ব্যাটেল অব ইছামতি

318

Published on ডিসেম্বর 12, 2021
  • Details Image

জাহাঙ্গীর আলম সরকারঃ

আমি, এই প্রবন্ধ লিখতে যে তথ্য ব্যবহার করেছি তার অধিকাংশই পেয়েছি মিত্রবাহিনীর ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার প্রয়াত পিএন কাথাপালিয়া এবং ২১, রাজপুত ব্যাটেলিয়নের লে: কর্ণেল এস জি ডালভি সাহেবের সাথে আলাপচারিতা এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। তাদের দেয়া তথ্যের ব্যবহার করেই ইছামতির যুদ্ধ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারনা দেয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে পিএন কাথাপালিয়া যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়েই ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের শিলিগুড়ি থেকে ঠাকুরগাও এবং পঞ্চগড় দখলের পর রাতভর প্রচন্ড গোলাবর্ষণ করতে থাকে। যুদ্ধ চলতে থাকাবস্থায় শেষ রাতের দিকে পাকসেনারা ঠাকুরগাও থেকে পিছু হটতে থাকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাকসেনাদের কিছু অংশ সৈয়দপুরে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যায় আর একটি অংশ পিছু হটে গিয়ে দিনাজপুরের খানসামায় অবস্থান নেয়। দিনাজপুরের খানসামা থেকে নীলফামারী অল্প দুরত্ব বিবেচনায় সামনে দিকে ধাবমান মিত্রবাহিনী নীলফামারী সীমান্তে ইছামতি নদীর তীরে প্রবেশ করে। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বরের নীলফামারীর সবুজ প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইছামতির যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ডিসেম্বরের শীতে হিমালয়ের পাদদেশে মিত্রবাহিনীর ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার পিএন কাথপালিয়ার টার্গেট সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট দখল করা। দিনাজপুর জেলার খানসামা থেকে নীলফামারী মহকুমার দারওয়ানি সড়কের ইছামতি নদীর ব্রিজের পাশে সংঘটিত যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে ভারতের ৩৩, সৈন্যদলের জিওসি লে: জেনারেল এম এল থাপান এর আওতাধীনের ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার পিএন কাথাপালিয়া। কাথাপালিয়া ভারতের শিলিগিুড়ি হেডকোয়ার্টার থেকে বাংলাদেশের পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও ভায়া নীলফামারী দারওয়ানী হয়ে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট অবরুদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হতে থাকেন। ১৩ ডিসেম্বর ২১, রাজপুত ব্যাটেলিয়ান কর্তৃক খানসামা বিজয়ের পর তাদের প্রতি নির্দেশ এলা সৈয়দপুরের খানসামা-দারওয়ানী সড়ক জংসনের অক্ষ বরাবর ধেয়ে আসতে থাকা ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের অগ্রবাহিনী হবার। পরিকল্পনাটি ছিলো উত্তর-পূর্ব থেকে খানসামা-দারওয়ানী সড়ক বরাবর এবং উত্তর দিক থেকে রংপুর-সৈয়দপুর সড়ক বরাবর নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরকে ঘিরে ফেলার।

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর দিনের শেষভাগে ইছামতি যুদ্ধের দায়িত্ব নিলো মিত্রবাহিনীর ১২, রাজপুত রাইফেলস। পূর্ব পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনানিবাস ছিলো নীলফামারীর সৈয়দপুরে, এবং খানসামা থেকে সৈয়দপুর অভিমূখে মিত্রবাহিনীর যাত্রাপথে ইছামতি নদী ছিল একটি বড় প্রতিবন্ধক। পাকিস্তানী শ্রত্রুপক্ষ ইছামতি নদী বরাবর একটা শক্তিশালী, সুরক্ষিত প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলেছিলো। পাকিস্তানের ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ানের এই প্রতিরক্ষাব্যুহটি লোকালয়ের প্রতিরক্ষায় এর দুই প্রান্তে সুসংগঠিত এবং পরস্পর নির্ভর দুটি কোম্পানীর সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছিলো- একটি ইছামতি নদীতে, আরেকটি মোটামুটি ১০০০ গজ পূর্বে খড়খড়িয়া নদীর প্রান্তে। সে যাই হোক এই প্রবন্ধের শেষাংশে আমরা খরখড়িয়ার যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা করবো। ইছামতির যুদ্ধে আক্রমণের জন্যে ব্যাটেলিয়ানকে নিম্নোক্ত কয়েকটি ট্রুপে বিভক্ত করা হয়েছিলো। যথা- ক। আন্ডার কমান্ড ট্রুপ; খ। প্রত্যক্ষ সহায়তা ট্রুপ এবং গ। আকাশ পথ ট্রুপ। আন্ডার কমান্ড ট্রুপে ছিল একটি দুই ফৌজের কম ডি স্কোয়ড্রন (এ্যাডহক) এবং ৬৯, আর্মার্ড রেজিমেন্ট। একই সাথে ইছামতির যুদ্ধের জন্য প্রত্যক্ষ সহায়তা ট্রুপের আওতায় ছিল এক গোলান্দাজ বহরের কম ৯৮ মাউন্টেন রেজিমেন্ট, দুই গোলান্দাজ বহরের কম ৫৪, মাউন্টেন রেজিমেন্ট এবং ৫.৫ ইঞ্চি মাঝারি বন্দুকধারী সাবেক ৪৬, মিডিয়াম রেজিমেন্ট ফৌজ। একই সাথে আকাশ পথ ট্রুপসের আওতায় ছিল অন ডিমান্ড ক্লোজ সাপোর্টের তিনটি সর্টি এবং হেলিকাপ্টারবাহিত অন ডিমান্ড আকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।

খানসামা-দারোয়ানী সড়কের ব্রিজ এলাকা থেকে ১৩ ডিসেম্বর বেকেল ৪টায় আক্রমণ শুরু হলো, ভ্যানগার্ড (সর্বাগ্রে আক্রমণকারী বাহিনী) ছিলো ২১, রাজপুত ব্যাটেলিয়ানের একটি কোম্পনী। ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ২ টা পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাদের কোন সারা শব্দ পাওয়া গেলো না। ভ্যানগার্ড এবং সাজোঁয়া বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশগুলি জঙ্গল থেকে বের হবার সাথে সাথেই ইছামতি ব্রিজ থেকে স্বয়ংক্রিয় এবং কামানবিদ্ধংসী ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হলো। ভ্যানগার্ড বাহিনী তাৎক্ষনিকভাবে আক্রমণের নিশানা নির্ধারণ করে ফেললো এবং ইছামতি দখলের পরিকল্পনাও সেরে নেয়া হলো। পাকিস্তান বাহিনীর গোলা বর্ষণের ধরণ এবং মোতায়নকৃত সেনার সংখ্যা থেকে ৭১, মাউন্টেন ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার পিএন কাথাপালিয়া ধারণা করলের মোটামুটি একটা কোম্পানী (৮০-১৫০ জন সৈন্য) আর তার সহযোগী ট্রুপ নিয়ে তারা অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুরক্ষিত বাঙ্কারের ভেতর থেকেই আক্রমণ শুরু করছিলো। কাথাপালিয়া বুঝতে পারলেন সামনে থেকে আক্রমণ করে কোন ফায়দা হবে না। উত্তরদিক থেকে ব্যাটেলিয়ানের একটি ক্ষিপ্র আক্রমণের পরিকল্পনা ছিলো, কিন্তু নিম্নোক্ত কারণে তাদেরকে অগ্রসর হতে নিষেধ করেছিলেন পিএন কাথাপালিয়া। যথা- ক। মিত্র বাহিনীর মাউন্টেন গানগুলি অতটা দূরপাল্লার ছিলো না, এদিকে মিত্রবাহিনীর ইঞ্জিনিয়াররা খানসামা দখলের পর তখন পর্যন্ত বুড়ি তিস্তার ওপর একটি ভাসমান সেতু বানানোর প্রক্রিয়ায় ছিলেন, ফলে মিত্রবাহিনী নদী অতিক্রম করতে পারতো না এবং খ। মিত্রবাহিনীর আকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে জানিয়েছিলো নীলফামারীর ইছামতি নদীর ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে দিনাজপুর জেলার পাকেরহাটে শত্রুপক্ষের একটি সেনাবহরের গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বহর পাকেরহাট থেকে খানসামার দিকেই আসছিলো, ফলে ইছামতি ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলো। এই তৎপরতা মোকাবেলায় কাথপালিয়া ৫ জন গ্রেনেডিয়ারকে পাকেরহাট-সুটিপাড়া-দারওয়ানী রেলস্টেশন বরাবর রেললাইন ধরে দক্ষিণে রাজপুত রাইফেলসের দক্ষিন অংশের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে পাঠালেন পিএন কাথাপালিয়া।

ভারতীয় মিত্রবাহিনী ইছামতির যুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করলো। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২১, রাজপুত ব্যাটেলিয়ান ১০ নম্বর সীমানা পিলারের কাছে টার্ণ ইন নিলো যাতে পাকিসেনা বাহিনীর ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ানের গতিবিধি, তৎপরতা ও স্থাপনাগুলির অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং সুনির্দিষ্ট দুই ধাপে একটা সর্বাত্মক আক্রমণের পরিকল্পনা সফল করা যায়। প্রথম ধাপে ’ডি’ কোম্পানী ইছামতি ব্রিজ এলাকা দখলে নেবে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে ১৩-আর এলাকা দখলে নেবে ’সি’ কোম্পানী এবং ইছামতির পাশেই রিজার্ভ দুই ধাপোই ’বি’ কোম্পানী রিজার্ভে রেখে দিয়েছিলো ব্রিগেডিয়ার পিএন কাথাপালিয়া। একই সাথে এক প্লাটুনের ছোট একটা কোম্পানীকে দায়িত্ব দেয়া হলো যুদ্ধের দিক নির্ধারণ করে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কাছাকাছি একটি স্থান থেকে গোলাবর্ষণে সহায়তা করার জন্য। এ’ কোম্পানীর একটা প্লাটুন এবং তিন ট্রুপসের কম ডি’ স্কোয়াড্রনের দায়িত্ব পড়লো ইছামতি বরাবর পাকিস্তানের ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়নকে পেছন থেকে আক্রমণ করে ইছামতি ব্রিজের দুই পাশে এবং স্থানীয় মসজিদের সাথে আটকে ফেলার। গাছ পালার কারণে কিছু কিছু বসতবাড়ি মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছিলো না। ফলে মিত্রবাহিনী আকাশ পর্যবেক্ষণের সহায়তা নিলো। পাশাপশি বি’ কোম্পানীর পক্ষে এফইউপি-এর (সংগঠিত হওয়ার স্থান) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়ের প্রয়োজন ছিলো, কারণ এর জন্য একটা কঠিন এবং অরণ্যে ঢাকা দুর্গম অঞ্চল বরাবর এ্যাপ্রোচ মার্চ করতে হলো। সে যাই হোক পরিস্থিতির গতিময়তা এবং আমার নির্দেশনায় সকল সেনা সদস্যরা এক ঘন্টার মধ্যে এসে পৌছায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান নেয়। যুদ্ধের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘ডি’ কোম্পানী প্রথম ধাপের আক্রমণ শুরু করে ৪৮, পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে। পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ান সাংঘাতিক ক্ষিপ্রতা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলো এবং উভয়পক্ষই প্রাণপন যুদ্ধ চালালো। প্রায় ৩০ মিনিট পরেই পিএন কাথাপালিয়ার নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী অক্ষত অবস্থায় ইছামতি ব্রিজ দখল করে নিলো। মিত্রবাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা এতোটাই ছিলো যে ৩০ মিনিট পরেই ৪৮, পাঞ্জাব কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পরে। এক পর্যায়ে পাকসেনারা দ্রুতই খরখড়িয়া নদীর দিকে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে ইছামতির প্রান্তরে আর দ্বিতীয় ধাপের আক্রমণের প্রয়োজন হলো না মিত্রবাহিনীর। ইছামতি নদী তীরে পাকবাহিনীদের পরাস্থ করার মধ্য দিয়েই ইছামতি যুদ্ধের অবসান ঘটলো।

যদিও পাকসেনারা এই যুদ্ধে বিজয়ের লক্ষ্যে সর্বশক্তি দিয়েই শেষ চেষ্টা করেছিলো কিন্তু সফলতা পেলো না। নীলফামারীর সবুজ প্রান্তরে প্রচন্ড শীতে দিনের শেষভাগে সূর্যাস্তের আগে গোধুলী লগ্নে একটা মল্লযুদ্ধই সম্পন্ন হলো। পাকিস্তানের ৪৮, পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়নের প্রচুর সৈন্য মুহূর্তেই হতাহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। পাকিদের রক্তাত্ব নিথর দেহ পরে রইলো ইছামতি নদী তীরের নীলফামারীর সবুজ প্রান্তরে। ব্যাটেল অব ইছামতি বা ইছামতির যুদ্ধ বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেকটি ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে রইলো ইতিহাসের পাতায়।

লেখক: আইনজীবী ও পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

(মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত