বাঙালি, বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ অবিচ্ছেদ্য

5

Published on জুন 23, 2026
  • Details Image

⁨বাঙালি, বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগ এক সুতোয় গাঁথা। একটি থেকে আরেকটি অবিচ্ছেদ্য। আওয়ামী লীগের আবির্ভাব না হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালে বাঙালির প্রাণের দাবি ছয় দফা উত্থাপন, উনসত্তরের গণ-আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- বাঙালির স্বাধীকার অর্জনের প্রতিটি পদক্ষেপে মূল ভূমিকা পালন করেছে আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। কালের বিবর্তনে, রাজনীতির বহুবিধ পট পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় সেই দলটি দীর্ঘ ৭৬টি বছর পার করে এসেছে। এর মধ্যে অনেক উত্থান-পতন, চড়াই-উৎড়াই ও দেশি-বিদেশি বহু ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেছে এবং এখনো করছে। তার পরও দলটি মাথা উুঁচু করে টিকে আছে এবং টিকে থাকবে।

বাংলাদেশ আজ বহুবিধ ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রভূমি। দীর্ঘ দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং ব্যাপক অগ্নিসন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। অন্তবর্তী সরকারের আড়ালে ক্ষমতা চলে যায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে সারা দেশে ব্যাপক হামলা ও হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে। গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। স্বাধীনতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। মুজিবনগরে অবস্থিত স্বাধীনতার স্মারকগুলো ভেঙে ফেলা হয়। সারা দেশে থাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ধ্বংস করা হয়। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়। সেই সময়ে নানা নাটকীয়তা এবং গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনের নামে প্রহসন করা হয়। বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানো হয়। প্রহসনের বিরোধী দল সাজে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে চলে ষড়যন্ত্রে মদদদাতা বিদেশি প্রভুদের খুশি করার পালা। গোপনে সমুদ্রের তেল-গ্যাস, সেন্ট মার্টিন, চট্টগ্রাম বন্ধর, মিয়ানমারের জন্য করিডর দিয়ে নানা ধরনের গোপন চুক্তি হতে থাকে। সবই বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য সর্বনাশী।
আওয়ামী লীগের ৭৬ বছরের ইতিহাস মূলত দুর্গম পথচলার ইতিহাস। ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এগিয়ে চলার ইতিহাস। চড়াই-উতরাই পার হওয়ার ইতিহাস। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলের সন্তোষে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ভাগ হয়ে যায়। ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট শামসুল আরেফিন খান লিখেছেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ গ্রহণ করলেন। তাঁর প্রিয় সহচর শেখ মুজিবুর রহমান দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের স্থলাভিষিক্ত হলেন। টাঙ্গাইলের জনপ্রিয় নেতা শামসুল হক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মওলানা ভাসানী সভাপতির গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে দাউদকান্দির সোহরাওয়ার্দী-অনুসারী পাশ্চাত্যপন্থী নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের জ্যেষ্ঠতার দাবি অগ্রাহ্য করে রাজবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত করলেন। পাশ্চাত্যপন্থী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সমাজতন্ত্র-অনুসারীদের দলের নেতৃত্বে বরণ করতে মোটেও দ্বিধা বোধ করলেন না, বরং তাঁদের অবলম্বন করে দলকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অভিষিক্ত করলেন। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের নতুন যাত্রা শুরু হলো।
১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করলে তাঁকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগে দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্তি দেখা যায়। দলের সভাপতি আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। একই কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবকে সভাপতি আর তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে দল পুনর্গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ঘোষিত ছয় দফা সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পারে, ছয় দফার ভেতরই লুকিয়ে আছে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ। আইয়ুব খান শেখ মুজিবসহ তাঁর প্রায় সব রাজনৈতিক সহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেন আর তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে সামরিক আদালতে বিচারের নামে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর সহকর্মীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে শুধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাই ভেসে যায়নি, আইয়ুব খান নিজেও ক্ষমতাচ্যুত হন। নতুন সামরিক শাসক হয়ে আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে সরকার গঠন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দুরূহ কাজটি হাতে তুলে নেন এবং সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশটিকে নিজের পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে দেশের শত্রুরা সপরিবারে হত্যা করলে আওয়ামী লীগ আবার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। দলটিকে সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে কারাগারে বন্দি জাতীয় চার নেতাকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকার কারণে ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের এক বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে প্রবাসে নির্বাসন জীবন যাপনকারী শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সেই বছর ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশের এক ক্রান্তিকালে দেশে ফেরেন। তাঁর নেতৃত্বেই দলে নতুন করে ঐক্য সুসংহত হয়। এর পর থেকে ৪৪ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বেই দলটি গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামেও সফলতা দেখিয়ে আসছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিজয়লাভের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পেছনে দলটির মুখ্য অবদান ছিল। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। নির্বাচনে জিততে পারবে না দেখে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচন প্রতিহত করার নামে বাসে পেট্রল বোমা নিক্ষেপসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। কিন্তু নির্বাচন ঠিকই সম্পন্ন হয়। এরপর শুরু করে নির্বাচনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। ইন্ধনদাতা পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো তাদের সঙ্গে সুর মেলায়। মেটিকুলাসলি ডিজাইন করা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সরকারকে ক্ষমতাচু্্যত করা হয়। শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় শুধু নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের যত গৌরবোজ্জল অর্জন, সবই হয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের মানুষ নিরাপদ বোধ করে। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে গত ১৫ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অতীতে আর কখনো হয়নি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ বলেই দলটি সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে জেগে উঠতে পারে।
আমাদের বিশ্বাস আছে ষড়যন্ত্রের সব কালো মেঘ অচিরেই কেটে যাবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা আবারো স্বমহিমায় দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। তাঁর সফল ও কার্যকর নেতৃত্বে দলটি আবারো মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌছে যাবে। ষড়যন্ত্রকারীরা অতীতের মতোই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
জয়বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: এম নজরুল ইসলাম, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক⁩

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত