নেপথ্যে ইতিবাচক শক্তির উৎস শেখ রেহানা

1961

Published on জানুয়ারি 11, 2021
  • Details Image

এম নজরুল ইসলামঃ

জগত্সংসারে এমন কিছু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিজেদের নিয়ে কখনো উদগ্রীব হননি। আবার কখনো পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেদের আলোকিত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আড়াল করে রেখেছেন সব কিছু থেকে। এমন নির্মোহ থাকা সবার জন্য সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক আবহে যাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের পক্ষে নিভৃত জীবন কাটানো একেবারে অসম্ভব বলেই মনে হয়। তবে নিতান্ত সাদামাটা জীবনে যাঁরা অভ্যস্ত, ক্ষমতা তাঁদের মোহভঙ্গের কারণ হতে পারে না কখনো। এমনই এক আড়ালচারী মানুষ শেখ রেহানা।

নিজের বড় বোন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেখ রেহানা এক আশ্চর্য শক্তিবলে এই পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে রেখেছেন নিজেকে। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও সব সময় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। তাই বলে তাঁকে রাজনীতিবিচ্ছিন্ন কিংবা রাজনীতিবিমুখ ভাবারও কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট রাজনীতিসচেতন শেখ রেহানা আড়াল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। কয়েক বছর আগে লন্ডনে বসে বাংলাদেশের এক অনলাইন নিউজ পোর্টালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানুষ তাঁর উত্তরাধিকার দেখতে চায়।’ অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ মানুষের রাজনৈতিক আবেগের সঙ্গে তিনি সহমত পোষণ করেন। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে দেশে আলোচনা হচ্ছে। শেখ রেহানা বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এভাবে : ‘জয় যদি রাজনীতিতে আসে, তাহলে রাজনীতির প্রতি এ সময়ের মেধাবী প্রজন্মের আকর্ষণ বাড়বে বলেই মনে করি। মেধাবী প্রজন্মকে রাজনীতিমুখী করতে জয়ের মতো তরুণরা রোল মডেলের ভূমিকা রাখতে পারে। এটিকে আমাদের উৎসাহিত করা উচিত।’ তাঁর এই মন্তব্যের সঠিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। ওই সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা বলেছেন, ‘আজকের এই আধুনিক যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে দেশপ্রেমিক, শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এই দাবিকে যাঁরা উপেক্ষা করবেন, দেশবাসীর সামনে তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

শেখ রেহানা খুব ভালো করেই জানেন, ক্ষমতার চেয়ার অনেক সময় অনেক মানুষকে বদলে দেয়। সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন তিনি। না, নিজেকে বদলানোর কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। তাঁর মতে, ‘কোনো ক্ষমতাই বঙ্গবন্ধুর সন্তানদের বদলাতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। জনগণের মধ্যে থেকে, তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আমার বাবা হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনক। আমরা সেই বঙ্গবন্ধুর সন্তান। জনগণের মধ্যে এখনো আমরা খুঁজে ফিরি আমাদের মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের। সেই জনগণের ভালোবাসা নিয়েই জীবনের বাকি সময়টুকুও পাড়ি দিতে চাই।’ কোনো ক্ষমতা বা পদ-পদবির প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে ওই সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা বলেন, ‘আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া—আমরা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। এই লন্ডনেও যখন রাস্তায় বের হই, তখন দেখি বিভিন্ন বর্ণের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সম্মান করছে। সঙ্গে নিয়ে একটি ছবি তুলতে চাইছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে আমাদের।’ কী অকুণ্ঠ উচ্চারণ!

জাতির জনকের কন্যা তিনি। কিন্তু জীবনটা তাঁর জন্য সহজ হয়নি। জীবনের অনেকটা পথ রীতিমতো লড়াই করেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে। বলতে গেলে জীবনের শুরুতেই জীবনযুদ্ধের সৈনিক তিনি। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সে হারিয়েছেন মা-বাবা, ভাইদের। হারিয়েছেন স্বদেশের আশ্রয়। আশ্রয়হীন পরিবেশে দেশে দেশে ঘুরেছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিল না কোথাও। ছিল না নিশ্চিত জীবন যাপনের নিশ্চয়তাও। লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে। উপার্জনের জন্য নিজেকে নিযুক্ত করতে হয়েছে নানা কাজে। কিন্তু কোনো দিন ভেঙে পড়েননি। পারিবারিকভাবে যে ঐতিহ্যের ধারক তিনি, সেই ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছেন জীবনের সব ক্ষেত্রে। ধানমণ্ডির বাড়িটি ফেরত দেওয়ার ভেতর দিয়েও সেই উদারতার পরিচয় মেলে। ২০০১ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্তে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর হোল্ডিংয়ের এক বিঘার একটি পরিত্যক্ত বাড়ি প্রতীকী মূল্যে শেখ রেহানার কাছে বিক্রি দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল। বাড়িটি তাঁর নামে নামজারিও করা হয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর বিনা নোটিশে ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ রেহানার বাড়িটির দখল নেয়। তখন তাঁর পক্ষ থেকে বাড়িটি হস্তান্তরের জন্য হাইকোর্টে রিট করলেও জোট সরকার প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে ২০০৩ সালের ২৭ মার্চ বাড়িটি ঢাকা মহানগর পুলিশকে বরাদ্দ দিয়ে দখল বুঝিয়ে দেয়। ২০০৫ সালের ২৭ জুন বাড়িটিকে ধানমণ্ডি থানা কার্যালয়ে পরিণত করা হয়। ধানমণ্ডির ৬ নম্বর সড়কে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়িটি বৈধ মালিকানায় ফেরত পাওয়াটা শেখ রেহানার জন্য অতি সহজ ছিল। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো হাইকোর্টের রিট মামলা প্রত্যাহার করে নিয়ে সরকার থেকে পাওয়া বাড়িটি সরকারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন ২০১২ সালের ১০ মার্চ। বাড়িটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে ভোগদখলের প্রয়াসী না হয়ে শেখ রেহানা জনস্বার্থে বাড়িটির ব্যবহারকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে শুধু মহানুভবতার পরিচয়ই দেননি, ঔদার্য ও নির্মোহ-নির্লোভ চরিত্রের এক বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন।

১৯৭৫ সালে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাতি ছিল স্তম্ভিত, দিকনির্দেশনাহীন। জাতির জনক নিহত। ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির বিচার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা সব সময় ভাবতেন। ১৯৭৯ সালের জুন মাসে একদিন হঠাৎ শেখ রেহানা চিন্তা করেন, প্রখ্যাত আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়ামস কিউসিএমপি তো তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বিশিষ্ট কৌঁসুলি ছিলেন। তাঁকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলা করা যায়। এ ব্যাপারে তিনি টেলিফোনে দিল্লিতে বড় বোনের সঙ্গে পরামর্শ করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ রেহানা অংশ নিতে যাচ্ছেন—এমন গুজবও মাঝেমধ্যে শোনা যায়। ওই অনলাইন নিউজ পোর্টালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘রাজনীতি করার অধিকার তো সবার রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবার বা প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়ার কারণে কেউ তো নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে না।’

তিনি নিজে কি রাজনীতিতে আসছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ রেহানা বলেছেন, দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার পরীক্ষায় যাঁরা উত্তীর্ণ, তাঁদের বঞ্চিত করে তিনি কোনো পদ-পদবি গ্রহণ করবেন না। জনিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে তিনি এটা করতে পারেন না। ওই সাক্ষাৎকারে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ, ‘আমি শুধু আমার সাধ্যানুযায়ী মানুষকে সাহায্য করে যেতে চাই।’

বিশ্বসংসারে এমন আড়ালচারী কিছু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। এই বিরল শক্তির মানুষরা নিজেদের নিয়ে কখনো ভাবিত হন না। পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেদের আলোকিত করার সব সুযোগ ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও থাকতে পারেন মোহমুক্ত। এমন নির্মোহ থাকা কি সবার দ্বারা সম্ভব হয়? শেখ রেহানা সেই বিরল স্বভাবের আড়ালচারী মানুষদের একজন. যিনি নেপথ্যে থেকেও সুস্থ রাজনৈতিক ধারার আন্দোলন-সংগ্রামে ইতিবাচক শক্তির উৎস।

দেশমাতৃকার বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে তাঁর কাছে এ আশাবাদ নিবেদন করা যেতেই পারে। জয়তু শেখ রেহানা।

লেখক : সর্ব-ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত