44
Published on ফেব্রুয়ারি 15, 2026সব সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ছিল একাধারে প্রহসনমূলক এবং বিতর্কিত। জোরপূর্বক নীরবতার মধ্যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলেও একে 'শান্তিপূর্ণ' ও উৎসবমুখর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৮ মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই ছিল প্রথম ভোট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 'জুলাই জাতীয় সনদ' নামে পরিচিত প্রধান সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোটে বিপুল ব্যবধানে "হ্যাঁ" জয়লাভ করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে তাদের প্রতীক 'নৌকা' নিয়ে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।
নির্বাচন যদি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হয়, তবে এর বৈধতা কেবল ফলাফলের ওপর নয়, বরং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপরও নির্ভর করে। এই নির্বাচন এবং গণভোটে পরস্পরবিরোধী সংকেত জনমানসে আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়ার গণতান্ত্রিক সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংসদীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় ৫৯.৪% এবং গণভোটে প্রায় ৬০.২৬%। প্রথম দেখায় এই সংখ্যাগুলো শক্তিশালী জনঅংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়। তবে অনেক সমালোচক, বিশেষ করে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, এ ভোটার উপস্থিতির এই সরকারি হিসাব ভুল অথবা বাড়িয়ে বলা হয়েছে। এই দলটিকে এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে একটি "পূর্বপরিকল্পিত প্রহসন" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ফলাফল ঘোষণার অনেক আগেই ভোটকেন্দ্রগুলো শূন্য ছিল। এই অভিযোগগুলো সেইসব ভোটারদের ব্যাপক অবিশ্বাসেরই অংশ, যারা মনে করছেন তারা এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।
গণভোটের কিছু অদ্ভুত পরিসংখ্যান এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে অবিশ্বাস্য ভোটার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যেখানে দেখা যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় উপস্থিতির হার ১০০% ছাড়িয়ে গেছে। যেমন রাজশাহী-৪ আসনে কথিত ২৪৪% উপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে। আবার কিছু জায়গায় দেখা গেছে, মোট কাস্টিং ভোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই অসংগতিগুলো স্রেফ যান্ত্রিক ভুল, তথ্য উপাত্তের সমস্যা নাকি অন্য কোনো গুরুতর কারণ থেকে উদ্ভূত, নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
গণভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছে 'জুলাই জাতীয় সনদ' অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেকগুলো সাংবিধানিক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ "হ্যাঁ" এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে ভোটের আগেই সমালোচকরা সতর্ক করেছিলেন যে, অনেকগুলো জটিল পরিবর্তনকে একটি মাত্র "হ্যাঁ/না" প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ এবং কম সচেতন ভোটারদের মধ্যে। এছাড়া এমন অভিযোগও ছিল যে, ব্যালট পেপারে কোনো ক্রমিক নম্বর ছিল না । 'হ্যাঁ/না' প্রতীকের সাথে 'টিক' ও 'ক্রস' চিহ্নের ব্যবহার বিভ্রান্তিকর ছিল। স্বল্প শিক্ষিত মানুষ বেশি এমন এলাকায় এর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। ইচ্ছাকৃত এসকল কার্যকলাপের মাধ্যমে মানুষের ভোট দেওয়ার আত্মবিশ্বাস এবং তাদের ব্যালট বৈধ হবে কি না, তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পড়ুনঃ
ভোটের সিল এবং ব্যালট পেপার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, কিছু কিছু ব্যালট বা সিল ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগের রাতেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। এটি জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এছাড়া জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা ভোট গণনায় ত্রুটি এবং রেজাল্ট শিট অসংগতির অভিযোগ এনে আবেদন করেছেন। তারা মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু ভোট পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। এই সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নাকি কোনো বড় সমস্যার অংশ তা এখনও অস্পষ্ট, তবে এগুলো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য ছিল না এমন একটি ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
পড়ুন
নির্বাচনের শেষ দিনগুলোতে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল ভোট কেনাবেচার অভিযোগ, যা বিশেষভাবে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পক্ষের সাথে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অভিযোগ করেছে যে, ভোটারদের প্রভাবিত করতে জামায়াতে ইসলামী অর্থ বিতরণ করছে। এমনকি সরাসরি সাধারণ মানুষ এবং শিশুদের হাতেও নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। বিএনপি এই কৌশলগুলোকে জামায়াতের রাজনৈতিক হতাশার লক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির জন্য হুমকি হিসেবে সমালোচনা করেছে। কিছু নির্বাচনী এলাকায় অর্থ লেনদেনের কথিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পড়ুন
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোট নির্বাচন একই সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংসদীয় নির্বাচনে প্রায় ৫৯.৪৪% এবং গণভোটে প্রায় ৬০.২৬% ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন। নির্বাচনের দিনজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তথ্য আসার সাথে সাথে এই সংখ্যাগুলোতে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে।
সকাল ১১টার দিকে নির্বাচন কমিশন জানায় যে উপস্থিতির হার খুবই কম। কিন্তু এরপরই তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, যা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পড়ুনঃ
এই নির্বাচনটি প্রকৃতপক্ষে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রায় ৪০% ভোটারের সমর্থন ছিল, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং দলটির কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছিল। আপনি তাদের নীতির সাথে একমত হন বা না হন, একটি প্রধান দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া ভোটারদের বিকল্প বা পছন্দের সুযোগকে সংকুচিত করে। অনেকের কাছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে, এটিকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন বলে মনে হয়নি। এটি এমন একটি মেনুকার্ডের মতো ছিল যেখানে মাত্র কয়েকটি খাবারই ছিল।
পড়ুনঃ
অনেকে দাবি করছেন যে, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছিল এবং কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে পক্ষপাতিত্ব ছিল। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে। বর্তমানে এই সকল দাবি পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন হলেও, অভিযোগের এই বিশাল সংখ্যাটিই ইঙ্গিত দেয় যে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু শাসনের ওপর জনগণের আস্থা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
নাগরিক সমাজের অংশসহ কিছু স্থানীয় পর্যায় থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বিদেশি পর্যবেক্ষক মিশনগুলো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তান ও তুরস্কের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের প্রভাব সরকারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই দাবিগুলো সত্য হোক বা না হোক, এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে: পক্ষপাতিত্বের ধারণাও প্রকৃত পক্ষপাতিত্বের মতোই ক্ষতিকর হতে পারে।
পড়ুনঃ
সংখ্যা এবং আসন দিয়ে পুরো পরিস্থিতির কেবল একটি অংশই বোঝা যায়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক বৈধতা তখনই আসে যখন মানুষ অনুভব করে যে তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ, তাদের পছন্দগুলো বাস্তব এবং পুরো প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং গণভোটের ফলাফল কাগজে-কলমে ভালো দেখাচ্ছে। এখানে ভোটার উপস্থিতির হার উচ্চ এবং ফলাফলও সুনির্দিষ্ট। কিন্তু ভোটার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন, বিভ্রান্তিকর ব্যালট, প্রধান রাজনৈতিক দলের বর্জন এবং অনিয়মের প্রতিবেদনগুলো গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশ এখন তার ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে জনমনে সংশয় থেকে যায়, তবে দেশটির ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরো জানতেঃ