদের। এ দায়িত্ব পালনে তাদের হতে হবে নির্মোহ ও নিঃশঙ্ক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুধাবন করতে হবে, ধারণ করতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে জাতির পিতার কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিরোচিত সংগ্রামী জীবন থেকে। ক্ষমতার রাজনীতিতে আদর্শিক কর্মী সৃজনে আত্ম-উপলব্ধির জন্য বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে লেখার ইতি টানছিÑ “তোমরা আত্মসমালোচনা কর, আত্মসংযম কর। তোমরা আত্মশুদ্ধি কর। দুই-চারটা-পাঁচটা লোক অন্যায় করে, যার জন্য এত বড় প্রতিষ্ঠান যে প্রতিষ্ঠান ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যে প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা এনেছে, যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ কর্মী জীবন দিয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান ২৫ বছর পর্যন্ত ঐতিহাসিক সংগ্রাম করেছে- তার বদনাম হতে দেয়া চলে না।” [১৯৭৪ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ]

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
সৌজন্যেঃ উত্তরণ 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত