শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

479

Published on মে 15, 2022
  • Details Image

ড. আনোয়ার খসরু পারভেজঃ 

১৭ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ৪১তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। এদিন বিকেল সাড়ে চারটায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

জাতির পিতার দু’টি স্বপ্নের মধ্যে ছিল-বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং দেশকে ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত করে স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। প্রথম স্বপ্নটি বঙ্গবন্ধু বাস্তবায়িত করেছিলেন। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা তিনি এনে দিয়েছেন। অপর স্বপ্নটি যখন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখনই ১৯৭৫ সালরে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বুলেটের আঘাতে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এ সময় তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান। পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। জাতির পিতাকে হারানোর দুঃখের মধ্যে ’৮১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবাস জীবন কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

দেশের গণতন্ত্র আর প্রগতিশীলতার রাজনীতি ফেরাতে দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ছোটবোন শেখ রেহানার কাছে রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। তখনকার রাজনীতির মতোই প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। মুষলধারার বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে তারা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন নেত্রী কখন আসবেন এই প্রতীক্ষায়। অবশেষে ৪টায় কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে জনসমুদ্রের জোয়ারে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত রাস্তাগুলো রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে। তখন স্বাধীনতার অমর শ্লোগান “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় বাংলার আকাশ বাতাস। জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষিত হয়েছিল ‘পিতৃহত্যার বদলা নিতে/লক্ষ ভাই বেঁচে আছে, শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই।’ দেশের মাটিতে পা দিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতার সংবর্ধনায় আপ্লুত শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই’। “আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই।” তিনি বলেন, “আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।”

বর্তমানে শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে জাতির পিতার দ্বিতীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতায় উন্নয়নসূচকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অনেক দেশকে টপকে যাচ্ছে। আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিটির সূচকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আজ দৃশ্যমান। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যেমন বলেছেন, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে।’ অমর্ত্য সেনের পর্যবেক্ষণমূলক এ মন্তব্য বাংলাদেশ অর্জন করেই থেমে থাকেনি; সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের রফতানি, রিজার্ভ, রেমিটেন্স এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি। সামাজিক খাতে বাংলাদেশের গড় আয়ু ভারত-পাকিস্তান থেকে বেশি। মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, জন্মহার ভারত-পাকিস্তান থেকে কম। নারীর ক্ষমতায়নেও শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়; বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে। এর সবটাই অর্জিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্থিতিশীলতার কারণে।

যাদের হৃদয়ে পাকিস্তান তারা একসময় বলতো বাংলাদেশ ভারত হবে। তারাই তালেবানের অবস্থা দেখে বলে বাংলা হবে আফগান। আজ শ্রীলঙ্কার অবস্থা দেখে আর খুশিতে তাদের গায়ের পশম দাঁড়ায়, বলে বাংলা হবে শ্রীলঙ্কা। এদেশের অবস্থা শ্রীলংকার চেয়ে খারাপ সেদিনই হয়েছিল যে দিন জাতির জনক ও তার পরিবারকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। এ দেশের বারোটা সেদিনই বেজেছিল যেদিন জেলের ভিতর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। যেদিন স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতায় আনা হয়েছিল, সেদিনই বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। বিএনপি-জামায়াত দেশকে শ্রীলংকা বানিয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হয়ে দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশকে টেনে তুলে এনে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করছেন। শ্রীলংকা বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে পারে না আর বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মত বিশাল প্রকল্প বিদেশী ঋণ ছাড়াই, নিজের টাকায় করে ফেলেছে। বি এন পি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন রিজার্ভ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের কম, আজ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। শ্রীলঙ্কার জাতীয় ঋণ জিডিপির ১২০%, বাংলাদেশের ১৮%। করোনার মধ্যে বিশ্বে সবার রিজার্ভ যখন নিম্নগামী তখন বাংলাদেশের রিজার্ভ প্রায় দ্বিগুণ হল। এখন গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি হার বেড়েছে। কিছু মানুষ পদ্মা সেতু ও স্যাটেলাইটের বিরোধিতা করবেই। তারা দেশকে তালেবানের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন ও শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া বানাতে চায়। শ্রীলংকার মতো অবস্থা ঠেকানোর জন্য এদেশের প্রবাসী, এ দেশের কৃষক, আওয়ামী লীগ সরকার ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাই যথেষ্ট।

আমাদের বাংলাদেশ বাংলাদেশই থাকবে, শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতি এখানে হবে না। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার তাদের যোগফলের কয়েক গুণ বেশি। আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ের করোনাভাইরাস প্রতিরোধের কথাই যদি বলি, করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা বিশ্বের বহু দেশের চেয়ে ভাল ছিল। সাফল্যের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ মানুষকে আনা হয়েছে টিকাদানের আওতায়, যা অনেক বড় ও উন্নত দেশও করতে পারেনি। এ কার্যক্রমে বিশ্বের ১২১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে। করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রমে বাংলাদেশকে ‘কোভিড-১৯ টিকার সাফল্যের গল্প’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিলবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। একই সঙ্গে এ কার্যক্রমে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে দেখা যায় এপ্রিল পর্যন্ত ৬৭ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ টিকাদানের আওতায় আনতে পেরেছে দেশটি, যা সত্যিই প্রশংসনীয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতায় মহামারীর দুঃসময় কাটিয়ে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি আবার ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করতে যাচ্ছে বলে ধারণা দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি খাত। তাতে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। নতুন রেকর্ড হচ্ছে, জুলাই-এপ্রিল —এই ১০ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য। দেশীয় মুদ্রায় যা ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার সমান।

আর এভাবেই বাংলাদেশ আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এখন অধরা নয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তা দৃশ্যমান। আপনি দীর্ঘজীবী হোন হে মহান নেত্রী। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এই হোক সবার কামনা। আমরা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আনন্দ ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

লেখকঃ গবেষক ও অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত