বিজয়ের গৌরবগাথা, মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী

285

Published on ডিসেম্বর 16, 2021
  • Details Image

শাহাব উদ্দিন মাহমুদঃ 

‘আজ আমি বেঁচে আছি, কাল নাও থাকতে পারি। আমি আমার দেশের মানুষের সেবা করতে পেরেছি, এটা আমার জন্য অনেক বড় সান্ত¡না। আমি যদি মারা যাই, আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে শক্তিশালী করবে।’ উড়িষ্যায় এই বক্তব্য প্রদানকালে ইন্দিরা গান্ধী জানতেনও না এটাই জনতার সামনে তার শেষ বক্তব্য। এই জনসভার ঠিক একদিন পর ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ সালে দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি চলে গেলেন কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে রেখে গেলেন পথ চলার বার্তা। ষাটের দশকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন তার জন্য প্রয়োজন হবে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা। তখন থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময়ে আগরতলার পুলিশের আইজি ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জির উদ্যোগে ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রনাথ সিংহের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করেন। পরে ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে লন্ডনে ভারতের তৎকালীন তথ্য ও প্রচারমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রথম বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই স্থির হয় পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বেরিয়ে আসবে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দ্বিতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। শপথ গ্রহণের আগেই এই উপমহাদেশের ভয়াবহ গণহত্যা প্রত্যক্ষ করতে হয় ইন্দিরা গান্ধীকে। একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকার প্রধান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে গোটা বিশ্বে গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ছিল অসাধারণ। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা উল্লেখ করা দরকার। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সাল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার গঠন হয়, ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিক শপথ নেয়। এর আগে ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় এক প্রস্তাবে অবিলম্বে পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। এরপর ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানায়। ইন্দিরা গান্ধী তখন বিচক্ষণতার সঙ্গে ধীরে চলো নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ১৩ এপ্রিল বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘পূর্ববাংলায় যা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার নীরব থাকবে না।’ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য একটি ট্রান্সমিটার বরাদ্দ দেন। পরে ১৭ মে ইন্দিরা গান্ধী যান পশ্চিমবঙ্গে। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল সেখানেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে এই বলে আশ্বস্ত করেন, শরণার্থী বিষয়ে কেন্দ্র তাদের পাশে আছে ও থাকবে। ভারতীয় কমান্ডারদের প্রতি ইন্দিরার আদেশ ছিল, ‘আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানী কামানগুলো নিস্তব্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের অভিযান চলবে।’

আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অস্থাায়ী সরকারকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি অস্থায়ী সরকারকে ভারতের অভ্যন্তরে স্থান দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ভারতের পক্ষে সোভিয়েত রাশিয়ার সরাসরি সমর্থন প্রদান। ইন্দিরা গান্ধী রাশিয়া সফর করে তাদের সঙ্গে ২২ বছরের শান্তি চুক্তি করেন। সেই চুক্তির জের টেনে চমৎকার কূটনৈতিক দক্ষতায় বাংলাদেশ ও তার স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি সোভিয়েত সরকারকে বোঝাতে সমর্থ হন যে, ভারতের মতোই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে একটি সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। পৃথিবীর সে সময়ের শীর্ষশক্তি সোভিয়েত সরকার ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক দাবিকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি। এখানেই ইন্দিরা গান্ধী তার বুদ্ধি দিয়ে পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন। রুশ ছত্রছায়ার ফলেই চীনের হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয়ভাবে সামরিক সাহায্য দেয়া শুরু করেন।

পাকিস্তানীরা বহির্বিশ্বে বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব আঁচ করতে পেরে, বাংলাদেশের রণাঙ্গনে জীবনবাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে বিশ্ব ভ্রমণে বের হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তার উদ্দেশ্য ছিল- পাকিস্তানীদের হাতে নির্মম হত্যাকা-ের শিকার লাখ লাখ বাঙালীর আর্তনাদ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীদের চিৎকার সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেয়া। তিনি চেয়েছিলেন, পাকিস্তানীদের অমানুষিক নির্যাতনের কারণে বাংলার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি বাঙালীর মানবেতর জীবনের কথা বিশ্ববাসীকে জানাতে। ১৯৭১ সালের ২৪ অক্টোবর ১৯ দিনের জন্য বিশ্ব সফরে বের হন ইন্দিরা গান্ধী। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের কাছে বাংলাদেশের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন তিনি। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, আমেরিকাসহ অনেক দেশে গিয়ে তাদের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। ৪ ও ৫ নবেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক হয় তার। নিক্সন বাঙালীর মহান মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ বলে হাল্কাভাবে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। বৈঠকেই এর তীব্র প্রতিবাদ জানান শ্রীমতি গান্ধী। পরের দিন, ৬ নবেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে আমেরিকার জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানী সামরিক সরকার ২৫ মার্চ পূর্ববাংলায় এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে। পাকিস্তানীদের চরম অত্যাচারের মুখে লাখ লাখ বাঙালী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পূর্ববাংলার মানুষ এখন স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার। তাদের নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে চালান দেয়া হয়েছে। ঘটনার অনিবার্যতা তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনে বাধ্য করছে।’ ৭ নবেম্বর তার ফ্রান্স সফরের আগে বৈঠকের প্রস্তাব দেয় পাকিস্তানী জান্তা ইয়াহিয়া খান। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন মিসেস গান্ধী। বাংলার অকুতোভয় তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মুগ্ধতা এবং নিপীড়িত বাঙালী জাতির প্রতি ভারতবাসীর গভীর ভালবাসার বহির্প্রকাশ ছিল এটি। মূলত ভারতের সরকারপ্রধানের এই বিশ্ব সফরের কারণেই বিশ্ববাসী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানী হানাদারদের পাশবিকতা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে জনমত গড়ে উঠতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

বাংলাদেশের লাখ লাখ শরণার্থীকে সেবাযতœ করায় ইন্দিরা গান্ধীর এ কাজকে যিশুখ্রিস্টের কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন নোবেল জয়ী মাদার তেরেসা। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের শরণার্থীদের শুধু আশ্রয় ও লালন পালনের দায়িত্ব পালন করেই যে চুপ ছিলেন তা কিন্তু নয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার সরকারের স্ব-স্ব স্থানে রিফিউজি ক্যাম্প এবং গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। রিফিউজির পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের রিক্রুট করে নিয়ে এসে ট্রেনিং দেয়া হয়। সবাই পায় গেরিলা প্রশিক্ষণ, ঘুরে দাঁড়ায় বাঙালী। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা সশস্ত্র অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতেন এবং একের পর এক অপারেশন চালাতেন। ইন্দিরা গান্ধী বিএসএফকে আন অফিসিয়ালি নির্দেশ দেন বাংলাদেশী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তি সংগ্রামে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করতে এবং তাদের এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়, সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কমান্ডো রেইড/ডেমোলিশনে দক্ষ ১০০ জন ব্যক্তি এবং কতিপয় অফিসার নিয়ে বিএসএফ কমান্ডো বাহিনী গঠন করে, যারা পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই পাকিস্তান বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালাত এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কার্যক্রমকে শ্লথ ও নস্যাত করে দিত। ভুটানের পর ভারতের পার্লামেন্টে বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একদিকে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সকল ধরনের সাহায্য সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণা দেয়। এই প্রতিকূল অবস্থাতে থেকেও সময়োপযোগী সাহসী সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখক: গবেষক
সৌজন্যেঃ দৈনিক জনকন্ঠ 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত