৭ মার্চের ভাষণ- স্বাধীনতার প্রাথমিক ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি

1907

Published on মার্চ 6, 2021
  • Details Image

খন্দকার হাবীব আহসানঃ 

স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বাধীনতার মুক্ত আকাশ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের দেখার সুযোগ হয়নি। শোষিত নিষ্পেষিত এই বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের কন্ঠ,স্বপ্ন বুননের কারিগর শেখ মুজিবুর রহমান শোষণ থেকে মুক্তির এই লড়াইকে স্বাধীনতার বিজয়ী গল্পে পরিনত করেছেন সাহসী নেতৃত্বগুনে গণমানুষের প্রয়োজনে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শোষণ বিরোধী মুখপাত্র ছিলেন বাঙালির মুজিব ভাই।ভাষার জন্য সংগ্রাম থেকে শুরু করে অবহেলিত এই জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য কারাবরণকে তুচ্ছজ্ঞান করে তিনি ছিলেন আপোষহীন নেতা। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম শেষে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ১৬০ টি আসনে এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে ২৮৮ আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্বেও পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের কূটকৌশল অবলম্বন করে বাঙালি জাতির উপর নির্যাতন-নিষ্পেষন অব্যাহত রাখে।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশ্য ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণ শুরুর পূর্বে উপস্থিত সংগ্রামী জনতার 'স্বাধীন করো স্বাধীন করো-বাংলাদেশ বাংলাদেশ' 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো'স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব' 'শেখ মুজিবের পথ ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো'স্লোগানই ইঙ্গিত দেয় বঙ্গবন্ধুর নিকট সমবেত জনতার স্বাধীনতা সংগ্রামের দাবী কতটা আত্মীক ছিলো।

ভাষণের শুরুতেই বাঙালির মুজিব ভাই সমবেত লাখো জনতাকে পারিবারিক ও আত্মিক সম্পর্ক সুলভ'ভাইয়েরা আমার' সম্মোধন করে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্যাতনের শিকার বাঙালির রক্তে রঞ্জিত রাজপথের কথা স্মরণ করে তাঁর দুঃখ ভারাক্রান্ত মনের কথা ব্যক্ত করেন। বাংলার গণমানুষের সাথে আত্মিক ভাতৃত্ব বোধের সম্পর্ক থেকেই তিনি পরিস্থিতি অনুধাবন করে বলেছিলেন-'আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়,বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়,বাংলার মানুষ অধিকার চায়'।

পাকিস্তানের অর্জিত স্বাধীনতা যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তির পরিবর্তে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তা ২৩ বছরে বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস,মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস এবং বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস হয়ে উঠেছে তা কষ্টের সাথে তুলে ধরেন।

১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির রক্ত দিতে হয়েছে,১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে সরকার গঠন করলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রাদেশিক সরকারকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে গর্ভনর শাসন চালু করে,১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান 'মার্শাল ল' জারি করে বাঙালি জাতিকে গোলাম করে রাখে,১৯৬৬ সালের ৭ই জুন ৬ দফার তীব্র গণআন্দোলনে মনু মিয়া,শফিক,শামসুল হক সহ ১১ জন বাঙালি ছেলেদের গুলি করে হত্যা করে ইপিআর ও পুলিশ, এসকল কষ্টের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ আক্ষেপে উল্লেখ করেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নিয়ে দেশে শাষণতন্ত্র-গণতন্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে,তারপর আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন।নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার না পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ১৫ ফেব্রুয়ারী তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর কথা না রেখে ভুট্টো সাহেবের কথা মত মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশনের কথা উল্লেখ করলে বঙ্গবন্ধু মেনে নিয়ে বলেছিলেন অ্যাসেম্বলি আলোচনায়,যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেবো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন আক্ষেপ করেই বলেন,কি পেলাম আমরা!জামার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রু আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে!পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙালিরা ক্ষমতায় যেতে চাইলেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এদেশের মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে।বঙ্গবন্ধু সামরিক শাসকদের ভাই সম্মোধন করে বলেন,আপনারা কেন আপনার ভাইয়ের বুকে গুলি মারবেন! আপনাদের রাখা হয়েছে যদি বহিঃশত্রু আক্রমণ করে তা থেকে দেশটাকে রক্ষা করার জন্য।

বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে টেলিফোনের কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে বলেন তাকে আমি বলেছিলাম ,ইয়াহিয়া খান সাহেব আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দেখে যান ঢাকায় আসেন, কিভাবে গরীবের উপরে আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলি করা হয়েছে! কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে! কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে! আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন তারপর আপনি ঠিক করুন। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানকে যৌক্তিকভাবেই দোষারোপ করে বলেন, তিনি আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে ৫ ঘন্টা গোপন বৈঠক করে অ্যাসেম্বলি বক্তৃতায় সমস্ত দোষ আমার উপর দিয়েছেন বাংলার মানুষের উপরে দিয়েছেন। যদিও বঙ্গবন্ধু অ্যাসেম্বলি মিটিং এ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

উপস্থিত জনতাকে ভাই সম্মোধন করে বঙ্গবন্ধু বলেন ভাইয়েরা আমার, ২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে, রক্তের দাগ শুকাই নাই, ওই শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে মুজিবুর রহমান অ্যাসেম্বলিতে যোগদান করতে পারেনা। বঙ্গবন্ধু আঙ্গুল উচিয়ে বজ্রকন্ঠে বলেন অ্যাসেম্বলি কল করেছেন আমার দাবী মানতে হবে, প্রথম সামরিক আইন-মার্শাল ল ইয়থ ড্র করতে হবে,সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত দিতে হবে।যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে।আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।তারপর বিবেচনা করে দেখবো আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এরপূর্বে আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারি না।জনগণ সে অধিকার আমাকে দেয় নাই।শেখ মুজিবুর রহমান যে জনগণের হৃদস্পন্দন বুঝেই দায়বদ্ধতা নিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত গণতান্ত্রিক নেতা হয়েছিলেন এই উক্তিগুলো তারই প্রমাণ।

বঙ্গবন্ধুর উপর বিশ্বাস আছে কিনা জানতে চাইলে সমবেত সকলেই উচ্চস্বরে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দিলে বঙ্গবন্ধু জানান, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, এদেশের মানুষের অধিকার চায়।আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে এরপর হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।তোমাদের যাকিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী যেকোন সময় তাকে গ্রেফতার করতে পারে এমন অনুমান করেই তিনি বলেন,রাস্তা ঘাট যা কিছু আছে আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চক্রান্ত অনুধাবন করতে পেরেই শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নিরস্ত্র বাঙালিদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানি মিলিটারিদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তোমরা আমার ভাই তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালানোর চেষ্টা করোনা, ভালো হবেনা। ৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, আমরা যখন মরতে শিখেছি কেউ আমাদের দাবাতে পারবেনা। বঙ্গবন্ধুর এই অদম্য উক্তি শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয় বাঙালি জাতির সর্বকালের গর্জে ওঠার তুমুল শক্তি।

'যে পর্যন্ত এদেশের মুক্তি না হবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো,কেউ দেবে না' কথাটি একদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে যেমন একটি অসহযোগ আন্দোলনের হুশিয়ারি দেওয়া অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করুক বা না করুক তিনি যে ইতিমধ্যেই বাঙালির একক অবিসংবাদিত নেতায় পরিনত হয়েছেন তারই প্রমাণ।

বঙ্গবন্ধু সম্ভাব্য সংঘাত এড়ায়ে সুষ্ঠভাবে সমাধানের সম্ভাবনা রেখে বলেন, আপনারা আমাদের ভাই আপনারা দেশকে একবারে জাহান্নামে ধ্বংস করে দিয়েন না,যদি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে পারি তাহলে অন্ততপক্ষে ভাই ভাই হিসাবে বাস করার সম্ভাবনা আছে। বঙ্গবন্ধু হুশিয়ারী কন্ঠে কৌশলে অনুরোধ উচ্চারণ করে বলেন, আপনারা এদেশে আর মিলিটারি শাসন চালানোর চেষ্টা করবেন না।

২য় কথা হিসাবে উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশ দেন-প্রত্যেক গ্রামে,প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে,প্রত্যেক সাব ডিভিশনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।স্মরণ করান- মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

২য় কথা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর কন্ঠে উচ্চারিত এদুটি বাক্যই মূলত স্বাধীনতার প্রাথমিক ঘোষণা।সেই অর্থে বঙ্গবন্ধু প্রথম কথা হিসাবে নিরস্ত্র বাঙালিদের রক্ত যাতে আর না ঝরে সেজন্য সমাধানের সম্ভাবনাকে রেখেছেন।কিন্তু বাঙালির মুক্তির জন্য সংগ্রামের চুড়ান্ত মুহুর্ত যে এটাই তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

ভাষণের শেষভাগে বঙ্গবন্ধু তাঁর আজন্ম আত্মার আত্মীয় বাঙালির উপর ভরসার কন্ঠে বলেন, আপনারা আমার উপরে বিশ্বাস নিশ্চয় রাখেন, জীবনে আমার রক্তের বিনিময়েও আপনাদের সঙ্গে বেইমানি করি নাই।প্রধানমন্ত্রীত্ব দিয়ে আমাকে নিতে পারে নাই। ফাঁসি কাস্টে আসামি দিয়েও আমাকে নিতে পারে নাই।যে রক্ত দিয়ে আপনারা একদিন আমাকে জেলের থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন, এই রেসকোর্স ময়দানে আমি বলেছিলাম,আমার রক্ত দিয়ে আমি রক্তের ঋণ শোধ করবো।সমবেত সংগ্রামী জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন,মনে আছে? পরক্ষণেই তিনি বলেন, আমি রক্ত দেবার জন্য প্রস্তুত।

বক্তৃতা শেষে সালাম জানিয়ে বাঙালির গর্জে ওঠার শক্তিমন্ত্র 'জয় বাংলা' বলে সমাপ্তি ঘটান ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভার ভাষণের,
যেই ভাষণের প্রতিটি ধ্বনি মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামরত মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বার সংগ্রাম চালিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার প্রেরণা শক্তি হিসাবে কাজ করে নয়টি মাস জুড়ে।

লেখক: উপ বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক,  বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত