৭ই মার্চের ভাষণের সামরিক দিক

1351

Published on ফেব্রুয়ারি 26, 2021
  • Details Image

মোহাম্মদ হাননানঃ

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে লাগাতার অসহযােগ আন্দোলনের প্রাক্কালে ৭ মার্চের আগেই ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ ৩রা মার্চ স্বাধীনতার কর্মসূচি নাম ও অন্যান্য প্রস্তুতি ঘােষণা করেন। এর মধ্যে ছিল- দেশের কী হবে, দেশের আয়তন ও ভৌগােলিক সীমানা, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার বিবরণ। একই সঙ্গে জারি করা হয়েছিল যুদ্ধের কতকগুলাে সামরিক ধাঁচের নির্দেশাবলিও :

পাকিস্তান উপনিবেশবাদী শক্তির সেনাবাহিনীর এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে
আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।...
মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে।...
অবাঙালি সেনাবাহিনীকে শত্রুসৈন্য হিসেবে গণ্য করা এবং
এদের খতম করতে হবে ।...
আক্রমণরত শক্তিকে প্রতিরােধ করতে সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করতে
হবে ।
স্বাধীনতা সংগ্রামরত বীরদের সাহায্য ও সহযােগিতা প্রদান করতে হবে।

একই দিন (৩ মার্চ ১৯৭১) পল্টন ময়দান থেকে সামরিক স্লোগান তুলে বলা হয়, 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর', 'গ্রামে গ্রামে দুর্গ গড়, মুক্তিবাহিনী গঠন কর।' বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চে দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন। এদিন তিনি সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতিসহ সব নির্দেশাবলি দান করেছিলেন।

তিনি পাকিস্তানিদের কাছে যে চারটি শর্ত উত্থাপন করেছিলেন তার তিনটিই ছিল সামরিক বিষয়াদিঃ

১. সামরিক আইন মার্শাল ল' withdraw করতে হবে
২. সামরিক বাহিনীর সমস্ত লােকদের ব্যারাকের ভিতর ঢুকতে হবে
৩. যে ভাইদের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে, তার তদন্ত করতে হবে।
[দৈনিক ইত্তেফাক ও আজাদ, ৮ মার্চ ১৯৭১]

বক্তৃতায় বাঙালি জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশাবলির সামরিক প্রস্তুতির বিষয়গুলােও লক্ষণীয় :

১. যার যা আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করতে হবে
২. ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােলে [দৈনিক ইত্তেফাক ও আজাদ, ৮ মার্চ ১৯৭১]।

এ ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি যুদ্ধ ঘােষণা। এরপর স্বাধীনতার লক্ষ্যে যুদ্ধ ঘােষণার আর কিছু বাকি থাকে না।

সেদিন অনেকে ভেবেছিলেন ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণের নির্দেশ দেবেন; কিন্তু তিনি উন্মত্ত ছিলেন না। জনগণকে তিনি যে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন, তা ছিল অসাধারণ সামরিক বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক এক রাজনীতিকের। প্রতিটি বাঙালি সেদিন তার এই সামরিক প্রস্তুতির তাৎপর্য অনুভব করেছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমানও এর তাৎপর্য বুঝেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন :

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘােষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল' বলে মনে হল।' [কর্নেল জিয়াউর রহমান, একটি জাতির জন্ম, দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ ১৯৭২, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২]

এ থেকে বােঝা যায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অবস্থিত বাঙালি সামরিক অফিসাররাও বঙ্গবন্ধুর এই সামরিক সিগন্যালকে ধরতে পেরেছিলেন। এর ফলেই ২৫ মার্চের রাতের পর দ্রুতই বাঙালি সেনা অফিসাররা প্রতিরােধ যুদ্ধে নামতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছাত্ররাও ৭ মার্চের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ডামি রাইফেল দিয়ে সামরিক ট্রেনিং শুরু করে দেয়। এ বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয়তা গৌরবােজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে।

৭ মার্চের ভাষণের প্রভাব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ শুক্ত হওয়ার আগে কী রকম হয়েছিল, তার দু-একটি উদাহরণ টানা যায়। পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ১৫ মার্চ কর্মীদের মধ্যে এক বিশেষ গােপন সার্কুলার প্রচার করেছিল। এতে পূর্ব বাংলার সর্বশেষ পরিস্থিতির আলােকে সশস্ত্র লড়াই ও বিভিন্ন কর্মসূচির প্রস্তুতি সম্পর্কে আলােকপাত করা হয়। সার্কুলারে বলা হয় :

জাতি আজ বুঝিতে পারিয়াছে যে, একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রামেই সে স্বাধীনতা অর্জন করিতে পারে এবং সেইজন্য নিজস্ব উদ্যোগে সশস্ত্র হইবার চেষ্টা করিতেছে।...
আমরা আজ এক যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্যে রহিয়াছি। এ যুদ্ধ জাতীয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করিতেছি এবং জয়যুক্ত হইতে চাই।
শ্রেণী শত্রু খতমের লাইন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখিতে হইবে।..
বিশ্বের বর্তমান স্তরে আমাদের স্লোগান হইল 'জাতীয় শত্রু খতম কর'।
বর্তমান অবস্থায় সরাসরি আওয়ামী লীগের বিরােধিতা মােটেই ঠিক হইবে না।
গ্রামেই সর্বপ্রথম স্বাধীন সরকার ঘােষণা করিয়া তথায় কৃষকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে ।
এই স্বাধীন রাজ্য দীর্ঘদিন যাবত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকিতে পারে। সেইজন্য স্থানীয় মুক্ত সরকারের নেতৃত্বে এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করা, যাহাতে কৃষক-জনতার ওপর স্থানীয় সামন্তবাদী শােষকদের শােষণ বন্ধ হয়। স্থানীয় সামন্তবাদী গােষ্ঠীকে প্রথমেই আমরা আক্রমণ করিব না।...
এই সংগ্রামের ভিতর দিয়া সমগ্র সংগঠনটিকে একটি রেডগার্ড সংগঠনে পরিণত করিতে হইবে ।
[সার্কুলার নং-১, পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন, ১৫ মার্চ ১৯৭১]।

৭ মার্চের ভাষণের পর বিমানবাহিনীর সাবেক জোয়ানরা ১৮ মার্চ ঢাকায় শহীদ মিনারে এক সমাবেশ করে বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের মতাে রূপ দেয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। প্রাক্তন উইং কমান্ডার বাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় সশস্ত্র সংগ্রামের বাস্তব কর্মসূচি নিয়ে কর্তব্য কাজে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানাে হয়। তারা দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন :

আমরা সৈনিক ছিলাম, আমরা জানি কী করে শত্রুকে আঘাত করতে হয়। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে আমরা জনতাকে যুদ্ধপরিচালনা শিক্ষা দেব। কেবল নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছি। আমরা স্বাধীন বাংলা বিমানবাহিনী গঠন করব। [দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ, ১৯ মার্চ ১৯৭১]।

প্রাক্তন স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার। পরিকল্পনার কথাও তারা উল্লেখ করেন। 

১৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু ও কর্নেল ওসমানী ঢাকায় এক গােপন বৈঠকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক পর্যালােচনা করেছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক অফিসারও এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গােপনে দেখা করে নির্দেশাবলি গ্রহণ করেছিলেন। [বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরােধ আন্দোলন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৮৬, পৃ. ৪১৯-৪৪০]।

বাঙালি সামরিক অফিসারদের প্রথম বিদ্রোহঃ

৭ মার্চের ভাষণের পর নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন জয়দেবপুরের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও স্থানীয় জনসাধারণ যৌথভাবে। ১৯ মার্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ জয়দেবপুরে অবস্থানরত এক ব্যাটালিয়ন বাঙালি সৈন্যকে অস্ত্রসমর্পণের নির্দেশ দেয়; কিন্তু বাঙালি সৈন্যরা এ নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন। ঢাকা থেকে একদল পাঞ্জাবি সৈন্য এ নির্দেশ কার্যকর করতে গিয়েছিল। এ খবর আশপাশের গ্রামগুলােতে ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হকের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ বাঙালি বিদ্রোহী সেনাদের পক্ষে লড়ার জন্যে রাস্তায় নেমে আসে। গ্রামবাসী ব্ৰাস্তাগুলােতে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। জয়দেবপুরে অবস্থিত অস্ত্র নির্মাণ কারখানার রাস্তাও গ্রামবাসী বন্ধ করে দেয় । [স্বাধীনতার দলিল, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬৭] এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচারে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায় । কিন্তু পাল্টা গুলিও শুরু হয়ে যায়। কমপক্ষে ২০ জন এতে নিহত হয় ।

এদিনের এক সরকারি ভাষ্যে বলা হয়,

ঢাকা থেকে প্রায় ২২ মাইল দূরবর্তী জয়দেবপুরে স্থানীয় জনসাধারণ এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ফলে উভয়পক্ষের লােকই হতাহত হওয়ার পর উক্ত এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর জনৈক কমান্ডার ১৯ মার্চ বিকেলে জয়দেবপুরে অবস্থানকারী সৈন্যদের নিয়মিত পরিদর্শন শেষে ঢাকা আগমনের পথে বাধা পান। এখান থেকেই গণ্ডগোলের সূত্রপাত। জনতা জয়দেবপুর বাজারে রেলক্রসিংয়ের ওপর যে ট্রেনটি এনে রেখেছিল, তাদের তা সরাতে বলা হলে তারা এ নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করে। এরপর সৈন্যরা ট্রেনটি ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলে জনতা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে ৩ জন সৈন্য গুরুতরভাবে জখম হয়। সৈন্যরাও পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে ২ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়। ফলে জয়দেবপুরের উত্তেজিত জনতা সৈন্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। সৈন্যদের গাড়ির চাকা নষ্ট করে দেয়া হয় এবং জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়। জনতা সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্রাদি কেড়ে নেয়ার জন্য অগ্রসর হলে সৈন্যরা গুলিবর্ষণ করে। ফলে ১ জন নিহত হয়। এরপর উক্ত কমান্ডার এবং তার সৈন্যরা ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে অন্তত অর্ধডজন প্রতিবন্ধক সরিয়ে সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌছায় । [সরকারি তথ্য বিবরণীর ভাষ্য, ইত্তেফাক, ২০ মার্চ ১৯৭১]।

২০ মার্চের সংবাদ এবং আজাদ রিপাের্ট করে :

পাকিস্তানি সৈন্যদের একখানি গাড়ি বেশন সংগ্রহ করতে গেলে জনগণ বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বঙ্গবন্ধু এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেন :
সামরিক কর্তৃপক্ষ যেখানে বলে বেড়াচ্ছে তাদের সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে, সেখানে জয়দেবপুরের এক বাজারে গিয়ে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালাল কিভাবে? [দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, ২০ মার্চ ১৯৭১]

১৯ মার্চ ছাত্র ইউনিয়ন শােষণমুক্ত স্বাধীন বাংলা কায়েমের সংগ্রাম দুর্বার করে তােলার জন্য একটি প্রচারপত্র বিলি করে। এতে বলা হয় :

আমরা জনগণের এই মহান বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামকে সঠিক নীতিতে অগ্রসর করিয়া লইয়া এখন একটি স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানাইতেছি, যে রাষ্ট্রে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি জনগণের প্রকৃত আশা- আকাক্ষা পূরণের পথ উন্মুক্ত হইবে।

প্রচারপত্রটির বক্তব্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যে মূল লড়াইটা তা জনগণকে বােঝানাে :

এই সংগ্রাম পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, পূর্ব বাংলার অবাঙালিদের বিরুদ্ধেও নয়। এই সংগ্রাম পরিচালিত করিতে হইবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগােষ্ঠী ও উহাদের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। [স্বাধীনতার দলিল, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৩৩]

৭ মার্চের ভাষণে দেয়া বঙ্গবন্ধুর সামরিক প্রস্তুতির ফলাফল বেরিয়ে আসে ২০ মার্চ। এদিন পূর্ব বাংলার রাজধানীতে ঘটে আরেকটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। এদিন ছাত্র ইউনিয়নের ট্রেনিংপ্রাপ্ত শত শত গণবাহিনী রাজপথে ডামি রাইফেল কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে। এ দৃশ্য ছিল ঢাকার মানুষের কাছে নতুন। জনতা বাঙালি ছাত্র যুবকদের অস্ত্র হাতে নিয়ে কুচকাওয়াজ করতে দেখে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে এবং করতালির মাধ্যমে বাংলার যুবশক্তিকে অভিনন্দন জানায়।

এর আগে সকাল সাড়ে নয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ছাত্র ইউনিয়ন গণবাহিনীর প্রথম শিক্ষাশিবিরে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। দশ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিক্ষাশিবিরের সমাপ্তি ঘটে এবং পরদিন রােববার ২১ মার্চ থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শুরু করার ঘােষণা দেয়া হয়। এ সময় রৌদ্রকরােজ্জ্বল ময়দানে মােট ১২টি প্লাটুনে বিভক্ত হয়ে গণবাহিনীর সদস্য সদস্যাগণ প্যারেড, শরীরচর্চা ও রাইফেল কলাকৌশল প্রদর্শন করেন। প্রদর্শনীর আগে অবশ্য ছাত্র ইউনিয়নের পতাকা উত্তোলন করা হয় ও গণবাহিনীর সদস্যদের শপথ গ্রহণ করান সংগঠনের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ। গণবাহিনী প্রিয় মাতৃভূমি পূর্ব বাংলাকে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগােষ্ঠী, বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়াবাদী পুঁজির শােষণ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিক কৃষক জনতার মুক্তির পথ উন্মুক্ত করার শপথ গ্রহণ করে। ছাত্র ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক ছাত্রী কর্মীও এদিনের রাজপথের রােড মার্চে অংশ নেয়। [দৈনিক আজাদ, ২১ মার্চ ১৯৭১]।

বঙ্গবন্ধু এদিন ঐতিহাসিক 'লাহাের প্রস্তাব দিবস' উপলক্ষে ২৩ মার্চ বাংলায় ছুটি ঘােষণা করেন। উল্লেখ্য, ২৩ মার্চ এ যাবত 'পাকিস্তান দিবস' হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল ।

জয়দেবপুরে জনতা-সেনাবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধের পর যে কারফিউ জারি করা হয়েছিল, তা একটানা ম্যারাথন গতিতে চলতে থাকে। এদিনের সংবাদপত্রের রিপাের্ট অনুযায়ী এই ম্যারাথন কারফিউ ২৯ ঘণ্টা চলার পরও তুলে নেয়া হয়নি। এর মধ্যে জনগণকে ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয়নি, বের হলেও তাদের প্রতি গুলিবর্ষণের নির্দেশ ছিল।

২৩ মার্চ কর্মসূচির প্রধান আকর্ষণ ছিল পল্টন ময়দানে সকাল ৯টায় জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও মহড়া। প্রতিরােধ দিবস পালন উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই অনুষ্ঠানের আয়ােজন করে। 'আমার সােনার বাংলা আমি তােমায় ভালােবাসি' সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে 'জয় বাংলা' বাহিনীর কুচকাওয়াজ শুরু হয়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা 'জয় বাংলা' বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে জয় বাংলা বাহিনীর দুটি দল যুদ্ধের মহড়া প্রদর্শন করে। কুচকাওয়াজ শেষে এই বাহিনীর ও উপস্থিত জনতার বিরাট একটি অংশ মার্চ করতে করতে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে উপস্থিত হয়। বঙ্গবন্ধু এখানে জয় বাংলা বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন । [দৈনিক আজাদ, ২৪ মার্চ ১৯৭১]।

আধাসামরিক ইপিআর-এর ওয়্যারলেস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা

৭ মার্চের ভাষণের প্রতিক্রিয়া এভাবে ধাপে ধাপে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পেীছে। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করলেন, কখন দেশবাসীর কাছে তার সেই বাণী পৌছে দিতে সহায়ক হয়ে উঠল আধাসামরিক বাহিনীর একটি ওয়্যারলেস সেট। পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৫ মার্চ রাতে কামান, মর্টার ও রাইফেল ইত্যাদি নিয়ে অতর্কিতে বাঙালির ওপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু তখন গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তার সর্বশেষ বাণী বাংলার মানুষের কাছে পাঠান এই মর্মে :

This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people to Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.
[স্বাধীনতার দলিল, ৩য় খণ্ড]
[এই-ই হয়তাে তােমাদের জন্য আমার শেষ বাণী। আজকে থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যে যেখানেই থেকে থাকো, যে অবস্থায় থাকো, হাতে যার যা আছে, তা-ই দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরােধ গড়ে তােলাে। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে, যতদিন পর্যন্ত না দখলদার পাকিস্তানিদের শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে ।]

এ প্রসঙ্গে জেনারেল টিক্কা খানের জনসংযােগ অফিসার সিদ্দিক সালিক সাক্ষ্য দিয়েছেন :

পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের (ওয়েভ লেংথ-এর) কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকেও ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের এই ঘােষণা ক্ষীণ কণ্ঠে ভেসে উঠেছিল। [সিদ্দিক সালিক, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল (ভাষান্তর : মাসুদুল হক), ঢাকা : নভেল পাবলিকেশন্স, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৮৫]। সিদ্দিক সালিক ১৯৭১ সালে ঢাকায় হানাদার পাকিস্তানিদের গণসংযােগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন- লেখক।

বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন ইপিআর ওয়্যারলেসযােগে স্বাধীনতার ঘােষণা প্রচার করছিলেন, তখন সবে পাকবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হচ্ছে। এরা ফার্মগেট এসে পৌছামাত্র প্রতিরােধের সম্মুখীন হয়। তারপর তারা পিলখানায় ইপিআর ও রাজারবাগে পুলিশের দুর্গ দুটিতে আক্রমণ চালায়। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে এ খবর পেয়েছিলেন। ফলে তিনি আরেকটি বার্তা ঢাকার টিঅ্যান্ডটি মারফত পাঠান। ঢাকার টিঅ্যান্ডটির (টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন) এক্সচেঞ্জ তখনাে খােলা ছিল। সর্বশেষ যে বার্তাটি তিনি পাঠান, তাতে বলা হয়ঃ

পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তর আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর আক্রমণ করেছে। সমস্ত শক্তি জড়াে করে প্রতিরােধ করুন আর স্বাধীনতার জন্যে প্রস্তুতি নিন। [রবার্ট পেইন : ম্যাসাকার (বাংলাদেশ- গণহত্যার ইতিহাসে ভয়ংকর অধ্যায়, ভাষান্তর : গােলাম হিলালী), ঢাকা : ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রকাশের তারিখ নেই, পৃষ্ঠা ১৬-১৭]

বস্তুত এভাবে বঙ্গবন্ধুর উক্তিতেও বাণীবদ্ধ হয়ে আছে আধাসামরিক বাহিনী ইপিআর (বর্তমান বিডিআর) ও পুলিশ বাহিনীর স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগের কথাটি। আর সেদিন বঙ্গবন্ধুর বাণীও দেশবাসীর কাছে পৌছে দিয়েছিল এই আধাসামরিক বাহিনী। অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সেদিন তারা দেশবাসীর কাছে বঙ্গবন্ধুর বাণী পৌছে দিয়ে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরােধ যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে নিহত হয় অসংখ্য ছাত্র, পুলিশ, সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য এবং ইপিআর বাহিনীর বাঙালি স্বাধীনতাকামী সদস্যরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হল (জহুরুল হক হল), রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরে এসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরদিন ২৬ ও ২৭ মার্চ সারা দিনই রাজধানী ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্র ও বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে প্রকাশ্যে খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। ঢাকা সেনানিবাস থেকে বাঙালি লেফটেন্যান্ট আনােয়ার হােসেনের নেতৃত্বে তেজগাঁও ড্রাম ফ্যাক্টরির কাছে ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ ও ছাত্র-শ্রমিকদের এক বিশাল দল সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১ এপ্রিল পর্যন্ত দলটি ঢাকা শহরে সক্রিয় ছিল। পরে এদের সবাই হয় নিহত অথবা গ্রেফতার হয়ে যায়। [মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, পৃষ্ঠা ৩০-৩১)

এই ঘটনাগুলাের কথা উদ্ধৃত করা হচ্ছে এ জন্যে যে, এসব মুক্তিযােদ্ধার জন্য স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে নতুন কোনাে ঘােষণা দিতে হয়নি, কারণ ঢাকা শহরে তখন সব ধরনের আন্তঃযােগাযােগ ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর আগের নির্দেশ মােতাবেকই 'একটি গুলি চললেই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হবে' এই আহবানে উদ্দীপ্ত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ইপিআর-এর ওয়্যারলেসযােগে ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এই ঘোষণা কোন কোন ব্যক্তির মাধ্যমে সারা দেশে পাঠানাে হয়েছিল এবং ঘোষণাটি ওয়্যারলেসের মাধ্যমে পাঠানো হলে যারা সেদিন তা গ্রহণ করেছিলেন, তার বিবরণ ও তাদের নাম বাংলাদেশ সরকারের গণভবনে খােদাই করে লেখা ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রচুর 'সাের্স’ ও গােপন যােগাযােগ সূত্র ছিল এবং সেটা থাকারই কথা। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ঘােষণার বিষয়টি ছিল একটি গােপন বিষয়ও। শত্রুপক্ষের অগােচরে একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া তিনি তা শেষ পর্যন্ত গােপন রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। যে যুদ্ধ ঘােষণাটি তিনি ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাঠিয়েছিলেন, তিনি তা পাঠাতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানিদের আক্রমণ শুরুর পর পরই। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্মৃতি গ্রন্থ থেকে এখন স্পষ্টতই বােঝা যাচ্ছে, পরিকল্পনা ছিল ২৬ মার্চ থেকে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর আক্রমণ শুরু করবে। টিক্কা খানের পিআরও সিদ্দিক সালিক ও জেনারেল ফজল মুকিম খানের লেখা গ্রন্থ থেকে ব্যাপারটা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় ।

কিন্তু আক্রমণটি আরাে একদিন এগিয়ে এনে ২৫ মার্চ রাত ১২টায় করা হয়। আবার ২৫ মার্চ রাত ১২টার একঘণ্টা আগেই অর্থাৎ রাত ১১টায়ই ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক সেনাবাহিনী বেরিয়ে পড়ে।

ফলে বাঙালিদের ওপর পাকবাহিনীর আক্রমণ পরিকল্পনার তারিখ ও সময় ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর পাকবাহিনীর হামলা প্রতিরােধ সংক্রান্ত রণকৌশল কিছু কিছু ক্ষেত্রে হোঁচট খেয়েছে। তিনি তার ঘােষণা ও বার্তা রেখে যাওয়ার জন্যে যেসব সাের্স এ ওয়্যারলেস ব্যবহার করবেন ভেবেছিলেন, তার অন্তত দুটির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, যা নিয়ে উৎকণ্ঠার অন্ত ছিল না।

[এসব উৎকণ্ঠার একটি ছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. নুরুল উলার, যিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ওয়্যারলেস সেট তৈরি রেখেও শেষপর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ২৫ মার্চ রাতে যােগাযােগ করে উঠতে পারেননি। দ্বিতীয় উৎকন্ঠাটি এসেছিল ওয়ারির বলধা গার্ডেনে অবস্থিত একজন বাঙালি ইপিআর সদস্যের কাছ থেকে, যে ওয়্যারলেসটি শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বলধা গার্ডেনের পুকুরে নিরাপত্তার স্বার্থে ফেলে দেয়া হয়েছিল]।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘােষণা পাকিস্তান বেতারে প্রচারের ভূমিকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

৭ মার্চের ভাষণ এভাবে গােটা জাতিকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে স্বাধীনতার যে বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন, তা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর ওয়্যারলেসযােগে প্রথম পাঠানাে হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে বার্তাটি গ্রহণ করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। চট্টগ্রামে এর আগেই অবশ্য ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যরা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মিলে ঠিক করেন চট্টগ্রামে যে যুদ্ধ হচ্ছে, জনগণকে তা বেতার মারফত জানানাে প্রয়ােজন। এর মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইপিআর-এর চট্টগ্রামস্থ সদর দপ্তর অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর রফিকুল ইসলাম (মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য পরে যিনি বীর উত্তম খেতাব পেয়েছিলেন এবং ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়ােজিত হন)।

কালুরঘাটস্থ চট্টগ্রাম রেডিও ট্রান্সমিটার সেন্টার (পরে এটি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র নামে পরিচিত হয়েছিল) থেকে ঘােষণাটি ২৬ মার্চ দুপুর আড়াইটায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রচার করেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান। রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে এই প্রথম স্বাধীনতার ঘােষণা। আর এর মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কর্মসূচির প্রথম সূত্রপাত। কিন্তু চট্টগ্রামের বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে ঐকমত্য হলাে না। ইপিআর অ্যাডজুট্যান্ট মেজর রফিকুল ইসলাম তার সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্টের পেছনে জড়াে হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মেজর জিয়াউর রহমান তাদের নিয়ে যান কালুরঘাট সেতুর দিকে। ফলে বাঙালি সৈন্যরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা মেজর জিয়াকে রেডিওতে এসে সংগ্রামরত সৈন্যদের উদ্দেশে কিছু বলার জন্যে অনুরােধ করে ডেকে এনেছিলেন । এই পটভূমিতেই ২৭ মার্চ (১৯৭১) সন্ধ্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাহসী বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে অবস্থিত পাকিস্তান বেতার কেন্দ্রের একটি আঞ্চলিক শাখা থেকে দেশবাসীর কাছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘােষণাটি জানিয়ে দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানি দলিল : ৭ মার্চের পূর্বাপর ঘটনার স্বীকৃতি

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার চার মাস পর পাকিস্তান সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তারা তাদের সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযােগ এবং ধর্ষণের একটা যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায়। এই শ্বেতপত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অন্যতম দলিল। সেখানে বিধৃত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি। এই শ্বেতপত্র প্রকাশের চার মাস পরই বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে বিশ্বের মানচিত্রে নিজের আসন করে নেয়। পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রের বিভিন্ন অংশ ছিল নিম্নরূপ, যেখানে ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বাপর ঘটনা বিবৃত হয়েছে :

* ২ মার্চ ১৯৭১। বায়তুল মােকাররমে দুটি এবং নিউমার্কেটে একটি অস্ত্রের দোকান লুট করা হয়। লুষ্ঠিত অস্ত্রগুলাে তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। আগেই সেখানে একটি গুলি চালানাের অনুশীলনকেন্দ্র খােলা হয়েছিল।

* ৩ মার্চ ১৯৭১ আওয়ামী লীগের নির্দেশমতাে ঢাকার রেডিও এবং টেলিভিশন নতুন এক বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত প্রচার করতে শুরু করে।

* ৭ মার্চ ১৯৭১। শেখ মুজিব আগের সব নির্দেশ বাতিল করে দেন এবং ১৫ মার্চ থেকে নতুন নির্দেশ সংবলিত কার্যক্রম ঘােষণা করেন। এর একটি নির্দেশে জেলা প্রশাসন ও মহকুমা হাকিমদের আওয়ামী লীগ সংগ্রাম পরিষদের সাথে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ ও সহযােগিতার কথা বলা হয়েছে। ... যে কর আদায় হবে তা কেন্দ্রীয় সরকারের অ্যাকাউন্টে জমা হবে না।

* ২৩ মার্চ ১৯৭১।... ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য শহরের বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি ভবনের চূড়ায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়।

* মুক্তিফ্রন্টের আধাসামরিক বাহিনী এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মচারীদের মার্চপাস্টের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয় ।

* আওয়ামী লীগের নির্দেশ অনুসারে ঢাকা টেলিভিশন এদিন পাকিস্তানি পতাকা প্রদর্শন করেনি।

* শেখ মুজিবুর রহমান তার বাসভবনে এক সশস্ত্র মার্চপােস্টের সালাম গ্রহণ করেন। এখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় ।

* ২৫ মার্চ ১৯৭১।... আওয়ামী লীগের ব্যাপক সশস্ত্র প্রস্তুতি আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। শেখ মুজিবুর রহমান সাবেক কর্নেল ওসমানীকে বিপ্লবী বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন এবং তিনি সরাসরি শেখ মুজিবের কর্তৃত্বাধীনে থাকবেন।

* শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক কর্মচারীদের নিজ পক্ষে তালিকাভুক্ত করার জন্যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মজিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেমকে নিয়ােগ করেন। তালিকা সুষ্ঠুভাবে প্রণয়ন করা হয়।

* অন্যদিকে তাদের হাতে অস্ত্র দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আর এজন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও যশােরের অস্ত্র-দোকানগুলাে লুট করা হয় এবং তা বিদ্রোহীদের ব্যবহারের জন্য সব বড় বড় শহরে মজুত করা হয়। একমাত্র ঢাকা পুলিশ স্টেশনেই গুলিভর্তি ১৫ হাজার রাইফেল জমা করা হয় ।

* ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন বহিঃফাড়ির মধ্যে ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের সাহায্যে যােগাযােগ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এক ইউনিট থেকে দ্রুত অন্য ইউনিটে নির্দেশ পাঠানাে হয় ।

* শুক্রবার দিন (২৬ মার্চ- লেখক) খুব ভােরে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হবে বলে সময় ধার্য করা হয়।

* আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা অনুযায়ী সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠন ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের অভ্যুত্থান বাস্তবায়ন করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া খান- লেখক) ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীকে তাদের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার এবং সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান।

[পূর্ব পাকিস্তানের সংকট সম্পর্কে 'শ্বেতপত্র (পাকিস্তান সরকারের চলচ্চিত্র এবং প্রকাশনা বিভাগ, তথ্য ও জাতীয় বিষয়ক দপ্তর, ঢাকা), ৬ আগস্ট ১৯৭১। তারকাচিহনগুলাে এই গ্রন্থের লেখকের দেয়া। যেখানে সামরিক প্রসঙ্গ, অস্ত্র এবং সশস্ত্র তৎপরতার বিষয়গুলাে পাকিস্তানিরা উল্লেখ করেছে, সেখানে পাঠকের বােঝার সুবিধার্থে তারকাচিহ্ন দেয়া হয়েছে।]

বস্তুত পাকিস্তান সরকারের এই দলিলপত্র বিবৃত ঘটনাগুলাের সবই ছিল সত্য ও তথ্যমূলক, শুধু বর্ণিত ভাষা তাদের নিজেদের প্রয়ােজনে সাজানাে। তবে ২৬ মার্চ ভােররাতে শেখ মুজিব কর্তৃক বাংলাদেশ অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অ্যাকশনে যায়, এ কথা সত্যের অপলাপ মাত্র।

যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বাঙালি নেতা শেখ মুজিবের কাছে হস্তান্তরে টালবাহানার চরম ও শেষ প্রতিশােধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের কার্যপরিকল্পনার সবকিছুই প্রস্তুত ছিল, তথাপি শেখ মুজিবের নির্দেশ ছিল পাকিস্তানিরা হামলা করার পর-মুহূর্ত থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের 'অ্যাকশন প্লান' শুরু হবে। তিনি প্রথম হামলা করে পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক প্রচারের সুযােগ দিতে চাননি। বস্তুত শেখ মুজিব আগেই কোনাে অভ্যুত্থান ঘটাতে নারাজ ছিলেন। ফলে ২৫ মার্চ রাতে কার্যত নতুন কোনাে ঘােষণা বা নির্দেশের প্রয়ােজন ছিল না। সব ক্ষেত্রেই বলা ছিল, এমনকি কোথাও কোথাও শেখ মুজিব বলেও দিয়েছিলেন। যে, সম্ভবত ২৫ মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানি হামলা শুরু হবে।

এই নির্দেশ ও পরিকল্পনায় কোনাে ফাঁক ছিল না। কারণ ৭ মার্চের রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেও এসেছিলেন, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, যার যা- কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবেলা করতে হবে।' এটি নিছক যুদ্ধঘােষণা মাত্র নয়, ছিল একটি সুস্পষ্ট নির্দেশও ।

প্রস্তুতি ছাড়াই ঢাকায় বাঙালি সৈন্যরা যুদ্ধ শুরু করেছিল

৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সামরিক নির্দেশনা এবং ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু কতৃক ছাত্রলীগের যুদ্ধের মহড়ায় সালাম গ্রহণ ও বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানাের পর পাকিস্তানি বা বাঙালির পক্ষ থেকে আপসের সম্ভাবনা তিলমাত্রও ছিল না। যদি বঙ্গবন্ধুর মনে সামান্যতম আশা থাকত তাহলে তিনি অন্তত একটি নতুন পতাকা উত্তোলন করতেন না। একটি নতুন পতাকা উত্তোলনের অর্থ যে কোনাে দেশের সামরিক মর্যাদার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুতর এবং গুরুত্বপূর্ণও।

তবে পূর্ব-প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধ শুরু হলাে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানিদের ভয়াবহ হামলার পরও ঢাকা শহরে লড়াই হয়েছে। ২৭ মার্চ ঢাকা সেনানিবাস থেকে লেফটেন্যান্ট আনােয়ার হােসেন তেজগাঁও ড্রাম ফ্যাক্টরির কাছে প্রায় ৩৫০ জন ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র ও শ্রমিকের এক বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১২৬ জন পাকসেনাও হতাহত হয় এখানে ।

৩০ মার্চ মহাখালীতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে শহীদ হন শামসুল আলম নামে একজন ইপিআর। ৩১ মার্চ আসাদ গেটে রাত ৩টায় আক্রমণ চালিয়ে ৫ জন পাকসেনাকে হত্যা করা হয়। পয়লা এপ্রিল এই মুক্তিযােদ্ধা দলটি পাকিস্তানিদের সর্বাত্মক আক্রমণে শেষ পর্যন্ত নিহত হন অথবা গ্রেফতার হয়ে যান। [লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩০-৩১] ৬ এপ্রিল ইপিআর সদস্য নানু, আকতার, জাহাঙ্গীর, সাইদুর রহমান যাত্রাবাড়ী রােডে একটি পাকিস্তানি দলের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করে। [লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১২৯]

দেশ যখন দ্রুতই একটি সশস্ত্র প্রতিরােধ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই কোনাে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। শহরের বাইরে গ্রাম পর্যায়ে, এমনকি প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়ে পর্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যবহারের বন্দুক কিংবা পাখি শিকারের বন্দুক নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ১৯৭১-এর মার্চ মাসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল বের করে বেড়াচ্ছিল। এ সময় যে কোনাে আয়ােজিত জনসভাতেই দূর-দূরান্ত থেকে জনতাকে বন্দুক নিয়ে মিছিল করে আসতে দেখা যেত। সুতরাং অনভিজ্ঞ এবং বিপ্লবের রােমান্টিকতায় আচ্ছন্ন গ্রামের সংগ্রামী মানুষকে সশস্ত্র প্রতিরােধ আন্দোলনের রূপ ও সামরিক কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেয়া একান্ত প্রয়ােজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই প্রস্তুতি ছাড়াই সারাদেশে যুদ্ধের জন্যে আবেগের জোয়ার বয়ে যায় ।

এই আবেগের সূত্রে মার্চ থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে কতকগুলাে ডিন প্রচৌষ্টা ছিল। মার্চের এই প্রথম সপ্তাহেই নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাব লুট হয়। বায়তুল মােকাররম ও নিউমার্কেটের বন্দুকের দোকান থেকে অস্ত্র ছিনতাই হয়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর অস্ত্র দোকানও লুট হয়। বিজ্ঞান গবেষণাগারের বিস্ফোরক, ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের ট্রেনিং ক্লাবের রাইফেল, রাজশাহীর সব অস্ত্রের দোকান, নাটোরের মহারাজ হাইস্কুলের রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদি একইভারে সারাদেশে স্বাধীনতাকামীরা লুট করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এ সবই ছিল ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বাপর প্রভাব। এই প্রভাব কীভাবে সর্বাত্মক যুদ্ধে পরিণত করেছিল তা যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্যে পাই। ১১ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একটি বেতার-ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি দেশব্যাপী পরিচালিত প্রতিরােধ যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছিলেন, যেখানে বাঙালি সামরিক অফিসাররা এক বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ ছিল :

আজ প্রতিরােধ আন্দোলনের কথা গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পেীছে গেছে। হাজার হাজার মানুষ আজকের এই স্বাধীনতা সংগ্রামে যােগ দিয়েছেন। সাগরপাড়ের বাঙালি ভাইয়েরা যে যেখানে আছেন, আমাদের অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য পাঠাচ্ছেন। সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলের বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মােশাররফকে আমরা সমর পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছি। মুক্তিবাহিনী শত্রুদের সিলেট ও কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টের ছাউনিতে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। চট্টগ্রাম ও নােয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমানবাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরােধ-ব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলের ভাইবােনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুদের মােকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরােধ স্ট্যালিনগ্রাডের পাশে স্থান পবে।

ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মেজর শফিউল্লাহর ওপর। আমাদের মুক্তিবাহিনী ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মেজর ওসমানের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কুষ্টিয়া ও যশাের জেলার। কুষ্টিয়ায় ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আমাদের মুক্তিবাহিনী পুরাে এলাকা থেকে শত্রুবাহিনীকে বিতাড়িত করেছে।

উত্তরবঙ্গে আমাদের মুক্তিবাহিনী মেজর আহমদের নেতৃত্বে। রাজশাহীকে শত্রুর কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেছেন। মেজর নজরুল হক সৈয়দপুর মেজর নওয়াজেশ রংপুরে ও শত্রুবাহিনীকে সম্পূর্ণ অবরােধ করে বিব্রত করে তুলেছেন।

আপাতত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মুক্ত এলাকায়। পূর্বাঞ্চলের সরকারি কাজ পরিচালনার জন্য সিলেট-কুমিল্লা এলাকায় বাংলাদেশ সরকারের আর একটি কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সােভিয়েত রাশিয়া ও ভারতবর্ষ এই নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে এবং সােভিয়েট রাশিয়া অবিলম্বে এই হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

আমাদের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আমাদের স্থির বিশ্বাস, কারণ প্রতিদিনই আমাদের শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে এবং আমাদের এ সংগ্রাম পৃথিবীর স্বীকৃতি পাচ্ছে।

পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান এক লেখায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গ্রিন সিগন্যাল-এর কথা স্বীকার করেছিলেন। ফলে বাঙালি সামরিক অফিসাররা 'হুকুম দেবার না-ও পারি’কে বাস্তবায়ন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেশের সামরিক, আধাসামরিক এবং বেসামরিক লােকদের কীভাবে প্রভাবিত করেছিল তার আরাে একটি প্রমাণ দেখি ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ দিবসে। এদিন শপথ অনুষ্ঠানে বাঙালি সৈনিকদের দ্বারা সামরিক স্যালুট অনুষ্ঠানে কোনাে সঙ্কট হয়নি।

এই শপথ অনুষ্ঠান ছিল এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। শপথ অনুষ্ঠানের বিবরণ দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, যেখানে সেদিনের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে এক বিশেষ মর্যাদা দিতে অবদান রেখেছিলেন বাঙালি সৈন্যরা :

গাড়িগুলো শেষ পর্যন্ত এসে থামল একটি বিশাল আমবাগানের মধ্যে। এই গ্রামটির নাম বৈদ্যনাথ তলা, জেলা কুষ্টিয়া, মহকুমা মেহেরপুর। কিছু লােক সেখানে দৌড়াদৌড়ি করে চেয়ার সাজাচ্ছে, অধিকাংশই হাতলভাঙা চেয়ার, কাছাকাছি গ্রামের বাড়িগুলাে থেকে জোগাড় করে আনা। জায়গাটিকে ঘিরে রাইফেল এলএমজি হাতে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পঁচিশ- ত্রিশজন সৈন্য, তাদের ঠিক মুক্তিবাহিনীর ছেলে বলে মনে হয় না, খুব সম্ভবত প্রাক্তন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একটি বিদ্রোহী বাহিনী ।

আশপাশের গ্রাম থেকে ধেয়ে এসেছে বিপুল জনতা। অস্ত্রধারী সেনাদের বৃত্ত ভেদ করে তারা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারছে না বলে অনেকেই আমগাছগুলােতে চড়তে শুরু করেছে । অনুষ্ঠান শুরু হলাে এগারােটার পর। তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সবাই এসে গেছেন। তবে যার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজনীয় ছিল তিনি নেই, তিনি আসবেন না। শেখ মুজিব যে কোথায় আছেন তা এখনাে জানা যায়নি। তবু অনুপস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ঘােষণা করা হলাে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিসভার অন্য তিনজন সদস্য হলেন খােন্দকার মােশতাক আহমদ, এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান এবং এম, মনসুর আলী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন-চিফ নিযুক্ত হলেন রিটায়ার্ড কর্নেল ওসমানী। [সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম (কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স লি. ১৯৮৯), পৃষ্ঠা ৮৫-৮৭]

আধাসামরিক বাহিনী ইপিআর-এর ৪ নম্বর উইং-এর একটি সুসজ্জিত দল ক্যাপ্টেন মাহবুবুল হাসানের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার দেয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে।

৭ মার্চের ভাষণের পরপরই বাঙালি সামরিক অফিসার, আধাসামরিক ইপিআর এবং পুলিশরা পাকিস্তানি ইউনিটগুলাে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন, তারা নিয়েছিলেন সেই সশস্ত্র প্রতিরােধ প্রস্তুতি। টিক্কা খানের ভাষণে রয়েছে তার স্বীকৃতি। ২৫ মার্চের কালােরাতের হত্যাযজ্ঞের পর ১০ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে এই জেনারেল টিক্কা খান শপথ নিয়েছিলেন এবং ১৯ এপ্রিল প্রদত্ত এক বেতার-ভাষণে তিনি অত্যন্ত কঠিন স্বরে বলেন :

অধুনালুপ্ত আওয়ামী লীগ এমন এক পথ ধরেছিল, যাতে আমাদের এই দেশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেত। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, যারাই আওয়ামী লীগে ছিল তারাই জাতির সংহতি ও অখণ্ডতার বিরােধী। যারাই পাকিস্তানের মঙ্গল চান, তাদের ভয় করার কোনাে কারণ নেই।

সশস্ত্র বাহিনী, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশের কিছু লােক কর্তব্যস্থান ছেড়ে গেছে। যারা নিজের ইউনিটে পুনরায় যােগদান করবে, তাদের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সহানুভূতিমূলক আচরণ করা হবে। আমি তাদের এই সুযােগ গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি। অন্যথায় তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হবে। [দৈনিক পাকিস্তান ১৯ এপ্রিল ১৯৭১।]

৭ মার্চের এই সামরিক বিবেচনাই বাঙালি সামরিক অফিসারদের একত্রিত করেছিল। দিল্লিতে যখন ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ভারত সরকারের সাথে আলাপ আলােচনা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনাগত ছক করছিলেন, ঠিক সেই অবস্থায় সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি বিদ্রোহী ইউনিটগুলাের কমান্ডারগণ প্রতিরােধ-যুদ্ধের নকশা প্রণয়নে মিলিত হয়েছিলেন। এতে যােগ দেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী, লে. কর্নেল আবদুর রব, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মােশাররফ, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর মমিন চৌধুরী প্রমুখ বঙ্গশার্দূলগণ। বৈঠকে সব বিদ্রোহী ইউনিটের সমন্বয়ে সম্মিলিত মুক্তিফৌজ গঠন করা হয় এবং কর্নেল ওসমানীকে তা পরিচালনার দায়িত্ব দেয় [Maj. Gen. K.M. Safiullah, Bangladesh at War (Dhaka/Academic Publishers 1989). P. 78-81 এবং মঈদুল হাসান, মূলধারা ৭১ পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৫]

এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধরত সেনা-কমান্ডারদের নিয়ে পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১১ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এই সম্মেলনে সারাদেশের যুদ্ধ-অঞ্চলকে মােট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং সেক্টর-কমান্ডার নিয়ােগ করা হয় ।

এছাড়া সম্মেলনে কর্নেল এম. এ. রব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খােন্দকার ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। এ সম্মেলনে অন্য আর যেসব বাঙালি সামরিক অফিসার যােগদান করেছিলেন, তাদের মধ্যে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খােন্দকার, মেজর সি. আর. দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী, উইং কমান্ডার এম. কে. বাশার, মেজর ওসমান চৌধুরী, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর নাজমুল হক, মেজর এম. এ. জলিল এবং মেজর এ. আর. চৌধুরী প্রমুখ অন্যতম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চের পর থেকে যেসব ঘটনা ঘটাতে থাকে, তার নজির দুনিয়ার ইতিহাসে ছিল বিরল। ভিয়েতনামের মাটিতে মার্কিন সৈন্যরা যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, তার মধ্যে 'মাইলাই' নামক গ্রামের নিষ্ঠুর গণহত্যা আধুনিক সভ্যতাকে স্তব্ধবাক করে দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম অসংখ্য মাইলাই জাতীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যা বহির্বিশ্বের গােচরে প্রথমে আসেনি ।

কিন্তু এত বর্বর বাহিনীর মােকাবিলায় বাঙালি সামরিক অফিসারদের জোর ছিল ৭ মার্চের ভাষণের প্রেরণা। এ প্রেরণা তাদের ত্বড়িত যুদ্ধে অংশ নেয়ার মানসিক প্রস্তুতিকে সাহায্য করেছিল। ৭ মার্চের ভাষণ তাই এক অনবদ্য ভাষণ, যার সামরিক দিক মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে সাহায্য করে।

সূত্রঃ মোনায়েম সরকার এবং মোহাম্মদ হাননান সম্পাদিত "শ্রেষ্ঠ বাঙালি" সংকলন থেকে সংগৃহীত

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত