বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচন: গণতন্ত্র অস্বীকৃত, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে ক্ষমতায়নের পথ

261

Published on জানুয়ারি 3, 2026
  • Details Image

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে এবং কোটি কোটি ভোটারের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে ইউনূস সরকার কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে চরমপন্থী শক্তি ও দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনকে “গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ,যাদের প্রতি প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে, নিষিদ্ধ করে ইউনূস সরকার নিশ্চিত করেছে যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কার্যত নির্বাচনের বাইরে থাকবে। যে নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিককে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তা গণতন্ত্র নয়,তা সুপরিকল্পিত নাটক।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা এবং পরবর্তীতে ইউনূস সরকারের আরোপিত আইনি নিষেধাজ্ঞা কোনো নিরপেক্ষ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ছিল না। এটি ছিল একটি সচেতন ও হিসাবনিকাশ করা রাজনৈতিক আঘাত। অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে অক্ষম হয়ে সরকার দলটিকেই সরিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এটি কোনো নির্বাচনী সংশোধন নয়; এটি ভয় থেকে জন্ম নেওয়া গণবঞ্চনা

কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্র তার বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বৈধতার দাবি করতে পারে না। গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ব্যালটের মাধ্যমে; কর্তৃত্ববাদে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা হয় আইনের অপব্যবহারে। এই সীমা অতিক্রম করে ইউনূস রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছেন এবং নির্বাচনকে রূপ দিয়েছেন পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায়।

ভোটারদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির জন্য নয়, বরং তারা কাকে সমর্থন করে সেই কারণেই। ভোট দেওয়ার আগেই তাদের ব্যালট বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। যখন একটি সরকার নির্বাচনের ওপর নয়, বরং ভোটারের ওপর ভয় পায়, তখন গণতন্ত্র কেবল দুর্বল হয় না,তা ভেঙে পড়ে।

প্রতিযোগিতা ছিল, নিষেধাজ্ঞা নয়: ইতিহাসের সঙ্গে ইউনূসের প্রতারণা

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতা দেখাতে ইউনূস সরকার বারবার অতীত নির্বাচনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, যেন প্রমাণ করা যায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র আগেই ভঙ্গুর ছিল। কিন্তু এই বক্তব্য তথ্যের মুখে টেকে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের কোনো নির্বাচনেই একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলও নিষিদ্ধ করা হয়নি। প্রতিটি দলেরই আইনি অধিকার ছিল নির্বাচনে অংশগ্রহণের।

যেখানে অংশগ্রহণ সীমিত ছিল, সেখানে তা ছিল রাজনৈতিক বর্জনের ফল, রাষ্ট্রের চাপ বা নিষেধাজ্ঞার নয়। নির্বাচনে না দাঁড়ানো আর নির্বাচনে দাঁড়াতে না দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য মুছে ফেলার চেষ্টা ইচ্ছাকৃত এবং বিভ্রান্তিকর।

বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। বিরোধী দল অংশ না নিলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া আইনি দিক থেকে উন্মুক্ত ছিল। রাষ্ট্র তখন প্রতিদ্বন্দ্বী সরিয়ে দিয়ে ফল নির্ধারণ করেনি।

এখানেই প্রকৃত বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। হাসিনা প্রতিযোগিতার সুযোগ দিয়েছিলেন; ইউনূস সেই প্রতিযোগিতাকেই ধ্বংস করছেন। আজ যা ঘটছে তা কোনো গণতান্ত্রিক সংশোধন নয়; এটি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ,সংস্কারের ভাষায় উপস্থাপিত একটি রাজনৈতিক সংকোচন, যার মূল চালিকাশক্তি নীতি নয়, নিরাপত্তাহীনতা।

চরমপন্থার স্বাভাবিকীকরণ: ইউনূসের অধীনে নিষিদ্ধের রাজনীতি

ইউনূস কেন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে দেখতে চান না,এই প্রশ্নের উত্তর যতটা সরল, ততটাই বিপজ্জনক। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ইসলামপন্থী চরমপন্থী শক্তি ও অপরাধে জড়িত রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থাকতে পারে, কিন্তু সেটিই মূল কৌশল নয়। মূল কৌশল হলো বর্জন,কারণ আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দিতে পারলেই এই শক্তিগুলো বাস্তবসম্মতভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে পারে।

দশকের পর দশক ধরে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো অবাধ নির্বাচনে জাতীয় ম্যান্ডেট পেতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের আদর্শ, ইতিহাস এবং উগ্রবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাদের নির্বাচনীভাবে প্রান্তিক রেখেছে,যতদিন একটি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প উপস্থিত ছিল। সেই বিকল্পটিকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার পর চরমপন্থী রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিকীকরণ পাচ্ছে। ইউনূসের অধীনে ইসলামপন্থী জোট আর রাজনৈতিক লাল সংকেত নয়; বরং গ্রহণযোগ্য সমঝোতা। এভাবেই চরমপন্থা রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে,জনসমর্থন জিতে নয়, বরং পরিকল্পিত শূন্যতা কাজে লাগিয়ে।

এই একই রাজনৈতিক প্রকৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে তারেক রহমানের পুনর্বাসনে। দুর্নীতি, অস্ত্র পাচার ও আর্থিক অপরাধের সঙ্গে যার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতা এবং দীর্ঘদিনের মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তাকে যে কোনো প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ভোটাররা যখন বাস্তব বিকল্প পেয়েছে, তখন তারা এই রাজনীতিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেই প্রত্যাখ্যানের আর কোনো মূল্য নেই। তারেক এখন জনরায়ের মুখোমুখি নন; বরং জনরায়কে সরিয়ে দেওয়ার সুবিধাভোগী। এটি কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তর নয়; এটি রাজনৈতিক লন্ডারিং, যেখানে নিয়ন্ত্রিত বর্জনের মাধ্যমে দুর্নীতি ও চরমপন্থাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হচ্ছে।

ইউনূস কোনো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক নন। তিনি সচেতনভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুন করে সাজাচ্ছেন,ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সরিয়ে চরমপন্থী শক্তি ও অপরাধী রাজনীতিকে পুনরায় প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন। এখানে আদর্শিক উগ্রতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে সঞ্চিত সম্পদ পুরস্কৃত হচ্ছে, আর জনসমর্থনকে দেখা হচ্ছে অপসারণযোগ্য বাধা হিসেবে।

এই নীরবতা বিপজ্জনক: বাংলাদেশ প্রশ্নে বিশ্বকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে

যখন নির্বাচন থেকে প্রকৃত পছন্দ কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ক্ষতি শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে না,তা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায়, প্রতিযোগিতাহীন নির্বাচন চরমপন্থা বাড়ায়, রাজনৈতিক সহিংসতাকে বৈধতা দেয় এবং ভোটের ওপর জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস করে। যখন মানুষ বুঝে যায় ফল আগেই নির্ধারিত, তখন ব্যালট অর্থহীন হয়ে পড়ে,আর সেই শূন্যস্থান দখল করে উগ্রবাদ।

বাংলাদেশ আজ সেই পথেই এগোচ্ছে। প্রবাসী ভোটাররা উপেক্ষিত, দেশের ভেতরের ভোটাররা পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত, আর ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠগুলো একে একে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। এখানে আর অংশগ্রহণ নেই,আছে বিচ্ছিন্নতা; স্থিতিশীলতা নেই,আছে ক্ষোভ। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা লাখ লাখ মানুষকে বাইরে ঠেলে দেয়, তা সম্মতি তৈরি করে না; তা ক্ষোভ জমায়।

এই আশঙ্কা কল্পনাপ্রসূত নয়। রাজনৈতিক বর্জনের একটি নির্দিষ্ট গতিপথ রয়েছে, এবং তা খুব কম ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থায় শেষ হয়। বহুত্ববাদ সংকুচিত করে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তালেবান-ধাঁচের বর্জনমূলক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে,যেখানে বৈধতা আসে ভোট থেকে নয়, আসে আদর্শিক আধিপত্য ও বলপ্রয়োগ থেকে। এভাবেই গণতন্ত্র ক্ষয় হয়,প্রথমে নীরবে, তারপর হঠাৎ করে।

এখন দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমন একটি নির্বাচনের বৈধতা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে, যা একটি সাজানো রাজনৈতিক মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তি ছাড়া পর্যবেক্ষণ মানেই নীরব সমর্থন।

আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্র নয়; এটি গণতান্ত্রিক আত্মহত্যা, এবং এর পরিণতি এক দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত