অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাতিঘর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

253

Published on জুন 23, 2022
  • Details Image

এম নজরুল ইসলামঃ 

দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৩ জুন। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ জনগণ, আর লীগ অর্থ দল বা গোষ্ঠী। সেই অর্থে আওয়ামী লীগের অর্থ জনগণের দল বা গোষ্ঠী। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির আত্মপ্রকাশ, দুই যুগেরও কম সময়ের ব্যবধানে, ১৯৭১ সালে সেই দলটির নেতৃত্বেই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে। শাসকদল মুসলিম লীগ ছিল সাম্প্রদায়িক। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশও অনেকটা সাম্প্রদায়িক চেহারা পায়। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনেও পড়ে সাম্প্রদায়িকতার ছায়া। যেমন ১৯৪৮ সালে গড়ে ওঠে মুসলিম ছাত্রলীগ। ১৯৪৯ সালে এ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরিবেশে পাকিস্তানে বিরোধী রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনও গড়ে উঠেছিল সাম্প্রদায়িক চেহারা নিয়ে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন তারুণ্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কৃত্রিম খোলসে মুখ ঢাকা রাখতে বেশিদিন রাজি থাকেনি। তাদের উদ্যোগে পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগের শাখা গঠিত হয়। ফলে গোটা পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগ একমাত্র বড় জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়।

শুরুতেই দলটির নাম আওয়ামী লীগ ছিল না। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্মকালে যে দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ, সেই দলটিই আজকের আওয়ামী লীগ। প্রথম কমিটিতে সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন সে সময়ের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সে সময়ের কথা উল্লেখ আছে। যখন ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলের গোড়াপত্তন হচ্ছে, তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘কর্মী সম্মেলনের জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। আমরা জেলে বসেই সে খবর পাই। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে অফিস হয়েছে।...আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মতো নেয়ার জন্য। আমি খবর দিয়েছিলাম, ‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নেই। এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ... এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। ... আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি আর করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে। ... সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেয়া হলো. ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক আর আমাকে করা হলো জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে ‘নিরাপত্তা বন্দী’। আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে।’

তরুণ শেখ মুজিব যে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কথা ভেবেছিলেন, তা কার্যকর হতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি। ১৯৪৯ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীকালে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নেতৃত্ব দলকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে রূপান্তর করেন। তখন এটি ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আসতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। আদর্শবাদী, উদারনৈতিক এ রাজনৈতিক দলটির অস্তিত্ব বিনাশের চেষ্টাও হয়েছে। দলের ভেতরের কোন্দলও অনেক সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু আলোর পথযাত্রী আওয়ামী লীগ সব বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে এগিয়ে গেছে। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলের সন্তোষে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ভাগ হয়ে যায়।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগে দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্তি দেখা যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে দেশের শত্রুরা সপরিবারে হত্যা করলে আওয়ামী লীগ আবার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের এক বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে প্রবাসে নির্বাসন জীবনযাপনকারী শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সেই বছর ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশের এক ক্রান্তিকালে দেশে ফেরেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পায়। খুব কম দেশেই একটি দল ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ক্ষমতায় ফিরতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ টানা তিনবার জনগণের ম্যান্ডেট পায় আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের রূপান্তরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক একটি উজ্জ্বল সময় পার করে এসেছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের প্রথম যুগটি হচ্ছে ভাসানী যুগ। এ যুগের প্রথম দিকে দলটি ছিল সাম্প্রদায়িক। নাম মুসলিম আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিব প্রথমে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদক হন। ভাসানী-মুজিব নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতার খোলস ত্যাগ করে, হয় অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ। কাগমারীতে আওয়ামী লীগের ভাসানী যুগের অবসান হয়। শুরু হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর যুগ। এ সময় আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ প্রগতিশীল নেতা ভাসানীর নবগঠিত দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু শেখ মুজিব দল ত্যাগ করেননি। আবার তিনি আওয়ামী লীগে ডানপন্থীদেরও মাথা তুলতে দেননি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শুরু হয় আওয়ামী লীগের মুজিব নেতৃত্বের যুগ। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ডানপন্থী নীতির ফলে আওয়ামী লীগ কিছুটা সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়েছিল। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত আওয়ামী লীগে দলে দলে তরুণ নেতা ও কর্মীরা আসেন। দল একটি মধ্য বামপন্থী দল হয়ে দাঁড়ায় এবং দলের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র যুক্ত হয়।

আওয়ামী লীগে মুজিব যুগই হচ্ছে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল যুগ। তিনি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রচার করেন। ঘোষণা করেন পূর্ব পাকিস্তান নয়, এ ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ। আমরা হাজার বছর ধরে বাঙালি। আমাদের পরিচয় হবে বাঙালি। বড় ঢেউ তোলে বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালির যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তার মিল দেখা যায় অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সভ্যতার সঙ্গে। বাংলাদেশে সেই ঐতিহ্য ধারণ করেন শেখ মুজিব এবং সেই জাতীয়তার বাহক হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ।
মুজিব যুগের আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আওয়ামী লীগে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তার শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সফল হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক বিরাট জয়যাত্রা শুরু হতো। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৭৫ সালে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।

বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। সেই অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই। দুটি কারণও তুলে ধরা যেতে পারে। একটি অর্থনৈতিক, অন্যটি রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ১০টি মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো তৈরি হলে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রফতানি আয় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অতীতে এমন উন্নয়ন সাফল্য কোনো সরকার দেখাতে পারেনি।

আর দুদিন পরই তো উদ্বোধন হতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু। এ সেতুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রথম কোনো সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন পাল্টে যাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কৃষিতে উন্নত। কৃষিপণ্য খুব সহজেই ঢাকায় চলে আসবে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ও বন্দরনগর চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পুরো দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে।

আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলা চলে, এ দলটির ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের গত ৭৩ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস যারা পাঠ করবেন, তাদের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ করা তেমন দরকার হবে না।

জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এ দলটির প্রতি এখনো জনগণের অবিচল আস্থা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দলটির অসাম্প্রদায়িক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাক। ৭৩ পূর্ণ করে ৭৪ বছরে পা দিলেও আওয়ামী লীগ তার তারুণ্য হারায়নি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, যুগান্তরের লক্ষ্য ও কর্মসূচি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্ব- এ তিনটি রক্ষাকবচের জোরেই আওয়ামী লীগ সংশোধিত হবে, নতুন প্রাণ পাবে। এটাই আওয়ামী লীগের ইতিহাস অপরাজেয়।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত