97
Published on আগস্ট 14, 2026রবীন্দ্র নাথ দাসের বয়স ছিল পঞ্চাশ। ওষুধের দোকান চালাতেন, সাথে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিলেন নড়াইলে। রাস্তায় তাকে কুপিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তিনদিন হাসপাতালে কাতরিয়ে ৩ জানুয়ারি তিনি মারা যান। ঠিক পাঁচদিন পর, ৫ জানুয়ারি রাতে, একই জেলার আরেক প্রান্তে দুইজন মানুষ খুন হন একসাথে, একই রাতে। মণি চক্রবর্তী নামের এক মুদি দোকানিকে চার্শিন্দুর বাজারে ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে মারা হয়, আর রণ প্রতাপ বৈরাগী নামের এক বরফকল মালিক ও পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ প্রতিটা খুনের জন্য আলাদা আলাদা কারণ দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত শত্রুতা, নিষিদ্ধ সংগঠনের কোন্দল, পুরনো মামলা। কিন্তু কেউ ব্যাখ্যা করেনি কেন একই সপ্তাহে, একই জেলায়, তিনজন মানুষই হিন্দু ছিলেন। এই ধরনের কাকতাল যখন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘটতে থাকে, তখন সেটাকে আর কাকতাল বলার সাহস কারো থাকা উচিত না, বরং এটাকেই বলে প্যাটার্ন।
এই প্যাটার্নটাই বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গত দুই বছরের বাস্তবতা। ৫ আগস্ট ২০২৪, শেখ হাসিনাকে কুখ্যাত জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার দিনটাই যেন ছিল একটা সিগনাল, এখন যা খুশি তাই করা যাবে, কেউ জবাবদিহি চাইবে না। সেই দিনই লালমনিরহাটে বাড়িঘরে ভাঙচুর শুরু হয়, দিনাজপুরে দশটা বাড়ি আর একটা মন্দির আক্রান্ত হয়, লক্ষ্মীপুরে দুইশ থেকে তিনশ মানুষের একটা দল একটা দোতলা হিন্দু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপরের পনেরো দিনে ঊনপঞ্চাশটা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা, এক হাজার আটষট্টিটা বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়, বাইশটা উপাসনালয়ে হামলা হয়। খুলনা বিভাগেই একাই আড়াইশ পঁচানব্বইটা স্থাপনা ভাঙা হয়। একটা মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে সেই ষোলো দিনে হামলার সংখ্যা এক হাজার সাতশ ঊনসত্তরে পৌঁছায়। একই মাসে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একজন, আহমদিয়া সম্প্রদায়, তাদের একশ ছাপ্পান্নটা বাড়ি আর ছয়টা উপাসনালয়ে হামলা হয়, বাইশ জন আহত হন। আর শুধু হামলাই না, ৩১ আগস্টের মধ্যে অন্তত ঊনপঞ্চাশজন সংখ্যালঘু শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, স্রেফ তারা কোন সম্প্রদায়ের সেই পরিচয়ের কারণে।
এখন এখানেই সবচেয়ে ঘৃণ্য অংশটা শুরু হয়। পুলিশের নিজস্ব তদন্তে এই হামলাগুলোর সিংহভাগকে "রাজনৈতিক" বলে সিলমোহর দেওয়া হয়, ধর্মীয় না। যুক্তিটা হলো, হিন্দুরা যেহেতু গতানুগতিকভাবে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ধরে নেওয়া হয়, তাই তাদের ওপর হামলা মানে ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিশোধ, ধর্মীয় ঘৃণা না। এই যুক্তিটা শুনতে খুব পরিপাটি লাগে, কিন্তু আসলে এটা একটা মিথ্যা সান্ত্বনা। কারণ একজন মানুষকে যদি শুধু এই কারণে টার্গেট করা হয় যে তিনি হিন্দু বলেই তাকে আওয়ামী লীগের সমর্থক ধরে নেওয়া হয়েছে, তাহলে এই হামলার মূলে যে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত কাজ করছে সেটা মুছে যায় না, বরং আরও নগ্নভাবে প্রকাশ পায়। কোনো মুসলিম আওয়ামী লীগ কর্মীর বাড়িতে আগুন লাগলে তাকে যতটা রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলা যায়, একজন হিন্দুর বাড়িতে আগুন লাগলে সেটা তার চেয়ে বেশি কিছু, কারণ এখানে ধরে নেওয়া হয়েছে যে হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ, আর এই ধরে নেওয়াটাই একটা সাম্প্রদায়িক স্টেরিওটাইপ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের নিজস্ব প্রতিবেদনেও স্বীকার করা হয়েছে যে এই সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক, ধর্মীয় আর জাতিগত পক্ষপাত একসাথে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আর পুলিশ বারবার শুধু রাজনৈতিক তকমাটাই সামনে এনেছে, যাতে দায় থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায়।
আর এই প্যাটার্নটা শুধু আগস্টেই থেমে থাকেনি। সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় নির্মাণাধীন আটটা দুর্গা প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়, খুলনার কিছু মন্দিরে পূজা করতে চাইলে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চিঠি পাঠানো হয়, যেন উৎসব উদযাপনের অধিকারটাও এখন কেনাবেচার বিষয়। একই মাসে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় শুরু হওয়া পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ রাঙামাটি আর বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়ে, খাগড়াছড়িতে তিনজন আর রাঙামাটিতে একজন মানুষ প্রাণ হারান, পঞ্চাশের বেশি মানুষ আহত হন, একশ দুইটার মতো দোকানে আগুন লাগানো হয়। অক্টোবরে দুর্গাপূজার মৌসুমে সারাদেশে পঁয়তাল্লিশটার বেশি ছোটবড় ঘটনা ঘটে, কিশোরগঞ্জে প্রতিমা ভাঙচুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিমার অংশ ভাঙা, নীলফামারীতে মাটির ঢিবি ভাঙা পাওয়া যাওয়া, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় প্রতিমায় ইট ছোড়া, খাগড়াছড়ির রামগড়ে মন্দিরের প্রতীক চুরি, রাজবাড়ীতে প্রতিমার মুখ ভাঙা। প্রতিটা ঘটনা আলাদা আলাদাভাবে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু একসাথে রাখলে এগুলো একটা বার্তা দেয়, দুর্গাপূজা উদযাপন করাটাই এখন এই দেশে একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
নভেম্বরে এসে গল্পটা আরও ভয়ংকর মোড় নেয়। ইসকনের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়, তার জামিন বারবার নাকচ হতে থাকে, প্রথমে ২৬ নভেম্বর, তারপর ২ জানুয়ারি আবার। জামিন নাকচের পর তার সমর্থকদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে চট্টগ্রামে একজন মুসলিম আইনজীবী প্রাণ হারান। এই মৃত্যুটা নিয়ে সরকার এবং একাংশের মিডিয়া এমনভাবে প্রচার করেছে যেন এটাই প্রমাণ করে হিন্দু সম্প্রদায়ই আসলে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। অথচ প্রশ্নটা উল্টো দিক থেকে করা দরকার ছিল, একজন ধর্মীয় নেতার জামিন আবেদন নিয়ে এতটা কঠোরতা কেন দেখানো হলো, যখন দেশজুড়ে হাজার হাজার হিন্দু বাড়িঘর পোড়ানোর কোনো বিচারই এগোয়নি। এই ঘটনার আঁচ গিয়ে পড়ে কূটনীতিতেও, ২ ডিসেম্বর আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে বিক্ষোভকারীরা হামলা চালায়, আর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশজুড়ে ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এভাবে একটা অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয় ধীরে ধীরে একটা কূটনৈতিক সংকটে রূপ নেয়, অথচ মূল ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর সেই কূটনৈতিক বাগযুদ্ধে হারিয়ে যায়।
২০২৫ সাল শুরু হয় একটা মিথ্যা স্বস্তি দিয়ে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাসিক গড় ঘটনা নেমে আসে মাত্র এক থেকে তিনে, যেন ঝড় থেমে গেছে। কিন্তু এই শান্তিটা ছিল ভঙ্গুর। ৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহে একটা সুফি মাজারে দুই দফা হামলা হয়, ১৬ জানুয়ারি গাজীপুরে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়, ১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরে পূজার তিনদিন আগে সরস্বতী প্রতিমা ভাঙচুর হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি হালুয়াঘাটে কালী মন্দিরে প্রতিমা ভাঙা হয়। মার্চে সিরাজগঞ্জ আর লক্ষ্মীপুরে ছোট ছোট ঘটনার পাশাপাশি পিরোজপুরের নাজিরপুরে একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন আওয়ামী লীগ নেতা আর তার সহযোগীরা মিলে একটা মন্দির এবং একটা বসতবাড়ি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। এপ্রিলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত ভাঙচুর করা হয়। এই তালিকা দেখলে বোঝা যায়, শান্ত সময় বলে আসলে কিছু ছিল না, শুধু ঘটনার তীব্রতা কমেছিল, ঘটনা থামেনি।
মে মাসে যশোরের অভয়নগরে একটা মতুয়া হিন্দু গ্রামে চারজন লোক লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ চালায়, স্থানীয় একজন বিএনপি-কৃষক দল নেতা খুন হওয়ার জেরে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, তারপরও গ্রামের পুরুষরা আতঙ্কে পালিয়ে যায়, নারী আর শিশুরা একা পড়ে থাকে ভাঙা ঘরে। জুলাইয়ে এসে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রথমার্ধের হিসাব প্রকাশ করে, ছয় মাসে দুইশ আটান্নটা সহিংসতার ঘটনা, যার মধ্যে কুড়িটা ধর্ষণের ঘটনা আর উপাসনালয়ে উনষাটটা হামলা। ঠিক এর কিছুদিন পরই, ২৬ আর ২৭ জুলাই, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় একটা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে দুই দিনে পনেরো থেকে বিশটা হিন্দু বাড়িতে ভাঙচুর আর লুটপাট চালানো হয়। এতটাই ভয়ংকর ছিল পরিস্থিতি যে স্থানীয় সাংবাদিককে পর্যন্ত উসকানির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যেন সত্যি ঘটনা রিপোর্ট করাটাই একটা অপরাধ। সেপ্টেম্বরে আবার পূজার মৌসুম আসতেই একুশ দিনে অন্তত নয়টা মণ্ডপ আর মন্দিরে হামলা হয়, ২৮ তারিখে মানিকগঞ্জে প্রতিমা ভাঙা হয়। অক্টোবরে ঘটনার তীব্রতা বাড়ে আরও, ৪ তারিখে মুন্সীগঞ্জে প্রতিমা ভাঙা হয়, ৮ তারিখে সিরাজদিখানে লক্ষ্মী প্রতিমা ভাঙা হয়, একই দিনে ঢাকার হলি রোজারি ক্যাথলিক চার্চের গেটে বোমা ফাটানো হয়, যে চার্চটা ১৬৭৭ সাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে, পর্তুগিজ মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত। এই একটা তারিখেই দুটো ভিন্ন সম্প্রদায় আক্রান্ত হয় - হিন্দু, আর খ্রিস্টান, যেন হামলাকারীদের কাছে সংখ্যালঘু হওয়াটাই আসল লক্ষ্যবস্তু, সম্প্রদায়টা গৌণ।
নভেম্বর মাসটা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ৭ তারিখে ঢাকার সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রালের বাইরে ঘরে তৈরি বোমা ফাটানো হয়, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোহাম্মদপুরের সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল ও কলেজের ভেতরে দ্বিতীয় বিস্ফোরকটা ফাটে। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়ে, সেখানে বোমা রাখাটা শুধু একটা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা না, এটা একটা বার্তা যে খ্রিস্টান পরিচালিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানই এখন লক্ষ্যবস্তু। ৯ তারিখে নগরকান্দায় রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি ভাঙা হয়, আর ২০ তারিখে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে এই বোমা হামলাগুলোর প্রতিবাদে। বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি নিজেই সেদিন বলেছিলেন যে প্রেসক্লাবের সামনে এসে প্রতিবাদ জানাতে জানাতে তারা ক্লান্ত হয়ে গেছেন, একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে অথচ দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। ডিসেম্বরে কক্সবাজারের রামুতে একটা বৌদ্ধ বিহারে হামলা হয়, এবার অন্তঃসম্প্রদায় ভূমি বিরোধের জেরে, তবে এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সেনাবাহিনী আর বিজিবিকে ডাকতে হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। বছর শেষ হয় শেরপুরে একটা মন্দিরের তালা ভেঙে প্রতিমা ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর চেষ্টা দিয়ে, আর তারপরই সেই নড়াইলের হত্যাকাণ্ড দিয়ে, যা দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল।
২০২৬ সালে ঢুকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, সংখ্যায় না বলে দিলে বিশ্বাস করা কঠিন। ঐক্য পরিষদের হিসাবে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চল্লিশটা ঘটনায় চুয়াল্লিশজন সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন, মাসে গড়ে সাতজনের বেশি। এর বিপরীতে পুরো ২০২৫ সালে নিহত হয়েছিলেন ছেষট্টিজন, মাসিক গড় সাড়ে পাঁচ। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই মাসিক গড় খুন বেড়েছে প্রায় তেত্রিশ শতাংশ। জমি দখল বা দখলচেষ্টার ঘটনাও একই সময়ে বেড়েছে মাসিক গড়ে। এপ্রিলে রাঙামাটির কাউখালীতে বিজু উৎসবে যাওয়ার পথে একটা সিএনজি ভাড়া নিয়ে বাদানুবাদ থেকে সেটেলার বাঙালিরা জুম্ম তরুণদের ওপর চড়াও হয়, অন্তত বিশজন আহত হন। এই একটা ঘটনা দেখলেই বোঝা যায় কতটা ঠুনকো অজুহাতেও এখন সহিংসতা নেমে আসে, একটা ভাড়া নিয়ে ঝগড়াও যথেষ্ট হয়ে যায় একটা সম্প্রদায়ের মানুষকে পেটানোর জন্য। একই মাসের ২৮ তারিখে ঢাকার বারিধারায় দ্য মাজেনড ক্যাথলিক চার্চে একজন একান্ন বছর বয়সী মিশনারি যাজককে তার নিজের ঘরে বেঁধে মারধর করা হয়, আড়াই লাখ টাকা আর তার পাসপোর্ট লুট করা হয়। যাজক নিজে পরে বলেছিলেন, যখন তিনি কাঁদছিলেন তখন আক্রমণকারীরা তার মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে আরও মারধর করে। সবচেয়ে হতাশাজনক অংশটা হলো, গির্জা কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কারণ দেখিয়ে কোনো ফৌজদারি মামলাই করেনি, শুধু একটা সাধারণ ডায়েরি করে বিষয়টা রেকর্ড করে রেখেছে। একটা প্রতিষ্ঠান, যাদের ওপর মাত্র কয়েক মাস আগে দুটো বোমা হামলা হয়েছে, তারাও ন্যায়বিচার চাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে, এটাই বলে দেয় এই দেশে সংখ্যালঘু হয়ে প্রতিবাদ করার মূল্যটা কতটা ভারী হয়ে উঠেছে।
জুন মাসে এক মাসেই বারোটা হামলায় সাতজন আহত হন, বারোটা মন্দির, এগারোটা প্রতিমা আর সাতটা বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর হয়। জুলাইয়ে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে একজন ব্যক্তির নাম জিজ্ঞেস করাকে কেন্দ্র করে একটা বৌদ্ধ পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাট চালানো হয়, ভুক্তভোগী সৌরভ বড়ুয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হন স্রেফ তার প্রতিবেশীর কাছে তার নিজের নাম বলার অপরাধে। আগস্টের শুরুতে, এই লেখা লেখার সময়ও, নেত্রকোণার পূর্বধলায় একটা গ্রামে হামলা আর লুটপাটের অভিযোগে মানববন্ধন চলছে। অর্থাৎ যে মুহূর্তে এই লেখাটা পড়া হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেও কোথাও না কোথাও একটা সংখ্যালঘু পরিবার তাদের ঘর হারানোর প্রতিবাদে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
এই পুরো দুই বছরের গল্পটা যদি এক লাইনে বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়াটা এখন একটা স্থায়ী ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেটা কোনো নির্দিষ্ট সরকার বদলে গেলে দূর হয়ে যায় না। ২০২৪ সালে আগস্টে একাশিটা ঘটনা, তারপর কমে গিয়ে আবার বেড়ে যাওয়া, এই ওঠানামাটাই প্রমাণ করে সমস্যাটা একটা রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া না, এটা একটা কাঠামোগত অসুখ, যেটা সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দেয়, তা সেটা ক্ষমতার পালাবদল হোক, একটা ধর্মীয় অবমাননার গুজব হোক, একটা জমির বিরোধ হোক, বা নিছক একটা ভাড়া নিয়ে ঝগড়া হোক। প্রতিটা ঘটনার পেছনে আলাদা আলাদা তাৎক্ষণিক কারণ থাকে ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ের প্যাটার্নটা কখনো বদলায় না। যাদের ঘর পোড়ে, যাদের প্রতিমা ভাঙা হয়, যাদের গির্জায় বোমা ফাটানো হয়, তারা সবসময় একই তিনটা সম্প্রদায়ের মানুষ।
বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান পরিবারগুলোর এই তথ্যগুলো একসাথে জানা দরকার, কারণ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিটা ঘটনা শুনলে সেটাকে একটা আলাদা দুর্ঘটনা মনে হয়, কিন্তু একসাথে রাখলে এটা একটা প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়ায় যেটা অস্বীকার করা যায় না। আর আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও এই তথ্যগুলো পৌঁছানো দরকার, কারণ একটা দেশ যখন প্রতি বছর তার সংখ্যালঘু হত্যার হার বাড়িয়ে চলে, যখন একজন যাজক মার খেয়েও মামলা করার সাহস পান না, যখন একটা স্কুলে বোমা রাখা হয় আর কেউ ধরা পড়ে না, তখন শুধু নিন্দা জানানো আর উদ্বেগ প্রকাশের বিবৃতি যথেষ্ট না। রবীন্দ্র নাথ দাস, মণি চক্রবর্তী, রণ প্রতাপ বৈরাগী, এই নামগুলো একটা পরিসংখ্যানের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। এরা প্রত্যেকে কারো বাবা ছিলেন, কারো ভাই ছিলেন, আর যে পরিচয়টা তাদের জীবনের শেষ কারণ হয়ে দাঁড়াল, সেটা তারা বেছে নেননি, জন্মসূত্রে পেয়েছিলেন।
তথ্যসূত্র :
১) ৫–২০ আগস্ট: হামলার শিকার সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০৬৮
https://www.prothomalo.com/bangladesh/6bm2lfn7bz
২) বিবিসির অনুসন্ধান: হিন্দুদের বাড়িঘর–মন্দিরে হামলা নিয়ে যে তথ্য উঠে এল
https://www.prothomalo.com/bangladesh/9ilgdiqhst
৩) বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়ি–দোকান–মন্দিরে হামলা, ছড়িয়েছে গুজবও
https://www.ajkerpatrika.com/349778/বিভিন্ন-স্থানে-সংখ্যালঘুদের-বাড়ি–দোকান–মন্দিরে
৪) আমাদের মন্দিরে হামলা আমরা জানলাম না, ভারতীয় টিভিতে খবর দেখে অবাক হয়েছি
https://dailyinqilab.com/bangladesh/news/678984
৫) ২০২৪ বাংলাদেশে হিন্দু বিরোধী সহিংসতা (উইকিপিডিয়া)
https://bn.wikipedia.org/wiki/২০২৪_বাংলাদেশে_হিন্দু_বিরোধী_সহিংসতা
৬) ২০২৫ বাংলাদেশে হিন্দু বিরোধী সহিংসতা (উইকিপিডিয়া)
https://bn.wikipedia.org/wiki/২০২৫_বাংলাদেশে_হিন্দু_বিরোধী_সহিংসতা
৭) ২০২৫ গঙ্গাচড়ায় হিন্দুপল্লিতে হামলা (উইকিপিডিয়া)
https://bn.wikipedia.org/wiki/২০২৫_গঙ্গাচড়ায়_হিন্দুপল্লিতে_হামলা
৮) বাংলাদেশে দুর্গাপূজা (উইকিপিডিয়া)
https://bn.wikipedia.org/wiki/বাংলাদেশে_দুর্গাপূজা
৯) 8.2.2. Violence after the fall of the former government (EUAA COI Report - Bangladesh)
https://www.euaa.europa.eu/coi/bangladesh/2025/country-focus/82-ethnic-and-religious-minorities/822-violence-after-fall-former-government
১০) Seven Hindus killed in Bangladesh since December amid renewed unrest (Deccan Herald)
https://www.deccanherald.com/amp/story/world%2Fseven-hindus-killed-in-bangladesh-since-december-amid-renewed-unrest-3853238
১১) Violence Against Religious Minorities Jan-Dec 2024 (Ain o Salish Kendra)
https://www.askbd.org/ask/2024/12/31/violence-against-religious-minorities-jan-dec-2024/
১২) Arrest made in attack on Catholic church in Bangladesh (Crux)
https://cruxnow.com/church-in-asia/2025/10/catholic-church-attacked-in-bangladesh
১৩) Priest Beaten, Robbed at Church Amid Wave of Attacks On Catholics in Bangladesh (National Catholic Register)
https://www.ncregister.com/cna/priest-beaten-robbed-at-church-amid-wave-of-attacks-on-catholics-in-bangladesh
১৪) Catholic ministries in Bangladesh face new challenges from Islamic extremists (America Magazine)
https://www.americamagazine.org/politics-society/dispatches/2026/05/13/bangladesh-islam-extremism-catholic-mission/
১৫) খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন (RVA বাংলা)
https://bengali.rvasia.org/news/8046f9b8
১৬) রামুতে জমি নিয়ে বিরোধে বৌদ্ধ বিহারে হামলা-ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ৩
https://www.risingbd.com/bangladesh/news/631172
১৭) বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৪ সংখ্যালঘু হত্যা 'দেশটা কি আমাদেরও নয়'
https://www.deshrupantor.com/707814/বছরের-প্রথম-ছয়-মাসে-৪৪-সংখ্যালঘু-হত্যা-দেশটা-কি
১৮) বছরের প্রথম ৬ মাসে '৪৪ সংখ্যালঘু হত্যা'
https://www.deshrupantor.com/707909/বছরের-প্রথম-৬-মাসে-৪৪-সংখ্যালঘু-হত্যা
১৯) জুনে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মবে নিহত ৪০
https://www.deshrupantor.com/700822/জুনে-রাজনৈতিক-সহিংসতা-ও-মবে-নিহত-৪০
২০) 'নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদ্যাপনে আশঙ্কা ও উদ্বেগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে'
https://www.ittefaq.com.bd/753909/নির্বিঘ্নে-দুর্গাপূজা-উদ্যাপনে-আশঙ্কা-ও-উদ্বেগ
২১) দুর্গাপূজা: প্রতিমা ভাঙচুর, চুরি, ঢিল নিক্ষেপ ও মারামারির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮
https://www.prothomalo.com/bangladesh/m2y58yfohj
২২) ঘাগড়ায় বিজু উৎসবের সময় সেটেলার বাঙালি কর্তৃক জুম্মদের উপর হামলা, আহত ২০ (Hill Voice)
https://hillvoice.net/bn/ঘাগড়ায়-বিজু-উৎসবের-সময়-সেটেলার-বাঙালি-কর্তৃক-জুম্মদের-উপর-হামলা/
২৩) চট্টগ্রাম চন্দনাইশের হাসিমপুরে এক ব্যক্তির নাম জিজ্ঞেস করাকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ পরিবারের উপর হামলা
https://www.dailyshamolbangla.com/2026/07/চট্টগ্রাম-চন্দনাইশের-হাসিমপুরে-এক/
২৪) নেত্রকোণায় হামলা-লুটপাটের অভিযোগে মানববন্ধন
https://www.itvbd.com/country/mymensingh/272695/নেত্রকোণায়-হামলা-লুটপাটের-অভিযোগে-মানববন্ধন
২৫) Bangladesh sees surge in anti-Hindu violence, India urges action (Tribune India)
https://www.tribuneindia.com/news/diaspora/bangladesh-sees-surge-in-anti-hindu-violence-india-urges-action/amp
ডিসক্লেইমার : ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থার হিসাবে সংখ্যালঘুদের উপর পাঁচ থেকে ছয় হাজারের বেশি নিপিড়নের ঘটনা ঘটেছে এই দুই বছরে। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যাটা আসে তাদের মাসিক পরিসংখ্যান থেকে, যেখানে হাজার হাজার ছোট ঘটনা, যেমন একটা প্রতিমার ছোট একটা অংশ ভাঙা বা একটা জমি দখলচেষ্টা, সংখ্যা হিসেবে গণনা করা হয় কিন্তু আলাদাভাবে জাতীয় মিডিয়ায় কখনো রিপোর্ট হয় না। ম্যানুয়াল ওয়েব সার্চ করে যতগুলো ঘটনার তারিখ, স্থান আর নাম-বিবরণসহ প্রকৃত সংবাদমাধ্যমে যাচাইযোগ্য রিপোর্ট খুঁজে পেয়েছি, উপরের পুরো লেখাটা সেগুলো দিয়েই লেখা, আর সাথে সেই প্রতিটা সোর্সের লিংকও দেয়া হয়েছে। পাঁচ-ছয় হাজার আলাদা লিংক বানিয়ে দেওয়াটা সম্ভবপর হবে না, কারণ সেই বেশিরভাগ ঘটনার আলাদা কোনো মিডিয়া রিপোর্টই নেই, শুধু সংস্থাগুলোর সমষ্টিগত পরিসংখ্যানে আছে।