বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা: বাঙালি জাতির মুক্তির সনদের পূর্বাপর

2119

Published on জুন 7, 2021
  • Details Image

প্রকৌশলী আজিজ সারতাজ জায়েদ:

পাকিস্তানের অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান ১৯৫৮ সাল থেকে ক্যু দে-তা’র বদৌলতে ক্ষমতা কুক্ষীগত করেন ১৯৬৯ সালের ২৬ মার্চ অবধি। পাকিস্তান মুসলিম লীগের একাংশকে নিজের আয়ত্বে এনে তিনি নতুন দল বানালেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন) এবং ২ জানুয়ারি, ১৯৬৫ তারিখের অনুষ্ঠিতব্য ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতির নির্বাচনে প্রার্থী হলেন সে দলের প্রতীকে। ২৭ অক্টোবর, ১৯৫৮ তে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দর মির্জাকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেই তিনি সামরিক আইন দেশব্যাপী জারি করেন যা ৮ জুন, ১৯৬২ তারিখে বাতিল করেন। এর কিছু দিন বাদে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের বৈধতা পুনরায় বলবৎ করেন। তখন পুরাতন মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) গঠন করেন। ২১ জুলাই, ১৯৬৪ তে খাজা নাজিমের আহ্বানে বিরোধী দলগুলির সম্মেলনে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির (কপ) আত্মপ্রকাশ ঘটে যারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবে। পিএমএল (কাউন্সিল), নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, জামাতে ইসলামী- এই ৫ দলের কপ, যার মনোনীত প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহ (পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহম্মদ আলি জিন্নাহ'র ছোটো বোন)। ১৯৬৫ নির্বাচনে কপের ৯ দফাকে “পাকিস্তানি জাতির মুক্তির সনদ” বলা হচ্ছিল।

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান করাচিতে মিস ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় ব্যস্ত। ঢাকা ও করাচিতে একচেটিয়া জয় লাভ করলেও ফাতিমা ২৮,৬৯১-৪৯,৯৫১ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। ২১ মার্চ, ১৯৬৫ তেও পিএমএল (কনভেনশন) জাতীয় পরিষদ এবং উভয় প্রদেশের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও কৌশলে বিজয় ছিনিয়ে আনে। নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে জনতার নজর ফেরাতে আইয়ুব ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫ কাশ্মীর ফ্রন্টে ভারত আক্রমণ করে বসেন যার পোশাকি নাম অপারেশন জিব্রাল্টার। ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫ তারিখে গোলাগুলি থামে এবং ১০ জানুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এলেক্সি কোসিগিনের মধ্যস্থতায় উজবেকিস্তানের তাসখন্দে আইয়ুব-শাস্ত্রী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং শর্তানুসারে উভয় দেশ ৫ অগাস্ট, ১৯৬৫ এর সীমানায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। অথচ সেপ্টেম্বর থেকে আইয়ুব প্রশাসনের নির্দেশে গণমাধ্যমে ফলাও করে কাশ্মীরে পাকিস্তানের জয় আসন্ন বলে উচ্চবাচ্য করা হচ্ছিল। ১৯৬২ তে চীন ভারত যুদ্ধে চীনের আকসাই কাশ্মীর দখলের সাফল্যে আইয়ুব ধরে নেন কাশ্মীর ভারতমুক্ত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে। তাই তাসখন্দ চুক্তি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই পশ্চিম পাকিস্তান জুড়ে আইয়ুবকে কাপুরুষ অভিহিত করছিল সাধারণ ও বিরোধী জোটগুলি। সমগ্র গোলযোগকালে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ একেবারেই অরক্ষিত থাকে এবং এ নিয়ে কেন্দ্রীয় পাক প্রশাসনের ন্যূনতম সহানুভূতি বা উদ্যোগ কিছুই ছিলো না। ১ নাম্বার বেঙ্গল রেজিমেন্ট কাশ্মীর ফ্রন্টে জান বাজি রেখে লড়াই করলেও বাংলার ভূমি সম্পূর্ণ ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে রেখেছিল প্রশাসন।

৬২, ৬৩, ৬৪ পরপর তিন বছর তিন নেতা যথা শেরে বাংলা হক সাহেব, গণতন্ত্রের মানসপুত্র তথা সোহরাওয়ার্দী সাহেব এবং খাজা নাজিমুদ্দীনের মৃত্যুতে শেখ মুজিবুর রহমান হঠাৎ একক আদর্শবাদী বিরোধী নেতা রূপে বঙ্গ রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। তাঁর বুঝতে বাকি রইলো না যে কেন্দ্রের মতলব কেবল এ প্রদেশের কাঁচামাল লুট করা, প্রতিরক্ষার পেছনে এতোটুকু খরচ করতে নারাজ। এ ভূখণ্ড পশ্চিমের এক কলোনিতে রূপ নিয়েছে এবং লাহোর প্রস্তাবের অবিলম্ব বাস্তবায়ন ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জানমালের সুরক্ষা বলতে কিছু থাকবে না। ‘৬৫ তে আইয়ুবের নির্বাচনের পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে মৌলিক গণতন্ত্রীদের উসকানিতে হিন্দু-মুসলিম এবং বিহারি-বাঙালি দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৫ ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ এই পত্রিকাগুলির প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম আসে "পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও"। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উদ্যোগে দেশের সুস্থ চেতনার জনতা একত্র হয়ে এ দাঙ্গা থামায়। ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে নতুন চাল দেওয়া হয় বিচারপতি হামুদুর রহমানের নিরীক্ষা কমিটির মাধমে। ১৯৬২ সালের "শরিফ শিক্ষা কমিশন" এর দমনমূলক সুপারিশগুলি পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বুকের রক্ত ঢেলে স্থগিত করালেও ঐ নিরীক্ষা কমিটি ‘৬৫ তে আবারো যাচাইবাছাইয়ের নামে নতুন উসকানি শুরু করে।

১-৩ এপ্রিল, ১৯৬৫ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের কাউন্সিল সভা হয় ঢাকায়, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। সম্মেলনের শেষ দিন ডাকসু ভিপি রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে পিকিংপন্থি সদস্যরা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মিলনায়তনে নতুন কমিটি গঠন করলে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে মস্কোপন্থি সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে পৃথক কমিটি গঠন করেন। ওদিকে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব বরাবরই সন্দিহান। তিনি অনুমান করতেন, আদর্শ নয় বরং মুসলিম লীগ প্লাটফর্মে যথাযথ সুবিধা না পাওয়ায় অনেকে আওয়ামী লীগে ঢুকেছে। কাজের সময় তাদের পাওয়া যাবে না। তাই স্বাধিকার আদায়ের প্রশ্নে মুজিবের একক ভরসা হয়ে ওঠে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারিতে তাঁর নিজ হাতে গড়া পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। যে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম, তাতে পরিষ্কার বলা আছে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের। অথচ এ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় মুজিব ক্ষুব্ধ হন। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীতে অন্তঃকলহ থাকলেও বাঙালি পীড়নে ঐক্যবদ্ধ তাঁরা!

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন কালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের উত্থাপিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবে পূর্ব বঙ্গ আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সায় না থাকলেও তরুণ নেতা শেখ মুজিব প্রকাশ্যে মোজাফফরকে সমর্থন জানান এবং তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ইশতেহারে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ১৯ তমতে প্রবিষ্ট হয়। ৫-৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ লাহোরে অনুষ্ঠিতব্য বিরোধী ৫ দলের এক সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। সম্মেলনের উদ্দেশ্য আইয়ুবের কাশ্মীর ফ্রন্টে চালানো স্টান্টবাজি ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক মুসলিম লীগ নেতা এবং তৎকালীন নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর লাহোরস্থ বাড়ির লনে তাসখন্দ চুক্তির ব্যর্থতা বিষয়ে “নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স” আহূত হয়। অপর চার দল- নূরুল আমীনের ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের প্রধান হলেন দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। এতে ৭৪৬ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২১ সদস্য, যাদের ১৩ জন আওয়ামী লীগ, বাকি ৮ জন অপর ৩ দলের প্রতিনিধি। ৪ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বিমানযোগে তেজগাঁও বিমান বন্দর হতে উড্ডয়নের পূর্বে শেখ সাহেবের বিবৃতি- "একমাত্র ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের শাসনতন্ত্র দ্বারা এবং অর্থনীতি, রাজনীতি ও দেশরক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিধানের দ্বারাই দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা যেতে পারে।" লাহোরে পৌঁছে আবারও একই বার্তা দেন যা পর দিন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত। ৫ তারিখে পিএমএল (কাউন্সিল) এর সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে কনফারেন্স শুরু হয়। তাঁর পূর্বে সাব্জেক্ট কমিটিতে সবাইকে স্তম্ভিত করে শেখ সাহেব ছয় দফাকে পরদিনের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেন। প্রায় সকলেই একযোগে মুজিবের এ আবেদন নাকোচ করে দেন। মুজিব যে ছয় দফা পেশ করবেন, সে সম্বন্ধে তাঁর সহচর প্রতিনিধিদের কারো আগাম ধারণা ছিলো না এক তাজউদ্দীন আহমদ ব্যতীত। মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় আওয়ামী লীগ পর দিন ৬ তারিখের কনফারেন্স বর্জন করে, যদিও নেতা মুজিব ১১ তারিখ পর্যন্ত লাহোরেই অবস্থান করেন। গোড়া থেকেই লাহোর সম্মেলনে শেখ মুজিব উপস্থিত হতে চান নি, ভেবেছিলেন শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল পাঠাবেন। কারণ, ৬ ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা হওয়ার কথা ছিলো এবং দলের অন্তঃপ্রাণ সদস্য শেখ সাহেব তাতেই হাজির থাকতে চেয়েছিলেন। তবে মানিক মিয়ার পরামর্শে তিনি মত পাল্টান এবং নিজের ইনার সার্কেলের সহায়তায় এই কনফারেন্স সামনে রেখে ছয় দফা প্রণয়ন করেন।

দাবিগুলোর সারাংশ ছিলো এমন,

দফা ১: ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থা হবে ফেডারেল অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি সর্বজনীন ভোটাধিকারের সুবাদে নির্বাচিত আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম।
দফা ২: ফেডারেল তথা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল দুইটি এখতিয়ার ন্যস্ত রইবে, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র বিষয়াবলি। অন্যান্য সকল বিষয়ের ভার অঙ্গরাষ্ট্রের সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
দফা ৩: মুদ্রা ও অর্থ সম্বন্ধীয় নিম্নবর্ণিত দু’টোর যে কোনো একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে-
(ক) দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা প্রচলিত থাকবে। দুই অঞ্চলে দুইটি স্বতন্ত্র স্টেট ব্যাংকের হাতে প্রাদেশিক মুদ্রানীতি নির্ধারণের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকবে।
(খ) উভয় অঞ্চলে প্রচলিত পদ্ধতির ন্যায় একটাই মুদ্রা থাকবে। সেক্ষেত্রে অঞ্চলদ্বয়ের মাঝে মুদ্রাপাচার বন্ধ করতে শাসনতান্ত্রিক আইন থাকতে হবে। দুই অঞ্চলে দুইটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক এবং একটি কেন্দ্রীয় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রানীতি প্রবর্তন করতে হবে।
দফা ৪: অঙ্গরাষ্ট্রগুলির হাতে নিজ নিজ অঞ্চলে কর ও শুল্ক আরোপ ও আদায়ের সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে। ফেডারেল সরকার কোনো রূপ কর ধার্যের অধিকারী থাকবে না। প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের নিমিত্তে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর রাজস্বের একটি আইনত নির্ধারিত অংশ ফেডারেল সরকার প্রাপ্য হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে প্রত্যেক অঙ্গরাষ্ট্র নির্দিষ্ট খাতে একই হারে চাঁদা জমা দেবে।
দফা ৫: পররাষ্ট্রিক বাণিজ্য বিষয়ক প্রস্তাবনা-
(ক) প্রত্যেক অঙ্গরাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের স্বতন্ত্র হিসাব নথিবদ্ধ থাকতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের বদৌলতে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সম্পূর্ণ এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাষ্ট্রের হাতে থাকবে।
(গ) ফেডারেল সরকারের জন্য দরকারি বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সকল অঙ্গরাষ্ট্র হয় সমান হারে অথবা সর্বসম্মত হারে মেটাবে।
(ঘ) অঙ্গরাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্যাদির অবাধ প্রবাহে শুল্ক বা করের বাধা থাকবে না।
(ঙ) অঙ্গরাষ্ট্রগুলি বিদেশে নিজস্ব বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ, বিদেশে বাণিজ্য মিশন স্থাপন, বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং আমদানিরপ্তানির পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হবে।
দফা ৬: শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সুরক্ষার নিমিত্তে নিজ নিজ অঙ্গরাষ্ট্রের এখতিয়ারে আধা-সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী অর্থাৎ মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি রক্ষীবাহিনী গঠন ও নিয়ন্ত্রণের আইন থাকবে।

লাহোরে যাওয়ার পূর্বে ইত্তেফাক পত্রিকার বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে শেখ সাহেব ছয় দফার যথাযথ প্রচারের ব্যবস্থা নিতে বলেন। ওদিকে ওয়ার্কিং কমিটির পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করান শেখ সাহেব। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৫ তারিখে প্রকাশিত সাপ্তাহিক মেঘনা পত্রিকায় সাক্ষাতকারে সে যাত্রায় নেতা মুজিবের অন্যতম সহযাত্রী আবদুল মালেক উকিল বলেন, ছয় দফা তিনি প্রথম দেখেন শেখ সাহেবের পকেটে একটা টাইপ করা কাগজে, কনভেনশনে যাওয়ার পথে। মাসুদুল হক লিখিত "বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে র এবং সিআইএ" পুস্তকের ভাষ্যমতে, ৪ তারিখ লাহোরগামী বিমানে ওঠার প্রাক্কালে ছয় দফার টাইপ করা অনুলিপি শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেন খুলনার রুহুল কুদস সিএসপি (পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১০ম আসামি)। প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বাইরে শেখ মুজিবের একান্ত বিশ্বস্ত সহচরদের নিয়ে গড়া ইনার সার্কেলে রুহুল কুদস ছাড়াও ছিলেন ভবিষ্যৎ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৬ষ্ঠ আসামি ঢাকার আহমদ ফজলুর রহমান সিএসপি। ছয় দফার প্রণয়নে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য পাওয়া যায় বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর বরাতে। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম সম্মেলনে যোগদানের পথে বঙ্গপিতার সফরসঙ্গী ছিলেন চৌধুরী সাহেব। তাঁদের কথোপকথনে উঠে আসে ছয় দফা প্রণয়নের মূল ইতিহাস। রুহুল কুদস ছিলেন কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ফিন্যান্স ডিরেক্টার (সিএসপি) এবং শেখ সাহেবের ইনার সার্কেলের বিশ্বাসী লোক। ছয় দফার খসড়াটি তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে প্রস্তুত করেন, অতঃপর ইউনাইটেড ব্যাংকের নির্বাহী সহসভাপতি বন্ধু খায়রুল কবিরের অফিস থেকে প্রিন্ট করানোর কালে বন্ধুর তাৎক্ষণিক পরামর্শে সপ্তম দফা জুড়ে দেন যাতে বলা ছিলো- প্রাদেশিক গভর্নরের নিযুক্তি হবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোটে, রাষ্ট্রপতির ইচ্ছানুসারে নয়। সাত দফার এ প্রিন্টেড খসড়া রুহুল সাহেব দেখান ইনার সার্কেলের আরেক সদস্য তাজউদ্দীন আহমদকে। রুহুল ও তাজউদ্দীন মিলে সেটি নিয়ে শেখ সাহেবের সাথে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেন খায়রুল কবির প্রস্তাবিত সপ্তম দফা বাদ দিতে হবে কারণ তা সংসদীয় রীতিবিরুদ্ধ। এ আলোচনা হচ্ছিল শেখ সাহেবের কর্মস্থল মতিঝিলস্থ আলফা বিমা কোম্পানিতে খাস কামরায়। অতঃপর শেখ মুজিবের স্নেহভাজন ভবিষ্যতের ঢাকা মহানগরের প্রথম নির্বাচিত মেয়র জনাব মোহাম্মদ হানিফকে দিয়ে ছয় দফা টাইপ করিয়ে প্রিন্ট করানো হয়। (সূত্র: ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩ তারিখের দৈনিক জনপদ, মাসুদুল হককে দেওয়া খায়রুল কবির এবং রুহুল কুদসের সাক্ষাৎকার)

৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখের পশ্চিম পাকিস্তানি পত্রিকায় ৬ তারিখের কনফারেন্সের বদলে ছয় দফা ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধকাল হতেই দেশে জরুরি অবস্থা এবং পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধি জারি ছিলো বলে কঠোর প্রেস সেন্সরশিপ বজায় ছিল। তাই পূর্ব পাকিস্তানের ৭ বা ৮ ফেব্রুয়ারির পত্রপত্রিকাতেও ছয় দফার তথ্য আসছিল না। ৯-১০ তারিখে উঠে আসে কনফারেন্সে ছয় দফার প্রত্যাখ্যানের সংবাদ পূর্ব প্রদেশে। আলফা বিমা কোম্পানির খাস কামরা থেকে ছয় দফার একটি প্রতিলিপি সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর হস্তগত হলে তিনি ঢাকার সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজ এ ছাপিয়ে দেন সেটি। ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ নেতা মুজিব ঢাকা ফেরার প্রাক্কালে পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিকদের জানান যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সম্মেলনের দলগুলির সাথে মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় মোর্চার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাসখন্দ চুক্তি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব জানান যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সাথে আলোচনা ব্যতিরেকে তিনি এ চুক্তির ব্যাপারে মন্তব্য করবেন না। (দৈনিক আজাদ, ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬)

১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে শেখ মুজিব লাহোরের সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ ও ছয় দফা বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা বিবৃত করেন সাংবাদিক সম্মেলনে। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসে ধানমন্ডি ৩২ এ শেখ মুজিবের বাসভবনে। নিউক্লিয়াসের নেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীদের উপস্থিতিতে ছয় দফা গৃহীত হয়। ১৬ মার্চ, ১৯৬৬ তারিখে রাজশাহীতে আইয়ুব খান দাবি করেন যে ছয় দফা হিন্দু আধিপত্যাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের নীল নকশা বৈ কিছু নয়।হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে ছয় দফা নিয়ে বাড়াবাড়ির জবাব অস্ত্রের ভাষায় দেওয়া হবে। ১৮-২০ মার্চ, ১৯৬৬ তিন দিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইডেনে। কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৮ মার্চ, ১৯৬৬ তারিখে "আমাদের বাঁচার দাবীঃ ৬ দফা কর্মসূচী" শীর্ষক পুস্তিকা প্রচারিত হয় কাউন্সিলে। অধিবেশনে ছয় দফা নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন ভাষাসৈনিক বাহাউদ্দিন চৌধুরী। ১৯ মার্চ, ১৯৬৬ তিন দিন ব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা অনুমোদিত। অনুমোদিত হলেও ছয় দফার প্রণয়নের পেছনে কারা রয়েছে সে ব্যাপারে দূরদর্শী মুজিব কৌশলগত নীরবতা পালন করেছেন।

২০ মার্চ, ১৯৬৬ কাউন্সিলের শেষ দিনে আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিত ঘোষিত হয় যাতে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদদ্বয় অলংকৃত করেন। সহসভাপতি পদে কমিটিতে আসেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক, ক্যাপটেন এম মনসুর আলী সহ প্রমুখ এবং সদস্য হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। লাহোরে সেই কনফারেন্সে যাওয়া ১৩ জন সদস্যের সকলে কমিটিতে স্থান পান। আবদুস সালাম খান প্রথমে ছয় দফার পক্ষে অবস্থান নিলেও নতুন কমিটিতে সভাপতি হতে না পেরে ক্ষুব্ধ হন এবং সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের সাথে জোটবদ্ধ হন। কাউন্সিল শেষে সভাপতি মুজিব প্রদেশব্যাপী ছাত্রলীগের তৎপরতায় ব্যাপক গণসংযোগ ঘটিয়ে ছয় দফাকে বাঙালির প্রাণের দাবিতে রূপান্তরিত করে ফেলেন মাত্র ২ মাসেরও কম সময়ে। ৮ মে গ্রেপ্তারের পূর্ব অবধি তিনি ৮ বার গ্রেপ্তার হয়ে প্রতিবারই জামিন নিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। ২০-২১ মার্চ ঢাকায় পিএমএল(কনভেনশন) এর কাউন্সিল অধিবেশনে আইয়ুব-মোনায়েম ছয়-দফা দাবিকে অস্ত্রের মুখে প্রতিহতকরণের হুমকি দেন। ১৩ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডি ৩২ এর বাসভবনে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ করে হতাশা ব্যক্ত করলেন দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতৃবর্গের ব্যাপারে। আপসকামী নেতা দ্বারা ছয় দফার বাস্তবায়ন অসম্ভব তাই ছাত্রলীগকে সম্মুখ ভূমিকায় আসতে হবে। জেলায় জেলায় ছাত্রলীগের তরুণদের ছয় দফার ব্যাপারে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টির কর্মসূচি নিতে হবে। ছাত্রলীগ প্রকাশিত "পাকিস্তানের আঞ্চলিক বৈষম্য" পুস্তিকা যার ভূমিকা লেখেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল হক বাকী এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক; তাতে শেখ মুজিবকে সংগঠনের আদর্শের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করা হয়। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ব বঙ্গের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে ইচ্ছুক থাকলেও ছয় দফা সমর্থন করেন নি। ৮ মে, ১৯৬৬ নারায়ণগঞ্জের সে যাবৎ ঐ দাবিতে বৃহত্তম জনসভা, যা রাত ৮ টা অবধি চলে, হতে ফেরার পরে ধানমন্ডি ৩২ এর বাসভবন হতে গ্রেপ্তার করা হয় শেখ সাহেবকে। এর আগে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ৮ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন, প্রতিবারই জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলেও সে রাতে "পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধি"র জামিন অযোগ্য ৩২(১)ক ধারায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিব, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ সহ অজস্র নেতাকর্মী কারাবন্দি হন। শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের স্থান হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, কিছু দিন বাদে তাজউদ্দীন আহমদ স্থানান্তরিত হন ময়মনসিংহ কারাগারে। কমিটির সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আমেনা বেগম যথাক্রমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নৌকার হাল ধরেন।

তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার "রাজনৈতিক মঞ্চ" কলামে মানিক মিয়া আইয়ুবীয় অপশাসনের স্বরূপ উন্মোচন করে যাচ্ছিলেন। ১০ মে, ১৯৬৬ এর মাঝেই প্রদেশব্যাপী আওয়ামী লীগের প্রায় ৩,৫০০ নেতাকর্মী আটক হন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছয় দফা সংবলিত ৫০,০০০ লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেন। ন্যাপের ছয় দফাপন্থিরাও "দৈনিক সংবাদ"এর ছাপাখানা থেকে ছয় দফার লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করতেন। ১৩ মে, ১৯৬৬ ছয় দফার সমর্থনে পল্টনের জনসভায় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ৭ জুন হরতাল আহ্বান করেন যা ২০ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের অনুমোদনক্রমে গৃহীত হয়। ২ জুন, ১৯৬৬ চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন এবং আফতাব আলী ও ফয়েজ আহমদের নেতৃত্বে আঞ্চলিক শ্রমিক ইউনিয়ন বর্ধিত সভা আয়োজিত হয় যা রাত দেড়টায় ধর্মঘট পালনে ঐকমত্যে আসে। ৬ জুন, ১৯৬৬ সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল মিছিল বের করে হরতালের সমর্থনে। সে রাতে পর দিনের হরতালের খবর প্রকাশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে পত্রিকা অফিসে নোটিশ যায়। ৭ জুন, ১৯৬৬ প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালনকালে কমপক্ষে ১১ জনের প্রাণহানি। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাথে একতা থাকায় গুলিস্তানে ঢাকা স্টেডিয়াম গেটের কাছে জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) এ পিকেটিং এ নামে। ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সহ অন্যান্যদের আটক করে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সকাল ৮ টায় তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের শ্রমিক সিলেটের মনু মিয়া পুলিশের বুলেটে শহিদ হন। ফলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা তেজগাঁও রেল স্টেশনে চট্টগ্রামগামী মেইল ট্রেন অবরোধ ও ভাংচুর করেন। আজাদ এনামেল এলুমিনিয়াম কারখানার শ্রমিক নোয়াখালীর আবুল হোসেন ইপিআর'এর গুলিতে নিহত হন। নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছে পুলিশের গুলিতে শফিক ও শামসুল হক সহ মোট ৬ জন শ্রমিক শহিদ হন। সন্ধায় কারফিউ এবং রাতে সহস্র গ্রেপ্তার। এই প্রথম আন্দোলনে ছাত্রদের সাথে শ্রমিক শ্রেণির একতা হল। সে দিন ভাসানী ছিলেন জয়পুরহাটের বুনা নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায়। মেহনতি মানুষের ওপর সরকারি হত্যাকাণ্ডের বার্তা তাঁর কানে পৌঁছতেই তীব্র প্রতিবাদ করেন যা প্রেস সেন্সরশিপ গলে পর দিন সংবাদ পত্রে আসতে পারে নি। ৮ জুন, ১৯৬৬ রাওয়ালপিন্ডিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এবং ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বর্জন করেন আওয়ামী লীগ সদস্যবৃন্দ। জাতীয় পরিষদে বিরোধী দল এনডিএফ পূর্ব পাকিস্তানে গুলিবর্ষণ সংক্রান্ত তিনটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও স্পিকার কর্তৃক বাতিল হয় সেগুলি। ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে মুলতবি প্রস্তাব স্পিকার প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সদস্যদের ওয়াক-আউট। মেহনতি মানুষের রক্ত ঝরায় ন্যাপ আর নীরব থাকতে পারে নি। বংশালস্থ ইস্ট পাকিস্তান প্রেস থেকে প্রকাশিত ন্যাপের প্রচারপত্রে লেখা হয়, "জালিমশাহীর গুলিতে আবার জনতার রক্ত ঝরিয়াছে।" সে দিন কেবল সরকারি প্রেস নোট ছাপাতে পেরেছিলো সংবাদ পত্রগুলি, হরতালবিষয়ক নিজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশ ছিলো নিষিদ্ধ। (স্বাধীনতার দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭০)

১৬ জুন, ১৯৬৬ ধানমন্ডির বাসা থেকে মানিক মিয়া গ্রেপ্তার হন, সে দিনই পূর্ব পাকিস্তানের কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খানের আদেশে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধির আওতায় ১ নং রামকৃষ্ণ মিশন রোডস্থ নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়, ফলে ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ। ১৮ জুন, ১৯৬৬ ঢাকা প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী এবং স্বতন্ত্র সদস্যবৃন্দ ১ টি মুলতবি ও ১ টি অধিকার প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার আবদুল হামিদ চৌধুরী উভয়ই বাতিল করে দেন। সেপ্টেমবরের মাঝে ৯,৩৩০ জন আওয়ামী লীগের কর্মী কারারুদ্ধ করে ফেলেন গভর্নর মোনায়েম খান। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৬ রাজনীতির ওপর থেকে আইয়ুবের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়। ৩০ এপ্রিল, ১৯৬৭ ঢাকায় এনডিএফ নেতা আতাউর রহমান খানের বাসায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান এর প্রস্তাবে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) এ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাথে যোগ দেয় এনডিএফ, পিএমএল (কাউন্সিল), জামায়াতে ইসলাম এবং নেজামে ইসলাম পার্টি- এই পাঁচ দল। এ জোটের ভিত্তি ৮ দফা যাতে সংসদীয় গণতন্ত্র, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের সীমিত হস্তক্ষেপের উল্লেখ ছিলো। পরদিন ১ মে, ১৯৬৭ তারিখের পত্রিকায় এ জোট সম্বন্ধে বিস্তারিত ছাপা হলে সে খবর ঢাকায় কারাবন্দি মুজিবের চোখে পড়ে। এটি পরিষ্কার ৬ দফা থেকে বিভাজন তৈরির চক্রান্ত কারণ চাইলেই দাবিগুলিকে ৬ এ সীমাবদ্ধ রাখা যেতো যা না করে ইচ্ছা করে ৬ আর ৮ এর মাঝে জনসমর্থন ভাগাভাগির নিয়ত পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন শেখ মুজিব। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধুর লেখনী থেকে পাওয়া যায়, খন্দকার মোশতাক কেন্দ্রীয় এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে ঐক্য ধরে রাখার নাম করে ৮ দফার পিডিএম'এ যোগ দিতে ইচ্ছুক। তাজউদ্দীন, শাহ মোয়াজ্জেম, শেখ মণি আর অধিকাংশ কারাবন্দি ছাত্রনেতা ছয় দফার বাইরে কোনো কিছুতেই রাজি নন বলে সাফ জানিয়েছেন। সালাম-তর্কবাগীশ-মুজিবুর রহমান (রাজশাহী) জোট পিডিএম'এ যোগদান করেন। ২২ জুন, ১৯৬৭ সাংসদ ডক্টর আলিম আল রাজির প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী খাজা সাহাবুদ্দীন জানান যে রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সম্প্রচার যথাসম্ভব কমানো হয়েছে এবং তাঁর যেসব রচনা তথাকথিত পাকিস্তানি আদর্শের পরিপপন্থি, সেগুলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৪ জুলাই, ১৯৬৭ পূর্ব পাকিস্তানে প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখে খাজা সাহাবুদ্দীন তাঁর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করে নেন। ১৯ অগাস্ট, ১৯৬৭ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় সিদ্ধান্ত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পিডিএম'এ যোগদান করবে না। সভায় তর্কবাগীশ, আবদুস সালাম, মুজিবুর রহমান (রাজশাহী) সহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে দলের সিদ্ধান্ত ছাড়াই পিডিএম'এ যোগদানের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৩ অগাস্ট, ১৯৬৭ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সভাপতি নসরুল্লাহ খান পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির কাউন্সিল সভায় ১৯ তারিখের সভা অবৈধ ঘোষণা করেন এবং তর্কবাগীশ ও মুজিবুর রহমানকে (রাজশাহী) যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন এড হক কমিটি ঘোষণা করেন, যার অন্যতম সদস্য ফরিদপুরের আবদুস সালাম খান। ২৭ অগাস্ট, ১৯৬৭ ছয় দফা পন্থিরা পাল্টা সভা ডেকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন যাতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে শেখ মুজিবুর রহমান ও আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ৩০ নভেম্বর ১৯৬৭ রংপুরে ন্যাপের বিশেষ অধিবেশন ভাষণে ভাসানী দাবি করেন ছয় দফায় মেহনতি মানুষের লাভ নেই, পাকিস্তানি পুঁজিপতিদের পরিবর্তে বাঙালি পুঁজিপতিদের বসানোর ছক কি না সেটাও ভাবা দরকার। দলে মস্কোপন্থিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগে ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেনকে বহিষ্কার করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ ন্যাপের মস্কোপন্থিরা ঢাকায় কাউন্সিল আয়োজন করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত করে নতুন ভাগ তৈরি করেন। ডিসেম্বর ১৯৬৭, আইয়ুব খান ঢাকা আসেন এবং চন্দ্রঘোনা কাগজ কল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা থাকলেও সামরিক গোয়েন্দাসূত্র জানায় রাষ্ট্রপতির বিমানে হামলা চালানোর পরিকল্পনা আছে। তাই সফর বাতিল হয়। তথ্য সচিব আলতাফ গওহরকে আইয়ুব তখন সখেদে জানান যে, “ওরা আমাদের সাথে আর থাকবে না”। এরই মাঝে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উদ্ঘাটনে ইন্টেলিজেন্স অনেক দূর এগিয়ে গেছে সে কথা তখনও আইয়ুব খানকে জানানো হয় নি। ২২ ডিসেম্বর, ১৯৬৭ আইয়ুব খানের কার্যালয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পৌঁছে যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদের মূল হোতা মোয়াজ্জেমকে চিহ্নিত করা হয়। ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনের মাধ্যমে তিনি সিএসপি, সামরিক অফিসার ও রাজনীতিকদের সাথে যোগাযোগ রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেনাপ্রধান আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের পরামর্শে শেখ মুজিবুর রহমানকে জড়িয়ে যেন এ দেশদ্রোহের মামলা সাজানো যায় সে জন্য মগবাজারে সেফ হোমে রাজবন্দিদের ধরে এনে অমানুষিক অত্যাচার চালানো হতে থাকে মিথ্যা সাক্ষ্যের আশায়। কাউকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধির অধীনে, কাউকে প্রতিরক্ষা কর্মে সম্পৃক্ত আইনের আওতায় পাকড়াও করা হচ্ছিল কমান্ডো স্টাইলে। আইয়ুব চাচ্ছিলেন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হোক। জানুয়ারি, ১৯৬৮ হৃদযন্ত্রে মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়ে শয্যাশায়ী হন আইয়ুব। এদিকে তথ্য সচিব আলতাফ গওহর এবং সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া বৈঠকে বসেন। ইয়াহিয়া চাইলেন প্রকাশ্য বিচার। যেহেতু মুজিবকে জড়িয়ে এ মামলা সাজাচ্ছে পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স, তাই প্রকাশ্যে মুজিবের বিচার করলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি উত্তপ্ত হবে। ফলে ঘোলাটে পরিস্থিতে আইয়ুবের পতন ঘটলে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার মসনদে বসা ত্বরান্বিত হবে। গওহর আপত্তি জানিয়ে বলেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রকাশ্য বিচারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বানোয়াট মামলার অসঙ্গতি বের করে ফেলবে। ইয়াহিয়া আশ্বস্ত করেন মামলা সাজানো হয়েছে নিশ্ছিদ্রভাবে। এ বৈঠকের খবর ইয়াহিয়াকে জানিয়ে গওহর অনুরোধ করেন মুজিবকে এ মামলায় টেনে জাতিকে বিভক্ত করলে এর বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে, ইয়াহিয়ার সামরিক সমর্থন ছাড়া আইয়ুবের চলবে না তাই শেখ মুজিবকেই ১ নাম্বার আসামী করে ১৮ জানুয়ারি, ১৯৬৮ তারিখে মামলার অভিযোগপত্র গঠন করা হয়। ওদিকে ১৭ জানুয়ারি দীর্ঘ কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ঘটতে না ঘটতেই জেলগেট থেকে তাঁকে ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে সামরিক জিপে তুলে পুনরায় কারারুদ্ধ করতে নিয়ে যাওয়া হয় কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে। (আলতাফ গওহর রচিত “The Last Days of United Pakistan”, পৃষ্ঠা ৪০৮-৪২১)

ডোমিনো ইফেক্টের মতো অতঃপর আগরতলা মামলা হতে বেকসুর খালাস, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনের হাত ধরে একাত্তরে বিশ্বমানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ যার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত