তারুণ্যের উচ্ছ্বাস

480

Published on মার্চ 16, 2023
  • Details Image

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

৫২ বছর বয়সী বাংলাদেশের বায়ান্ন যোগ চব্বিশ এই ছিয়াত্তর বছরের যে ইতিহাস, তা অনায়াসে হার মানায় অনেক রাষ্ট্রের সহস্র বছরের পরিক্রমাকেও। বছরের বারোটি মাসেই আমাদের রয়েছে এমনি একাধিক তারিখ, যা জাতি হিসেবে বাঙালি কিংবা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অপরিসীম গুরুত্ববাহী। আর যদি মাসগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বাঙালি জাতি ও তার রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো সর্বাধিক সংখ্যায় খুঁজে পাওয়া যায় এই মার্চেই। মার্চের ৭-এ বঙ্গবন্ধুর যে ঐতিহাসিক ভাষণ, তা আজ বাংলাদেশের গন্ডি ছাপিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। মার্চেই আছে ১৭, যেদিন পৃথিবীকে আলোকিত করে জন্মেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মার্চের ২৫ আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহতায় অকালে হারানো ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী-সাধারণ মানুষসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ আর তার একদিন পরেই মার্চের ২৬, যেদিন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সঙ্গত কারণেই মার্চ নিয়ে লিখতে বসা মানেই লেখনিতে নানাভাবে ঘুরে ফিরে উঠে আসে আমাদের জাতি আর রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য এই দিনগুলো। এর ব্যতিক্রম কখনো হয়নি। এবারেও মার্চের শুরুটা হয়েছিল তেমনভাবেই। এই মার্চে প্রথম যে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে, তা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে।

লেখার ধারায় ছেদটা পড়ল ৮ মার্চ। পরপর দুবছর কোভিডের কারণে বন্ধ থাকার পর কোভিড বিজয়ী বাঙালি এবারের ৭ মার্চ উদ্্যাপনে সমবেত বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে। শবেবরাতের কারণে কনসার্টটা একদিন দেরিতে হলেও তাতে বাঙালির উদ্্যাপনে কোনো ভাটা পড়েনি। আর উদ্্যাপনের এই উপলক্ষটা বরাবরের মতো এবারও তৈরি করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগের রিসার্চ উইং সিআরআই। বরাবরের মতোই এবারও সিআরআই-এর আমন্ত্রণে সপরিবারে হাজির হওয়ার সুযোগ হয়েছিল দুরন্ত বাঙালির এই প্রাণবন্ত উদ্্যাপনে। গত শতাব্দীতে আমরা যখন আমাদের কৈশোর অতিক্রম করছি তখন যে এদেশে কনসার্ট হতো না, তা নয়। কনসার্ট হতো ঠিকই, তবে সেগুলো ছিল মূলত ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আর সেগুলোর পরিধিও ছিল খুব সীমিত। ক্যাম্পাসে নবীনবরণ বা ছাত্র সংসদের নির্বাচন মানেই ছিল ছোট বড় কোনো একটি ব্যান্ডের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে পদার্পণ। আর আমাদের কলেজের গ্যালারিতে, এসির অবর্তমানে ভ্যাপসা গরমে লেডিস হোস্টেল নিবাসী সহপাঠীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত গলদঘর্ম হয়ে টেবিলের ওপর হাত-পা ছুড়ে চলত নৃত্যকলা প্রদর্শন।

তবে সেই সুখও বেশি দিন আমাদের কপালে সয়নি। একানব্বইয়ের তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পুরো দেশটাকেই যখন তাদের দলীয় সম্পদে পরিণত করে ফেলেছিল, তখন তা থেকে বাদ যায়নি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজও। বেগম জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাসের মধ্যেই দেশের আর সব ক্যাম্পাসে মতোই হোস্টেল ছাড়া হতে হয়েছিল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের সব নেতাকর্মীকেও। ফলে, সে সময় ক্যাম্পাসে যখন কোনো ব্যান্ডের কচিৎ-কদাচিৎ পদার্পণ ঘটত, আমাদের জন্য সেসব ছিল নিষিদ্ধই।

জয় বাংলা কনসার্টে গেলে কৈশোরের ক্যাম্পাসে না দেখতে পাওয়া কনসার্টগুলো নিয়ে মনের গভীর গহিনে আজও যে লালিত গোপন বেদনাবোধ, তাতে কিছুটা হলেও প্রলেপ লাগানোর সুযোগ পাই। আশপাশে আজকের ব্যান্ডগুলোর পরিবেশনার তালে-তালে তরুণ-তরুণীদের যে বাঁধভাঙ্গা উল্লাস, তাতে সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দগুলো কিছুটা হলেও খুঁজে পাই। বয়সের আর অবস্থানগত কারণে হয়ত তাদের মতো আজ আর লাফাতে-ঝাঁপাতে পারি না, কিন্তু মনটা তো নাচতেই থাকে সেদিনের সেই ঘামে ভেজা শরীরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের গ্যালারিতে ফেলে আসা দিনগুলোর মতো। এবারে যখন দু’বছরের বিরতিতে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস বাঁধভাঙ্গা আর তাতে শামিল আমাদের সুকন্যা-সূর্যও, তখন আনন্দও তো বাঁধভাঙ্গা!

জয় বাংলা কনসার্টটি এত যে প্রিয়, চেম্বার শিকায় তুলে সিআরআই-এর আমন্ত্রণ পেলেই এই যে ফি’বছর সপরিবারে আর্মি স্টেডিয়ামে ছুটে যাওয়া তার আরেকটা কারণ, বর্তমানে প্রজন্মকে জয় বাংলার সঙ্গে পরিচিত করানোয় এই কনসার্টটির ভূমিকা অসাধারণ। ‘তীরহারা ঐ ঢেউয়ের সাগর...’ কিংবা লালনের সুরের তালে তালে যারা আর্মি স্টেডিয়ামে মাঠ কাঁপায়, তাদের তো কথা ছিল পাশ্চাত্যের হেভি মেটালে মুগ্ধ হওয়ার। এই এক কনসার্টের মাধ্যমেই তাদের অনেকেরই প্রথম পরিচয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর একাত্তরের সঙ্গে। আর সেই পরিচয়টাও এতটাই গভীর যে, হয়ত কোনো দিনও কোনো ক্যাম্পাসে একটি বারের জন্যও জয় বাংলা স্লোগানে উচ্চকিত হয়নি যে তরুণ, এমনকি তার কণ্ঠেও কি সাবলীল জয় বাংলা ধ্বনি। আজ যখন একদল কুলাঙ্গার ‘টেক ব্যাক’ বাংলাদেশের বুলি মুখে, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে দেশটাকে পাকিস্তানি প্রভুদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্তে বিভোর, তখন তাদের ‘গো ব্যাক’ বলায় আমাদের আজকে প্রজন্ম তৈরি করার ক্ষেত্রে জয় বাংলা কনসার্টের একটা বড় ভূমিকা থাকছে বলে আমাদের বিশ^াস। আর যতবারই এই কনসার্টে গিয়েছি, ততবারই এই বিশ^াস পোক্ত হয়েছে বৈ দুর্বল হয়নি।

জয় বাংলা কনসার্টটি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম, যা আজকের প্রজন্মকে আমাদের আশার বাতিঘর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সামনে থেকে দেখার-শোনার সুযোগটুকুও করে দেয়। যেমন তারা সুযোগ পায় এই কনসার্টে এসে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী প্রজন্মকেও সামনে থেকে দেখা-চেনার। মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে নেতার যে মেলবন্ধন, তা কখনই নেতাকে সামনে থেকে দেখার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না। আমাদের জামানায় নেত্রীর সঙ্গে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎটি হয়েছিল রাজপথে আওয়ামী লীগের জনসভায়। সময়ের বিবর্তনে আমরা এগিয়েছি অনেক। প্রসারিত হয়েছে আমাদের মিডিয়ার ব্যাপ্তি নানামুখী এবং বহুগুণে। তারপরও জনসভার আবেদন আর গুরুত্ব রাজনীতিতে এতটুকুও ম্লান হয়নি। আজও কর্মীর সঙ্গে নেত্রীর সাক্ষাতের জায়গাটা এই জনসভাই। কিন্তু এই যে জনসভাবিমুখ প্রজন্ম, যারা সুর মেলায় জয় বাংলা কনসার্টে ব্যান্ডের ভোকালদের সঙ্গে আর যাদের উচ্চকৃত লম্ফ-ঝম্ফে প্রকম্পিত হয় আর্মি স্টেডিয়ামের বিস্তৃত প্রান্তর, তারা তো তাদের নেত্রীকে চেনে এই কনসার্টে এসেই।

একটা কনসার্টের আবেদন যে কনসার্টের ব্যাপ্তি পেরিয়ে কতটা ব্যাপক হয়ে উঠতে পারে, তার একটা অনন্যসাধারণ উদাহরণ সিআরআই আয়োজিত জয় বাংলা কনসার্ট। কাজেই হ্যাপেনিং মার্চ নিয়ে লিখতে বসে সেই কনসার্টটা নিয়ে লেখার আবেগটা সংবরণ করা সম্ভব হলো না। পাশাপাশি লেখাটির আরও একটি উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নাড়িয়ে দিয়ে, জাগিয়ে দেওয়া এমন একটি অসাধারণ আয়োজনের জন্য সিআরআইকে ধন্যবাদটুকুও না দিলেও যে নয়।

লেখক : ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত