আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : সরকারের দমন-পীড়নের প্রভাব কেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ

304

Published on জুন 21, 2026
  • Details Image

আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কিন্তু এবারের দিনটা আগের মতো নয়। দলটিকে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এর লাখো নেতাকর্মী কারাগারে কিংবা প্রাণ বাঁচাতে আত্নগোপনে চলে যেতে হয়েছে, আর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কথা বললেও প্রকাশ্যে কিছু করার উপায় নেই। যে দল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছে, তাকেই আজ নিজের দেশে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটা শুধু একটা দলের সংকট নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক বড় প্রশ্ন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরোনো ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের জন্ম। সেই থেকে বাংলাদেশের প্রতিটা সন্ধিক্ষণে এই দলের অবদান দেখতে পাওয়া যায় - বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, আর সবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বলা যায়, এই দলের ইতিহাস আর বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। তাই দেশের সবচেয়ে পুরোনো এই রাজনৈতিক দলকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা শুধু একটা দলকে নয়, দেশের নিজের পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে দেশব্যাপী জুলাই দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেশের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে অবৈধভাবে দেশের ক্ষমতা দখলের পর সবকিছু বদলে যায়। প্রথমে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার, পরে বিএনপি ও তার মিত্ররা ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতির মাঠ ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগ ও তার সব সহযোগী সংগঠনকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ে, খুব বাস্তবভাবে। হাজার হাজার কর্মী ও নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কাউকে কাউকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে কিংবা জনতার হামলায় প্রাণ হারানোর খবরও এসেছে। ঘরোয়া বৈঠক বা সাধারণ সামাজিক অনুষ্ঠানেও নজরদারি আর বাঁধার মুখে পড়তে হচ্ছে কর্মীদের। সংগঠন করার, একত্র হওয়ার, নিজের মত প্রকাশ করার যে অধিকার গণতন্ত্রের ভিত্তি, সেটাই এখানে সংকুচিত।

এই দমন-পীড়নটা ঠিক কতটা বড় ক্ষতি, সেটা বোঝা যায় জননেত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের দিকে তাকালে। সমর্থক হোক বা আন্তর্জাতিক সংস্থা - সবার পরিসংখ্যানই বলে, এই সময়টায় বাংলাদেশ বদলে গেছে অনেকখানি। বছরের পর বছর জিডিপি বেড়েছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে। পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে শেষ হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৮ শতাংশের নিচে, মানে লাখো মানুষ দারিদ্র্যসীমা পেরিয়ে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে ঢুকেছে। মোবাইল ইন্টারনেট পৌঁছেছে গ্রামে গ্রামে, "ডিজিটাল বাংলাদেশ" নামের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল তার পুরোটাই বাস্তব হয়েছে। নারীর আর্থিক স্বাধীনতা আর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীও বিস্তৃত হয়েছে এই সময়ে।

এই অর্জনগুলো শুধু কাগজে-কলমের পরিসংখ্যান নয়, এগুলো মানুষের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন। বিদ্যুৎ পৌঁছানো গ্রাম, সেতু পেরিয়ে শহরে পৌঁছানো কৃষকের ফসল, বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটা দেশ - এই ছিল সেই সময়ের গল্প। আজকের অস্থিরতার সাথে তার ফারাক স্পষ্ট। একদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিভেদ আর উগ্রপন্থাকে জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে - এই দ্বিচারিতার মধ্যেই ভেঙে পড়ছে ১৫ বছরের গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো।

তারপরও আওয়ামী লীগের নেতারা সংযম দেখিয়ে আসছেন। তাদের দাবি একদমই স্পষ্ট - রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হোক, বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হোক, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া হোক। ৭৮ বছরে পা রাখতে যাওয়া এই দলটির শক্তি এখনো লুকিয়ে আছে তৃণমূলে, আর একাত্তরের আদর্শে। তাদের কথা একটাই - বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে কোনো দলকে স্তব্ধ করে নয়।

এই সংকট শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় একটা রাজনৈতিক দলকে এভাবে কোণঠাসা করার সুযোগ দিলে, "সংস্কার"-এর নামে আসলে একনায়কতন্ত্রকেই বৈধতা দেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক বিশ্ব আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উচিত এই গণগ্রেপ্তার আর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দিকে মনোযোগ দেওয়া, অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই।

৭৭ বছর আগে যে স্বপ্ন নিয়ে এই দলের জন্ম হয়েছিল, আজকের বাংলাদেশ তার থেকে কতটা দূরে সরে গেছে, এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আসলে সেই প্রশ্নটাই নতুন করে তুলে ধরছে।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত