অমর অদম্য চিরজীবী

714

Published on অক্টোবর 19, 2022
  • Details Image

ড. সাজ্জাদ হোসেনঃ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ পুত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক গ্রন্থ কারগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভেতর গিয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে গিয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল, বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।’ রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।’ শেখ রাসেলের জন্ম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ছোট রাসেল সোনা বইয়ে লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা কাকা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজো ফুফু মার সঙ্গে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে।

আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজো ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল।’

শেখ রাসেল ছোট থেকেই ভীষণ দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন। দুরন্তপনার সঙ্গী হিসেবে তার ছিল একটি সাইকেল। যেটি নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে বের হতেন। প্রতিদিন ধানমন্ডির ৩১-৩২ পর্যন্ত চক্কর দিতেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়ার পরও এলাকার অন্য ছেলেদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তার আরেকটি শখ ছিল মাছ ধরা এবং পুনরায় মাছগুলো পুকুরে ছেড়ে দেয়া। মাত্র ৪ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলে শেখ রাসেলের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ঐতিহাসিক বাড়িতে বড় হওয়ার সুবাদে তার মধ্যে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারার এক অভাবনীয় ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। সেটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে স্কুলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য বন্ধু হয় তার।

পৃথিবীর বহু দেশে রাজনৈতিক হত্যাকা- হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো এমন পৈশাচিক ও ঘৃণ্য হত্যাকা-ের ঘটনা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। নানা কারণে রাজনৈতিক হত্যাকা- ঘটলেও একটি পরিবারের শিশুসহ সবাইকে হত্যার নজির বিরল। ১৫ আগস্টের সেই ভয়াল তারিখে শেখ রাসেল ছিল মাত্র ১১ বছরের শিশু। সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রাসেলকে নিয়ে আত্মরক্ষার্থে আড়ালে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মচারীসহ তাকে আটক করা হয়। শিশু রাসেল আতঙ্কিত হয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাব’।

পরবর্তী সময়ে মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন ‘আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন’। ‘মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় শিশু রাসেলকে। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে-খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকা দেখতে রাসেলকে বাধ্য করেছিল সিমার খুনির দল। ১৫ আগস্টের বর্বরতা শুধু ছোট্ট শিশু রাসেলকেই কেড়ে নেয়নি, বরং কেড়ে নেয় বাঙালির অমিত সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকেও।

আমাদের শিশু-কিশোররাই আগামীর নেতৃত্বে আসবে। তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কলা ও গণিতে (এসটিইএএম) পারদর্শী হতে হবে। শেখ রাসেলের নিষ্পাপ চেতনাকে শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। জীবন ও আদর্শ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণায় শিশুদের উৎসাহিত করবে। জাতির পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের শরীরের রক্ত কণিকায় প্রবহমান ছিল মানবিকতাবোধ। খুনিরা ছোট্ট রাসেলকে হত্যার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পৃথিবী থেকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু খুনিরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। শেখ রাসেলের চেতনাকেও নিঃশেষ করতে পারেনি। শেখ রাসেলের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর সকল শিশুর জীবনে।

লেখক: অধ্যাপক, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)

সৌজন্যেঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত