ম্যাখোঁর বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য

621

Published on সেপ্টেম্বর 13, 2023
  • Details Image

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে:

একটি যুগান্তকারী কূটনৈতিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর বাংলাদেশ সফর দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে নির্দেশ করেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ১৯৯০ সালের পর কোনো ফরাসি প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। তাই এই সফর শুধু ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার জন্যই নয়, বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ম্যাখোঁর সফর বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ কেন? অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের অবসর গ্রহণের পর থেকে ইউরোপ এমন একজন নেতার সন্ধানে রয়েছে, যিনি তাঁর প্রস্থানের ফলে শূন্যতা পূরণ করতে পারেন। এরই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডি ফ্যাক্টো নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ভূ-রাজনীতিতে একটি সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ম্যাখোঁ ইইউ যেসব জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা সূক্ষ্মভাবে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করে চলেছেন।

ম্যাখোঁর নেতৃত্বের শৈলীকে সূক্ষ্ম ও বহুমাত্রিক কূটনীতিতে জড়িত থাকার ইচ্ছার দ্বারা চিহ্নিত করা যেতে পারে।

তিনি বিশ্বব্যাপী সম্পর্কের জটিল জাল অতিক্রম করার জন্য সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কিছু নেতার দ্বারা গৃহীত দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির বিপরীতে ম্যাখোঁ প্রতিপক্ষের কৌশলের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করার এবং ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ইউক্রেন সংঘাত এবং ইরানের পারমাণবিক চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মধ্যস্থতা ও সংলাপ সহজতর করার জন্য তাঁর প্রচেষ্টায় এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংলাপ ও সমঝোতার পক্ষে ওকালতি করার মাধ্যমে ম্যাখোঁ একটি আরো সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন।
ফলে তিনি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন।
ম্যাখোঁর বাস্তববাদী অবস্থান অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিষয়ে প্রসারিত হয়েছে, যেখানে তিনি ব্যাবহারিক ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ব্যাপক জলবায়ু নীতির জন্য তাঁর চাপ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য তাঁর সমর্থনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি ফুটে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ম্যাখোঁর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই নয়, সামাজিক সংহতি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের একটি সামগ্রিক পদ্ধতির প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে ম্যাখোঁ শুধু মার্কেলের রেখে যাওয়া নেতৃত্বের শূন্যতার মধ্য দিয়েই হাঁটছেন না, বরং একটি স্বতন্ত্র পথও তৈরি করছেন, যা একটি ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর বাংলাদেশ সফর ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাস দমন, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রে উভয় দেশেরই স্বার্থ রয়েছে। এই সফর উভয় দেশের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ ডোমেনে উন্নত সহযোগিতার উপায়গুলো অন্বেষণ করার জন্য একটি অনন্য সুযোগ প্রদান করবে।

উভয় দেশের আলোচনার ফোকাসের মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। তা ছাড়া প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্রান্সের দক্ষতা থেকে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। দুই নেতার বৈঠকের পরে ঢাকা ও প্যারিসের মধ্যে অবকাঠামো ও স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর উপস্থিতিতে নথিগুলো সই করা হয়। প্রথমটি হলো ইকোনমিক রিলেশন ডিভিশন (ইআরডি), বাংলাদেশ ও ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি) এবং ফ্রান্সের মধ্যে ‘শহুরে শাসন ও অবকাঠামো কার্যক্রমের উন্নতি’ বিষয়ে একটি ক্রেডিট সুবিধাসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক। দ্বিতীয়টি হলো বঙ্গবন্ধু-২ আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম সম্পর্কিত বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এবং এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস এসএএস, ফ্রান্সের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে লেটার অব ইনটেন্ট (খঙও)। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে এই এমওইউগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতির স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থন প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক ও মানবাধিকার রক্ষায় বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স সরকার। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন ম্যাখোঁ। ফলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগামী দিনের অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুব তাৎপর্যপূর্ণ—এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর বাংলাদেশ সফরের সময়টি লক্ষণীয়, কারণ বাংলাদেশ আগামী জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে এই কূটনৈতিক রাজনীতি বর্তমানে চলমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল প্রসিডেন্ট ম্যাখোঁর সফরকে তাদের কূটনৈতিক সফলতা এবং বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এই হাই-প্রফাইল সফরকে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সরকারের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সাংস্কৃতিক বিনিময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সফর উভয় দেশের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান করার জন্য একটি চমৎকার প্ল্যাটফরম প্রদান করেছে। ভাষা শিক্ষা, ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রচারের উদ্যোগ ফ্রান্স ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর বোঝাপড়া ও সহযোগিতার জন্য অনুঘটক হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর বাংলাদেশ সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অঞ্চলের কূটনৈতিক পটভূমিতে নতুন প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে এই সফর। বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এই সফরের প্রভাব কী হয় তা বোঝা যাবে আরো কিছুদিন পর। তবে নিঃসন্দেহে এই সফর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গেমচেঞ্জার হতে পারে। ফলে দুই দেশের এগিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিশ্বসম্প্রদায় গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রত্যক্ষ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণ এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতার একটি নতুন যুগের সাক্ষী হয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সৌজন্যেঃ কালের কন্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত