এক বহ্নিশিখার নাম শেখ হাসিনা

498

Published on ডিসেম্বর 4, 2021
  • Details Image

জাহাঙ্গীর আলম সরকারঃ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বহ্নিশিখার নাম- শেখ হাসিনা। যিনি নিরলসভাবে চেষ্টা করে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পারলেও দেশটির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেয়ার সময় পাননি। ঘাতকরা তাঁকে হত্যা করলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এক বুক কষ্ট ও যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে সেই অসামাপ্ত কাজটি করার জন্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সংগ্রাম আর ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের এক বহ্নিশিখায় পরিণত করেছেন। যদিও দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতি সব সময় সরল পথে চলেনি। কাজেই প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছেন তিনি। আর এভাবেই শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে বাংলাদেশে একজন আদর্শিক রাজনৈতিক বাতিঘরে পরিণত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধা দেয় জেনারেল জিয়া। ফলে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন কাটান। ১৯৭৫-৮১ সময়কালের মধ্যে খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়াউর রহমানরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রত ছিল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এমনই অন্ধকাচ্ছান্ন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তখন কান্ডারীহীন নৌকা। জনগণের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম চালিয়েছেন। দেশের বাহিরে অবস্থান করেও তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানকালে শেখ হাসিনাকে দলের সভানেত্রী করা হয়। সভানেত্রী হওয়ার পর একই বছরের ১৭ মে তিনি সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন। শেখ হাসিনা মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতির বুকে চেপে বসা জগদ্বল পাথররে মত সামরকি শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাজপথে আন্দোলন, সংগ্রামের মাধ্যমে শেখ হাসিনা জনগণের হৃদয়ের কাছে চলে যেতে পেরেছিলেন। তিনি একমাত্র নেত্রী যিনি দীর্ঘ সময় রাজপথে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেন।

১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো দেশ শাসন করে শেখ হাসিনা প্রমান করেছেন শাসক হিসেবে তিনি সফল। তাঁর শাসনামলে তিনি দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছিলেন। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা জাতিকে স্বপ্নদর্শী করে তোলেন। শুধু তাই নয়; বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার সকল কর্মসুচি তৃনমূল থেকে শুরু করেন। পাশাপাশি তাঁর শাসনামলেই নারীর ক্ষমতায়নও বিশ্বে এক বিশেষ উদাহরণ স্থাপন করেছে। ২০০৯ সালের পর থেকে তিনি অদ্যাবধি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি তরুণদের কাছে প্রযুক্তি ব্যবহারের অবাধ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসোপযোগী করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নিয়েছেন।

শেখ হাসিনা বার বার বুলেট থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি তাঁর জীবন বাংলার মেহনতী মানুষের কল্যাণে উৎর্সগ করেছেন। রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণই তাঁর জীবন দর্শন। তিনি পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শুধু তাই নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশেরও প্রতিচ্ছবি তিনি। তাঁর রাজনীতির মূলমন্ত্র হলো জনগণরে জীবনমান উন্নয়ন। আর তাই বার বার স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক অপশক্তি তাঁর উপর হামলা চালিয়ে তাকে শেষ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরিছেনে। ২০০৪ সালে ঢকাস্থ বঙ্গবন্ধু অ্যাভনিউিতে আওয়ামী লীগরে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী সমাবেশে সবচে কলঙ্কতি ঘটনা ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রের যে আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করা হয় সেই গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালানো হয় শেখ হাসিনার উপর। ইতিহাসের বর্বরোচিত ওই গ্রেনড হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ নিহত হয় ২৪ জন আওয়ামী লীগরে নেতা-র্কমী। বিভীষিকাময় গ্রেনেড হামলায় আহত আরো শত শত মানুষ। শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল ওই হামলার প্রধান টার্গটে।

শেখ হাসিনার মতো অসংখ্যবার মৃত্যু ভয়কে উপক্ষো করে মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া নেতৃত্ব বর্তমান বিশ্বে বিরল। বাংলাদেশের পরম সৌভাগ্য যে, এদেশের মানুষ শেখ হাসিনার মত পরিশ্রমী, সৎ নেতা পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে উল্টোপথে চলা বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ কখনো মসৃন ছিল না। আর শেখ হাসিনাকে পথ চলতে হয়েছে আরো কঠিন পথে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন নির্বাচিত বা অনির্বাচিত শাসক শেখ হাসিনার মত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারনি। এই দিক বিবেচেনা করলে শেখ হাসিনা এমন এক রের্কড গড়েছেন যা এক কথায় অনন্য এবং অসাধারণ। শুধু অসাধারণই না এই ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা অদ্বিতীয়ও বটে।

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক থাকলে যে দেশের উন্নয়ন হয় তার প্রমাণ শেখ হাসিনা, তার প্রমাণ বাংলাদেশ। শুধু আন্তরিকতা শেখ হাসিনার শক্তি না। তিনি বিশ্বাস করেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা জাতি কখনো মাথা নত করে থাকতে পারেনা। যুদ্ধাপরাধী যারা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাই শুধু করেনি বরং হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট ও ধর্ষণেরে মত গুরুতর অপরাধ করেছিল তাদরে বিচারের আওতায় এনে বিচার করেছেন। বিচার করার পর বিচারের রায় কার্যকরও করেছেন তিনি। আর এই বিচার বাধাগ্রস্থ করতে শেখ হাসিনার উপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্ট করা হয়েছিলো। কিন্তু শেখ হাসিনার আপোষহীনতা ও দৃঢ়তায় সেটা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী জনৈক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করেও কোন যুদ্ধাপরাধীকে বাঁচাতে পারেনি। এখানইে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এবং দৃঢ়তার প্রতি সবার অকুণ্ঠ সর্মথন। শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনেনি বরং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার, জেল হত্যা মামলার বিচার করার মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বিদ্যুৎের অগ্রগতিতেও শেখ হাসিনার সাফল্য উল্লেখ করার মতো। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বিদ্যুৎের মত মৌলিক চাহিদার দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যুৎ তো দিতেই পারেনি উপরন্তু বিদ্যুৎের দাবিতে যে মানুষগুলো রাস্তায় নেমেছিল তাদেরকে গুলি করে হত্যা করেছে। সেই সময়ের সাথে বর্তমানের তুলনা করলে দেখা যায় শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিয়েছেনে এবং দ্রুতই বাংলাদশে বিদ্যুৎ সমস্যার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২২,৩৭৯ মেগাওয়াট। ২০১৯ সালের ২৯ মে তারিখে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১২,৮৯৩ মেগাওয়াট। সম্প্রতি তথ্য মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎের গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৪৮ লক্ষ। বর্তমানে দেশের ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎায়ন করা সম্ভব হবে শুধুমাত্র শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের কারণে।

শেখ হাসিনা তাঁর শাষন আমলে বাংলাদশে এমন কিছু উন্নয়ন করেছেন যা ছিল কল্পনাতীত। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে দেশপ্রেম থাকলে নিজেদের প্রচেষ্টায় পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত আমরা জানি পদ্মাসেতুর কাজটি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশের স্বপ্নের পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে তখন শেখ হাসিনা পিছু পা হননি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। অর্থনৈতৈকি অগ্রতিতে বাংলাদেশ প্রত্যাশার চেয়েও অধিক সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনা। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ৭ দশমকি ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি র্অজন করছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধির হার হতে যাচ্ছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৪ শতাংশ। ভাবলে অবাক হতে হয় গত ১০ বছরে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ৬ শতাংশের অধিক। আর এমন উচ্চ গতির প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ এই মুহুর্তে বর্তমানে আর একটিও নেই। বাংলাদেশের মোট জিডিপির পরমিাণ এখন ২৫০ বিলিয়ন ডলার। অবাক করার মতো ঘটনা ঘটেছে বিগত ১০ বছরে। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে দেশ ১০০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জন করছে। অথচ স্বাধীনতার পরবর্তী ৩৯ বছরে দেশের মোট জডিপি হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জন্য একটি আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর প্রথম এমন নজিরবিহীন বৈপ্লবিক উন্নয়নে প্রবেশ করেছে। পিতা মুজিব বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়রে সংগ্রাম করেছেন জীবনভর। তাঁর যোগ্য উত্তসুরী শেখ হাসিনাও একই পথের যাত্রী। হয়তো মৃত্যুর কবল থেকে প্রতিবার ফিরে এসেছেন অধিকার বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরির্বতনের জন্য। তাঁর কারণেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে এবং তাঁর হাত ধরইে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে শুধুমাত্র শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নে বিশ্ব রোলে মডেল। শেখ হাসিনা দেশকে উন্নয়নের ঐতিহাসিক দিক সন্ধিক্ষণে নিয়ে গিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে শেখ হাসিনা আজ অভিজ্ঞতায় অনেক সমৃদ্ধ। অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি অনেক শক্তিশালী। দৃঢ়তা, ধৈর্য, যেন তাঁর ব্যাক্তিত্বের সাথে একিভূত হয়েছে। শেখ হাসিনা বাঙালির ত্রানকর্তা হিসেবে নেতৃত্বের আসনে এসেছেন তাঁর মেধা, সাহস ও সততার কারণে। তাঁর মত জনদরদী জননেত্রী ভবিষ্যতে আসবে কি না সেটা কালের পরিক্রমায় ইতিহাস নির্ধারন করে দিবে।

লেখকঃ আইনজীবী ও পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

(মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ, উন্নয়ন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ১৯৮১, ১৯৭৫, ১৫ আগস্ট, 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত