আওয়ামী লীগ: অনুভূতির নাম, অর্জনের ঠিকানা

15

Published on জুন 22, 2026
  • Details Image

​রক্তিম সংগ্রাম আর মহিমান্বিত অর্জনের সমান্তরাল রেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক রাজনৈতিক মহাকাব্যের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ থেকে ২০২৬, চলমান এই দীর্ঘ ৭৭ বছরের যাত্রা প্রমাণ করে, সংগঠনটি কেবল রাজনীতির মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাঙালির মন-মননে এটি ‘একটি অনুভূতির নাম’।

​গণমানুষের এই অনুভূতির তাগিদেই দলটি বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে শক্ত হাতে ধরেছে এই বাংলার হাল। প্রতিবার অন্ধকার সময় পেরিয়ে জ্বেলেছে আলোর মশাল। বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জন আর গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার সাথে মিশে আছে আওয়ামী লীগ।

​ফরাসি ইতিহাসবিদ ফের্নান্দ ব্রোদেল সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর 'On History' গ্রন্থে 'দীর্ঘ পরিক্রমা'র তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ইতিহাসকে শুধু ক্ষণস্থায়ী ঘটনা-প্রবাহ দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের কাঠামোগত ধারাবাহিকতা দিয়ে বুঝতে হয়- যেখানে ভূগোল, জনমিতি ও সমাজের গভীর স্তরের পরিবর্তনগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রবাহিত হয়, কোনো একক রাজনৈতিক ঝড়েই যা বিলীন হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিঃসন্দেহে এক দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক অভিযাত্রা হিসেবেই অভিহিত করা যায়।

​১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির জন্ম হয়েছিল, তা কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল হাজার বছর ধরে শোষিত বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিনাশী দৃঢ় প্রত্যয়।

​বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি বাঁক- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন এবং ছষট্টির ঐতিহাসিক ৬ দফা- সবখানেই আওয়ামী লীগ ছিল ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এনে দেয় একচ্ছত্র ম্যান্ডেট। আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই গৌরবগাথার চূড়ান্ত রূপ।

​স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সরকারের কর্মযজ্ঞ আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে এক অনন্য ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠন, দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ়করণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, অতি দ্রুততম সময়ে মিত্রবাহিনীর সৈন্য প্রত্যাহার, বিশ্বের ৯৩টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ- প্রতিটি অর্জনই প্রমাণ করে গণমানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে আওয়ামী লীগ কতটা বদ্ধপরিকর ছিল।

​এক সাক্ষাৎকারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, "আমার শক্তির উৎস আমার দেশের মানুষ, আমার দলের শক্তি হলো সাধারণ মেহনতি মানুষ।" আর সেই মানুষের শক্তির ওপর ভর করেই ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে রেসকোর্স ময়দানের বজ্রকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "দাবায়ে রাখতে পারবা না।" এই অমোঘ সত্যটি আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

​রাজনীতি যেখানে কেবলই ক্ষমতা, আদর্শিক সংঘাত আর কাঠামোগত হিসেব-নিকেশের চাদরে ঢাকা, সেখানে আওয়ামী লীগকে বুঝতে হলে এর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাকে উপলব্ধি করতে হবে। ২০১৬ সালের ২২শে অক্টোবর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে আবেগঘন ভাষণ দিয়েছিলেন, তা আজও কোটি নেতাকর্মীর হৃদয়ে অম্লান। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান সৈয়দ আশরাফ সেদিন তাঁর লিখিত বক্তব্য সরিয়ে রেখে হৃদয় থেকে বলেছিলেন, তিনি নিজে আওয়ামী লীগের ঘরেই জন্মেছেন, দল ব্যথা পেলে তাঁর বুকেও ব্যথা অনুভূত হয়। তিনি সেদিন লাখো জনতা ও গণমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট করেছিলেন, আওয়ামী লীগ নিছক একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং শহীদদের রক্ত, জাতির পিতার আত্মত্যাগ ও হাজারো নেতাকর্মীর সংগ্রামে গড়ে ওঠা একটি অনুভূতির নাম- যে অনুভূতির মূলে আছে ত্যাগ ও আত্মত্যাগ। আরেকটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ অবিনশ্বর, একে ধ্বংস করা যায় না, যাবে না।

​এই অনুভূতির কারণেই ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বারবার সুগভীর ও নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের শিকার হলেও প্রতিবারই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিঃশেষ করার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে আইনি উপায়ে এই হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়। দলটিকে টুকরো টুকরো করে মুছে ফেলার রাষ্ট্রীয় নীল নকশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলের লক্ষ-কোটি কর্মীর হৃদয়ে সেই অনুভূতি বেঁচে ছিল বলেই ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি জননেত্রী শেখ হাসিনা। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রাম সম্পর্কে শেখ হাসিনা সবসময় তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ও ভাষ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ কখনো ক্ষমতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই এই দলের মূল লক্ষ্য। প্রতিটি সংকট ও দুর্যোগে সবটুকু উজাড় করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই আওয়ামী লীগের প্রকৃত ঐতিহ্য।

​কিন্তু ষড়যন্ত্রের রক্তচক্ষু কখনো থমকে থাকেনি। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট রাজধানীর বুকে প্রকাশ্য জনসভায় বর্বরোচিত ও সুপরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়, যেখানে আইভি রহমানসহ দলের ২৪ জন ত্যাগী নেতাকর্মী প্রাণ হারান। এরপর আসে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের মাইনাস-টু ফর্মুলার কঠিন সময়। সেই ঘোরতর সংকটেও দল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু দলের অকুতোভয় তৃণমূল ও আদর্শিক নেতৃত্ব আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলকে টেনে তুলেছিল খাদের কিনারা থেকে। সাময়িক বিপর্যয় পেরিয়ে প্রতিবারই এই দল অন্ধকার সময় পার করে জ্বেলেছে আলোর মশাল।

​শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশ অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ছিল দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কত্বের অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। এই দেড় দশকে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়, দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে আসে ১৮.৭ শতাংশে, একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ৫.৬ শতাংশে এবং বেকারত্বের হার নেমেছিলো তিন শতাংশে।

​এই শাসনামলেই হেনরি কিসিঞ্জারের তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ গুরুত্বপূর্ণ ও বিচক্ষণ বহু মেগা প্রকল্পের এক অনন্য অর্জনের ঠিকানায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সব ষড়যন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রমত্তা পদ্মার বুকে নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু আমাদের জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক। এর সাথে যুক্ত রয়েছে দ্রুতগতির মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।
​গণমানুষের প্রতিটি মৌলিক চাওয়া- খাদ্য নিরাপত্তা, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সংযুক্তি- সবকিছুতেই আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা আজ ইতিহাসের পাতায় সুস্পষ্ট।

​তাছাড়া এটা প্রমাণিত সত্য যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা এবং স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

​২০২৪ সালের আগস্টে একটি অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক পট-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবার এক চরম ক্রান্তিকালের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশজুড়ে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, বর্বরোচিত নির্যাতন, ঢালাও মিথ্যা মামলা এবং তীব্র রাজনৈতিক হয়রানি চালানো হচ্ছে।

​কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের নির্মম সত্য এটাই যে, কোনো আদর্শকে জোর করে কখনো মুছে ফেলা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিখ্যাত প্রবাদ রয়েছে- "Democracy is not a destination. It is a journey." অর্থাৎ, গণতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর ও চলমান যাত্রা। উত্থান-পতন, সংগ্রাম আর পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের ৭৭ বছরের দীর্ঘ অভিযাত্রাও যেন গণতন্ত্রের সেই অমোঘ ও চিরন্তন যাত্রার এক জীবন্ত উদাহরণ।

​একটি রাজনৈতিক দলকে সাময়িকভাবে কোণঠাসা করা যায়, তার কার্যালয় অবরুদ্ধ করা যায়, এমনকি তার নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম কিংবা কারাগারে পাঠানো যায়- কিন্তু একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন ও মননে গেঁথে থাকা যে গভীর রাজনৈতিক অনুভূতি, তাকে কোনো ষড়যন্ত্র বা অস্ত্রের মুখে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব।

​বর্তমানের এই কঠিন সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাসে একেবারেই নতুন কিছু নয়; ১৯৭৫ বা ওয়ান-ইলেভেনের খরতাপ পেরিয়ে যেভাবে এই দল মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, আজকের এই সাময়িক অন্ধকারও ঠিক তেমনই অস্থায়ী।

​৭৭ বছরের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আওয়ামী লীগ কেবল অতীতের গৌরব কিংবা বর্তমানের সংগ্রাম নয়, ভবিষ্যতেরও অবিকল্প মুক্তির দিশারি। বাঙালির মননে গেঁথে থাকা এই ‘অনুভূতি’ যতদিন জাগ্রত থাকবে, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

​সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, সাময়িক অন্ধকার ও ফ্যাসিবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আবারও আওয়ামী লীগ রাজপথে বিজয়ের নিশান উড়াবে। কারণ, ইতিহাস ও সময় সবসময় সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেয়- যেখানে মিশে থাকে কোটি মানুষের গভীরতম অনুভূতি আর ত্যাগের মহিমা, সেখানেই শেষ পর্যন্ত রোপিত হয় দেশ ও জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের চূড়ান্ত ঠিকানা।

​লেখক: সাইফুল্লাহ্ আল মামুন, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি।⁩

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত