বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা

1157

Published on আগস্ট 12, 2021
  • Details Image

খন্দকার হাবীব আহসানঃ

১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে; দেশীয় সামরিক- বেসামরিক ক্ষমতালোভী জোট এবং দেশী- বিদেশী স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় জুনিয়র কর্মকর্তার পরিকল্পিত সশস্ত্র আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন। নির্মম এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলো দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে। বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশকে স্বপ্নের সোনার বাংলা রুপে গড়ে তোলার সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন এমন সময়ে। প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকাণ্ডে যারা অংশ নিয়েছিলো তারা খোলা চোখেই এদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়েছে জাতির পিতার হত্যাকারী হিসাবে। হত্যা পরবর্তী সময়ে তাদের ক্ষমতাদখলের দৌরাত্ব, ঘাতকদের রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান সহ হত্যার বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি আইন প্রনয়ন ইস্যুতে হত্যাকারীদের পেছনের শক্তি ও মদতদাতাদের চরিত্র জনসম্মূখে আসে ৭৫ পরবর্তী সময় থেকে কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি আর স্বৈরশাষণের দাপটে হত্যায় দায় সংক্রান্ত আলোচনা পেছনে পড়ে যায়।

জাতির পিতা সপরিবারে হত্যা হলেন ১৫ ই আগস্ট ১৯৭৫; কিন্তু হত্যা সংক্রান্ত মামলা দায়ের হলো ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঠিক কি কারনে এদেশের জাতির পিতার সপরিবারে হত্যার বিচার তো দূরে থাক; মামলা পর্যন্ত হয়নি! পরিবারের দুজন কন্যা দেশের বাইরে থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও দেশে আসতে পারার পরিবর্তে প্রবাসে রিফিউজি জীবনযাপন করতে হলো এই সময়ে। সে সময়কালে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় যারা ছিলেন; তারা কোন স্বার্থেই বা হত্যাকারীদের বিচারের পরিবর্তে পুরষ্কৃত করলেন! এবং বিচার চিরতরে বন্ধের জন্য আইন প্রনয়ন করে সংসদে পাশ করালো! এ সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ঐ চক্রান্তে কারা কারা ছিলেন সে নামগুলো স্পষ্ট হয়।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। ১ মার্চ ১৯৯৭ সালে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়ে, বিচারে ১২ জনের ফাঁসির রায় চুড়ান্তভাবে বহাল হয়। আদালতের রায়ে এই ১২ জন খুনি কারা তাদের নাম উল্লেখ করছি কারন; হত্যাকাণ্ড ঘটানো পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেই বাকিদের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট হয়েছে। এমনকি ৭৫ এর ঘাতকদের উত্তরসূরিরা ২০০২-২০০৬ সাল অবধি এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য বন্ধে মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ রাখেন। মহামান্য আদালতের চুড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ড সাজাপ্রাপ্ত ১২ জন হলেন; ১- লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান; ২- লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান; ৩- মেজর বজলুল হুদা; ৪- লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি); ৫- লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার); ৬- ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদ; ৭- রিসালদার মোসলেম উদ্দিন; ৮- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল আজিজ; ৯- কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ; ১০- লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম; ১১- লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী; ১২- লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী।

১৫ ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মামলায় এজহারভুক্ত আসামী ছাড়া যেকজন সামরিক ও বেসামরিক রাজনৈতিক মানুষের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্টত হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম জিয়াউর রহমান। কিন্তু কিভাবে তিনি জড়িত, এবং জড়িত হয়ে থাকলে তাকে ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত করা যায় কিনা সে বিষয়ের আলোচনা অবশ্যই ইতিহাসের দায়। জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবন ও ৭৫ পরবর্তী স্বৈরশাষণ সহ রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হবে হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতার পরিধি।

ঘটনা ১- ১৯৭৬ সালে বিলাতের আইটিভি চ্যানেলের World in Action প্রোগ্রামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশীদের সাক্ষাৎকার দেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে অবগত ছিলেন, সেই তথ্যের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ এটিই। এই সাক্ষাৎকারে ফারুক-রশীদ দাবি করে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে ১৫ অগাস্টের বহু পূর্বেই জিয়াকে তারা অবহিত করে। ফারুক জানায়, “২০ শে মার্চ ১৯৭৫ সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটের দিকে সে জিয়ার বাসায় জিয়ার সাথে দেখা করে এবং তাকে বলে- The country required a change। উত্তরে জিয়া বলেছিলো, “Yes, yes, lets go outside and talk”। তখন জিয়া ফারুককে বাড়ির লনে নিয়ে গেলে ফারুক পুনরায় বলে, “We have to have a change. We, the junior officers, have already worked it out. We want your support and leadership”। জিয়া কৌশলে সাহস দিয়েই বলেছিলো, “If you want to do something, you junior officers should do it yourself …..”(Anthony Mascarenhas, Bangladesh – A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986)

ঘটনা ২ - ১৯৭৬ সালে জিয়া মাসকারেনহাস-কে এক সাক্ষাৎকার দেন। মাসকারেনহাস এর ভাষায়, “In July, 1976, while doing a TV programme in London on the killing of Sheikh Mujib, I confronted Zia with what Farook had said ”। কিন্তু জিয়া এ ব্যাপারে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। মাসকারেনহাসের উক্তিতে - “Zia did not deny it– nor did he confirm it”(Anthony Mascarenhas, Bangladesh– A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986)। এই সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া বা কৌশলী নিরবতা অবশ্যই ফারুকের সাথে জিয়ার কথোপকথন সত্য বলেই প্রমান করে।

ঘটনা ৩ - হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময়কালে ঢাকা সেনানিবাসে লেফট্যানেন্ট কর্নেল হিসেবে কর্মরত থাকা আমিন আহমেদ চৌধুরী, ২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর পাঁচটার দিকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সেনা কর্মকর্তা, মেজর রশিদের নেতৃত্বে; একদল সেনা তার বাড়ি ঘিরে ফেলে। আমিন আহমেদ চৌধুরী তখনো জানতেন না যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। মেজর রশিদের নেতৃত্বে সৈন্যরা আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং তৎকালীন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে যায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। জেনারেল জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান। জেনালের জিয়াউর রহমানের বাড়িতে প্রবেশের সময়ে রেডিওর মাধ্যমে আমিন আহমেদ চৌধুরী জানতে পারেন যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। "জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, 'শাফায়াত কী হয়েছে?' শাফায়াত বললেন, 'অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।' তখন জেনারেল জিয়া বললেন, “So what ? Let Vice President take over. We have nothing to do with politics

ঘটনা ৪- সত্যতার আরও প্রমাণ মেলে, অনেক বছর পরে ১৯৯৭ সালে যখন ফারুক জেলে আর রশীদ ইউরোপে। রশীদের সাথে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ এর সাক্ষাৎ হয় ইউরোপে। লিফশুলজের ভাষায়, “In 1997 I met Rashid for several hours in an European city… I went over with him exactly what he had told Mascarenhas about Zia’s involvement. Rashid confirmed to me the accuracy of his interview with Mascarenhas”। শুধু তাই নয় রশীদ লিফশুলজকে এ ব্যাপারে আরও অনেক বিস্তারিত জানায়। রশীদ জোরালোভাবে বলে যে, “He (Rashid) had met General Zia numerous times prior to the coup and that Zia was fully in the picture (In Conversation with Lawrence Lifschultz– The Daily Star, December 4, 2014)। উপরের ৪টি ঘটনা থেকে কয়েকটি বিষয় এখানে পরিষ্কার– বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে জিয়া পূর্বেই অবহিত ছিল; চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয়নি, বরঞ্চ চক্রান্তকারীদের উৎসাহিত করেছেন এবং সেই সাথে, আসন্ন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছে বা মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের ম্যাপে নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরির জন্য কৌশলী আচরণ করেছে।

হত্যাকাণ্ড পরবর্তী জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানঃ সেসময় রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর, সংবিধান মেনে ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি করা হয়নি। পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হয়েছিলো খন্দকার মোশতাক। আর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়েই খুনিদের সাথে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে জেনারেল জিয়াকে বানালো সেনাবাহিনীর প্রধান। এ হিসাবের মিলানোর জন্য পূর্বের ঘটানাগুলোতে উল্লেখিত- ‘আইটিভিতে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া ফারুকের সাক্ষাৎকারে জিয়ার সাথে কথোপকথনে ফারুককে জিয়ার উৎসাহ দেওয়া, ১৫ ই আগস্ট ভোরে কর্নেল সাফায়াত জামিলের ও লেফট্যানেন্ট কর্নেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর সামনে জিয়ার মন্তব্য, ১৯৭৬ সালে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া জিয়ার সাক্ষাৎকারে; ফারুকের পূর্বের মন্তব্যের প্রশ্নে জিয়ার নিরবতা, ১৯৯৭ সালে রশীদের সাথে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ এর সাক্ষাৎকারে জিয়ার সংশ্লিষ্টতা কথা’ বিবেচনা করলেই হিসাব স্পষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে খুনিদের সব ধরনের মদত দেওয়া, রাষ্ট্রীয় নিয়ম ভঙ্গ করেও খুনি ও তাদের পরিবারের সহযোগীতা করার সাথে পূর্বের ঘটনার লিংকেজ জিয়াউর রহমান এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

পরবর্তীতে মোশতাককে হটিয়ে জিয়াউর রহমান নিজস্ব পূর্ব পরিকল্পনায় নিজেই নিজেকে ঘোষণা দিয়েছিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে। খুনিরা শুধু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডই ঘটায়নি; ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে। জিয়াউর রহমানের পক্ষ থেকে খুনিদের জন্য সবচেয়ে সর্বোচ্চ পুরষ্কার হলো খুনিদের যাতে বিচার না হয়, সেজন্য ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করা। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দিয়ে সংশোধনীটি ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল; সংসদে পাস করে জিয়াউর রহমান।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু কন্যা উল্লেখ করেছিলেন ‘'১৯৮০ সালে আমি লন্ডনে যাই। রেহানা তার আগেই লন্ডনে গিয়েছিল। ৮০ সালের ১৬ আগস্ট আমরা লন্ডনে এই হত্যার প্রতিবাদে সভা করি। তখন সেখানে স্যার টমাস ইউলিয়াম কিউসি এমপি এবং নোবেল লরিয়েট শন ম্যাক ব্রাইট— তাদের নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সেদিনই সেই তদন্ত কমিশনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতায় সেই তদন্ত কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ব্রিটিশ এমপি অনেকে তখন আমাদের সহযোগিতা করেন। তিনি যখন ভিসা চান, জিয়াউর রহমান তখন রাষ্ট্রপতি। জিয়াউর রহমান কিন্তু টমাস উইলিয়ামকে ভিসা দেয়নি। জিয়াউর রহমান কেন ভিসা দিলো না। কেন তদন্ত করতে দিলো না, এই প্রশ্নটা থেকে যায়। কারণ, খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে সে ভয়ে ভীত ছিল।’ সে তদন্ত করতে দেয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তারা খুনিদের লালন-পালন করে গেছে।"( 16 August 2020, Bangla Tribune)

খুনিদের যে জিয়াউর রহমান লালন পালন করেছিলেন তার প্রামান হলো - হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত হত্যাকারী গোষ্ঠীর ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিলো মোশতাক- জিয়া। কে কোথায় চাকরি পেয়েছিলেন তার তালিকা: ১. লে. কর্নেল শরিফুল হককে (ডালিম) চীনে প্রথম সচিব, ২. লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, ৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, ৪. মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব, ৫. মেজর শাহরিয়ার রশিদকে ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, ৬. মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, ৭. মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে দ্বিতীয় সচিব, ৮. মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, ৯. কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, ১০. লে. খায়রুজ্জামানকে মিসরে তৃতীয় সচিব, ১১. লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডায় তৃতীয় সচিব, ১২. লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পূর্বে উল্লেখিত আদালতের রায়ে ১৫ ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্তদের তালিকার সাথে এই তালিকা সামঞ্জস্যতা কি প্রমাণ করে না যে, মোশতাক- জিয়া ৭৫ এর পর থেকেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে হত্যার বিচার বন্ধ নয় বরং খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করে চলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা কোন আকস্মিক ঘটনা নয় বরং দেশীয় পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি, ক্ষমতালোভী সামরিক কর্মকর্তা ও বৈদেশিক চক্রান্তের সমন্বিত নকশায় বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকে বিজয়ের বাস্তবতায় রুপদানের মহাপুরুষ, উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ায় স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানকে সুপরিকল্পিতভাবে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তার রক্তের উত্তরসূরি যে কেউ যে বাঙালির জাতির আত্মার আত্মীয় হয়ে এ রাষ্ট্রের অবিভাবক হয়ে উঠতে পারে; খুনিদের এই ধারনা ছিলো বলেই তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেছিলো। তবে তার সুযোগ্য কন্যা যে শুধুমাত্র বাঙালির অবিভাবক হয়েছে তা নয় জাতির পিতার খুনিদের বিচার সম্পন্ন করে বাঙালি জাতির দায় মুক্তির চেষ্টা করেছেন, অপরাধবোধ কমানোর চেষ্টা করেছেন মাত্র; কারন বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাঙালি জাতির এই দায় মুক্তির সুযোগ নেই। জিয়াউর রহমান ক্ষমতালোভে বঙ্গবন্ধু হত্যায় পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে এদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘৃণ্য সংস্কৃতির চর্চা শুরু করে। এ ঘটনা বাঙালি জাতির জন্য লজ্জার ইতিহাস। এমনকি তার ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসাবে খালেদা দিয়া এবং রক্তের উত্তরসূরি হিসাবে তারেক রহমান স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে আঁতাতের রাজনীতি ও হত্যা চক্রান্তের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতির চর্চা চালু রাখতে গিয়ে এদেশের রাজনীতি থেকে পথচ্যুত হয়েছেন। এটিই হয়তো ক্ষমতালোভে রক্তের রাজনীতির প্রতি ইতিহাসের অভিশাপ, দেশবিরোধী চক্রান্তে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিনতি।

লেখকঃ উপ বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত