162
Published on মে 3, 2026একটি দেশের উন্নয়নের ইতিহাস লেখা হয় সাহসী সিদ্ধান্তে, নিন্দা-সমালোচনা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই চিত্রটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের মেগাপ্রকল্পগুলোর বেলায়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র — প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে শুধু অর্থ ও প্রকৌশল ছিল না, ছিল একটি অসম লড়াই। একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যা প্রচারণার দেয়াল।
পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধের ফসল। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়নের চুক্তি করে। কিন্তু ২০১২ সালে তারা কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে কানাডার আদালতে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততদিনে বিরোধীরা এই ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। সেই সংকটের মুহূর্তে শেখ হাসিনা যা করলেন, তা অনেকের কাছেই অসম্ভব মনে হয়েছিল — তিনি ঘোষণা দিলেন, বিদেশি সাহায্য ছাড়াই নিজেদের অর্থে সেতু বানাবেন।
শেখ হাসিনার এই দৃঢ়তা দেখে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া কি ছিল?
বেগম খালেদা জিয়া বললেন:
❝ পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। ❞
সূত্র: NTV Online, জানুয়ারি ২০১৮
🔗 https://www.ntvbd.com/bangladesh/174609
এই বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি কেবল রাজনৈতিক সমালোচনা নয় — এটি ছিল দেশের মানুষের স্বপ্নকে অবিশ্বাস করার ঘোষণা। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন "হবে না" — তখন তিনি শুধু বিরোধিতা করেন না, তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের আশাকে নিরুৎসাহিত করেন। দক্ষিণাঞ্চলের যে কৃষক, যে ব্যবসায়ী, যে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ফেরির লাইনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন — তাঁদের সেই স্বপ্নকে "জোড়াতালি" বলা হয়েছিল।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন:
❝ পদ্মা সেতু কারো পৈতৃক সম্পত্তি দিয়ে হচ্ছে না। আমাদের গায়ে জ্বালা হচ্ছে পদ্মা সেতু থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে সম্পদ করছে। ❞
সূত্র: Dhaka Tribune, মে ২০২২
🔗 https://www.dhakatribune.com/bangladesh/politics/289001/fakhrul-not-padma-bridge-massive-plundering
লক্ষ্য করুন — এই বক্তব্যে একটি চালাকি আছে। প্রত্যক্ষভাবে সেতুর বিরোধিতা না করে দুর্নীতির ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে জনমনে সেতুর প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়। এটি বিএনপি-জামাতের রাজনীতির পুরনো কৌশল — নির্মাণকে নয়, নির্মাতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করো।
যখন নির্মাণ শেষ হলো তখন বিএনপি পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠান বর্জন করল।
সূত্র: The Daily Star, জুন ২০২২
🔗 https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/politics/news/bnp-wont-join-padma-bridge-inauguration-fakhrul-3053841
এই বর্জনটি প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতীয় অর্জনের উদযাপনে অনুপস্থিত থাকা মানে হলো — সেই অর্জনকে জাতীয় বলে স্বীকার না করা। এটি দলীয় রাজনীতিকে দেশের উপরে স্থান দেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
এরপর যা হলো — বাস্তবতা কথা বলল:
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে, তা আর কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়, এটি এখন পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা। জাতীয় জিডিপিতে বার্ষিক ১.২৩% অবদান যোগ হচ্ছে শুধু এই একটি সেতুর কারণে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক জিডিপি বাড়ছে ২.৫%। ঢাকা থেকে ট্রাকযোগে মালামাল পরিবহনে আগে যেখানে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগত, এখন লাগছে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। এই একটি পরিবর্তনই কৃষিপণ্যের পচন কমিয়েছে, উৎপাদক কৃষকের আয় বাড়িয়েছে, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। দক্ষিণাঞ্চলের সবজি এখন প্রথমবারের মতো ইউরোপে রফতানি হচ্ছে। মংলা বন্দর যেটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে ছিল, সেটি এখন সক্রিয় — চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপ কমছে।
সূত্র: The Daily Star / ADB / Copenhagen Consensus Center
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে ঘটনাটি:
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর মির্জা ফখরুল নিজেই বললেন:
❝ দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। মানুষ উন্নয়ন চায়। ❞
সূত্র: The Business Standard, জুলাই ২০২৫
https://www.tbsnews.net/bangladesh/political-commitment-essential-padma-barrage-and-second-padma-bridge-implementation-mirza
যিনি একদিন বলেছিলেন সেতুতে "গায়ে জ্বালা", তিনিই এখন দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর দাবি তুলছেন। এর চেয়ে বড় স্বীকারোক্তি আর কী হতে পারে?
মেট্রোরেলের বিরোধিতাটি পদ্মা সেতুর চেয়েও বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। কারণ এটি ছিল ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত — এবং বিরোধীরা জানত, এটি সফল হলে সরকারের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে।
মির্জা ফখরুল বললেন:
❝ মিরপুর থেকে দেখুন — কিছুক্ষণ পর পর স্টেশন। এর কোনো প্রয়োজন নেই। আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, সংসদ ভবন, ফার্মগেট — একটার পর একটা স্টেশন। মেগা প্রজেক্টে মেগা লুটপাট চলে। ❞
সূত্র: Bangla Tribune / Artho Suchak, ২০২১–২২
🔗 https://www.banglatribune.com/politics/bnp/745081
এই বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করা দরকার। মেট্রোরেলের স্টেশন কাছাকাছি হওয়া আসলে একটি পরিকল্পিত নগর পরিবহন কৌশলের অংশ — যাতে যাত্রীরা সহজে উঠতে ও নামতে পারেন এবং হেঁটে স্টেশনে পৌঁছানো সম্ভব হয়। বিশ্বের যেকোনো উন্নত শহরের মেট্রো ব্যবস্থায় এই নীতি অনুসরণ করা হয়। যিনি এটিকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন, তিনি হয় এই মৌলিক বিষয়টি জানতেন না, অথবা জেনেশুনেই জনগণকে বিভ্রান্ত করছিলেন।
এরপর যা হলো:
আজ প্রতিদিন ৪ লাখ মানুষ মেট্রোতে চড়ছেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে যেখানে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হতো, এখন সেটি মাত্র ৩৮ মিনিটের যাত্রা। ঢাকার লাখো কর্মজীবী মানুষের, বিশেষত নারী যাত্রীদের, দৈনন্দিন জীবনে এই পরিবর্তনটি যে কতটা বড়, তা যারা প্রতিদিন মেট্রোতে যাতায়াত করেন তারাই বোঝেন।
৫ আগস্টের পর তারেক রহমান বললেন:
❝ বিএনপি ক্ষমতায় এলে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালু করা হবে। ❞
সূত্র: Times of Dhaka, জানুয়ারি ২০২৬
🔗 https://thetimesofdhaka.com/editors/metro-rail-editors/12251/
যে মেট্রোরেলের স্টেশন গুনে গুনে "অপ্রয়োজনীয়" বলা হয়েছিল, সেটিকেই এখন আরও বিস্তার করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। রাজনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় — বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার।
শুধু পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নয়—গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই সময়ে অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর ও রেলপথের সম্প্রসারণ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করেছে এবং শিল্পায়নের ভিত্তি মজবুত করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবার বিস্তার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং মাথাপিছু আয়ের উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মূল শক্তি কোথায় ছিল?
মেগাপ্রকল্পগুলোর গল্প শুধু অবকাঠামোর গল্প নয়। এটি একটি নেতৃত্বের গল্প।
রাজনৈতিক বিরোধিতা সহ্য করা একটি কঠিন কাজ। কিন্তু আরও কঠিন কাজ হলো — যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা মুখ ফিরিয়ে নেয়, যখন দেশের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়, যখন বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তোলেন — তখনও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা। পদ্মা সেতুর বেলায় শেখ হাসিনাকে ঠিক এই পরীক্ষাটিই দিতে হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক চলে গেছে, বিরোধীরা "হবে না" বলছে, মিডিয়ার একটি অংশ সংশয় প্রকাশ করছে — তবুও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি।
এই মনোবলের পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি — উন্নয়নকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে নয়, জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখা। যে প্রকল্পে লাভ আসবে ১৫–২০ বছর পরে, সেই প্রকল্পের পক্ষে রাজনৈতিক সাহস দেখানো সব নেতার পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ রাজনীতির চক্র পাঁচ বছরের, কিন্তু একটি সেতুর আয়ুষ্কাল একশো বছরের।
এই সব বিরোধিতার একটি সাধারণ ধরন আছে। প্রথমে বলা হয় "হবে না।" যখন হয়ে যায়, তখন বলা হয় "দুর্নীতি হয়েছে।" যখন সুবিধা স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন বলা হয় "আমরাও এরচেয়ে ভালো করতাম।" এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় এসে একই প্রকল্প সম্প্রসারিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এটি কোনো বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষভাবে তীব্র ছিল — কারণ এই দেশে বিএনপি-জামাতের উন্নয়নবিরোধী রাজনীতির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেছিল, তারা দেশের উন্নয়নকে কখনোই নিজেদের স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। একটি আত্মনির্ভরশীল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্যই হুমকি।
এই কারণেই "জোড়াতালির সেতু" বলা হয়েছিল।
এই কারণেই "মেগা প্রজেক্টের প্রয়োজন নেই" বলা হয়েছিল।
এই কারণেই উদ্বোধন অনুষ্ঠান বর্জন করা হয়েছিল।
ইতিহাস বিচার করে কাজ দিয়ে — কথা দিয়ে নয়।
পদ্মা সেতু আজ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পার হচ্ছেন। মেট্রোরেলে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকার বুকে গতি ফিরিয়ে এনেছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র আলো জ্বালাবে। আর যারা বলেছিলেন "হবে না" — তারা এখন বলছেন "আরও চাই।" এটিই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। যে স্বীকৃতি তাঁর বিরোধীরাই দিয়েছেন — হয়তো না চাইতেই।
---
লেখক: মফিজুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী