বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে গ্রামগুলো পরিপূর্ণ হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে

505

Published on ডিসেম্বর 20, 2021
  • Details Image

সজল চৌধুরীঃ 

বঙ্গবন্ধু তার মৃত্যুর কিছুকাল আগে বাংলাদেশের গ্রাম উন্নয়নের ভাবনা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বপ্নের পরিকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার স্বরূপ উপস্থাপন করে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরের দ্বার প্রান্তে এসেও আমরা আজও অধীর অপেক্ষায় আছি সেই স্বপ্ন পূরণের বাস্তবতায় তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ জীবনমুখী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের যে চিত্র দেখতে পেরেছিলেন যেখানে বিস্তৃত ছিল তার অর্জিত অভিজ্ঞতা গুলো। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন কৃষক বাঁচলে গ্রাম বাঁচবে আর গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ টিকে থাকবে হাজার বছর ধরে।

এখানে উল্লেখ্য যে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ৩০ দশকে এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি দ্বারা সূচিত সংগ্রামের ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষভাবে ধারণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন শুধুমাত্র গ্রামের মানুষকে সর্বাত্মক মঙ্গলার্থে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন শুধুমাত্র বর্তমান সময়ের জন্য নয় আগামীর দেশ পুনর্গঠন এর। আর এসব স্বপ্নের সাথে ছিল গণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিরসন-উন্নয়ন। পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়লাভের পর গ্রাম উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। গ্রাম উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর যৌথ চাষের বিষয়টিকে সামনে এনেছিলেন শুধুমাত্র তখনকার কথা বিবেচনা না করে ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন এর কথা চিন্তা করে। বর্তমানে যার সত্যতা আমরা জটিল ভাবে উপলব্ধি করছি।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক ভিত যদি শক্ত না হয় তাহলে আপাময় দেশের ভিত কখনো শক্ত হবে না। তাই তিনি গ্রাম উন্নয়ন এর উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী স্বাধীনতার এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রত্যেকটি গ্রামকে উন্নয়নের ধারপ্রান্তে পৌঁছাতে চেয়েছেন। যেখানে প্রত্যেকটি গ্রামে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকবে। যেখানে গ্রামের যে কেউ তার আশপাশে মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে সকল ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে সার্বিক উন্নয়নের রুপরেখা খুঁজে পাবে। যা বর্তমানে জাতির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে ডিজিটালাইজেশনে। যেখানে পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও এই ডিজিটাল সংমিশ্রণের অনেক ঘাটতি আছে। সেখানে বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের যে কোন মানুষ খুব সহজেই আজ ডিজিটাল টেকনোলজির ভুবনে প্রবেশ করতে পেরেছে। যা দেশের জন্য অত্যন্ত গর্ব করার মত একটি বিষয়। যদি এই গ্রাম গুলোকে আরো একটু পরিকল্পিতভাবে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা যায় তাহলে খুব অচিরেই তার সুফল গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছাবে এবং বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নের চিন্তাধারা প্রসারিত হবে বহুমুখী ভাবে। এমতাবস্থায় এই ডিজিটাল বাংলাদেশে এ যদি প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে ‘গ্রাম্য ডিজিটাল উন্নয়ন কেন্দ্র’তৈরি করা হলে গ্রামবাসীর জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশে সহায়ক হবে। এই ডিজিটাল জ্ঞান কেন্দ্রগুলো থেকে গ্রামবাসী তার জীবন ধারণের প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবে। সেটি শিক্ষা থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত। এমনকি একটি গ্রামের মানুষ তার আশপাশের অন্যান্য গ্রামের সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে একটি নেটওয়ার্কিং তৈরি করতে পারবে। যা তাদের অর্থনৈতিক আরো সুদৃঢ় করবে। তবে এক্ষেত্রে বর্তমান বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যেভাবে এগিয়ে চলছে সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের গ্রামগুলো খুব অচিরেই এই ধরনের পদক্ষেপের সুষ্ঠু প্রয়োগ দেখতে পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি কিছু কিছু গ্রাম ইতিমধ্যে এসব পদক্ষেপ এর আওতাভুক্ত। গ্রামের সবক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। বিশেষ করে প্রথমদিকে কৃষিখাতে এবং স্কুল গুলোতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাদের মাধ্যমে প্রযুক্তির জ্ঞান সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। তাছাড়া বর্তমান মহামারী ডিজিটাল বাংলাদেশের সমৃদ্ধ এবং প্রয়োজনীয়তা সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাম পর্যায়ে পর্যাপ্ত ডিজিটাল ট্রেনিং এর ব্যাবস্থা থাকতে হবে গ্রামবাসীদের মধ্যে।

এই গ্রাম্য ডিজিটাল উন্নয়ন কেন্দ্র কিভাবে কাজ করবে এবার আসা যাক এইসব বিষয়ে একটু প্রাথমিক ধারণায়।

আমাদের দেশের গ্রামগুলো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। আমরা যদি একটু ভালোভাবে খেয়াল করি এই সত্যটি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারব। গ্রামগুলোর ঐতিহ্য ইতিহাস রুপরেখা একে অপরের থেকে ভিন্নতর। প্রত্যেকটি গ্রামে রয়েছে তাদের নিজস্ব কিছু অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি এবং উপাদান। যেগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে একদিকে যেমন গ্রামভিত্তিক ইকোট্যুরিজম তৈরি হবে অন্যদিকে তেমনি সেই গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। যেমন ধরা যাক কোন গ্রাম যদি ইতিহাসের দিক থেকে অনেক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে থাকে তাহলে সেই গ্রামকে উপস্থাপনের জন্য গ্রাম ভিত্তিক একটি এক্সিবিশন সেন্টার তৈরি হতে পারে। সেই এক্সিবিশন সেন্টার গঠনশৈলীর দিক থেকে স্থানান্তরযোগ্য এমনও হতে পারে। যেখানে সেই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের পরিস্ফুটন হবে। সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে সেখানে ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনা করা যেতে পারে। দেখানো যেতে পারে কিভাবে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব! কিভাবে সেখানকার মানুষেরা একসাথে কাজ করে সামগ্রিক উন্নয়ন করতে পারে! প্রদর্শনী হতে পারে অনেক উন্নয়ন ভিত্তিক পরিকল্পনার। যার সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিজ। আর এসবের ফলে একদিকে যেমন গ্রামের মানুষদের মধ্যে তাদের নিজ গ্রাম সম্পর্কে ধারণা পাল্টাবে- নিজ গ্রামকে ভালোবাসতে শিখবে আরো গভীরভাবে। ঠিক তেমনি সেই কেন্দ্রটি প্রসারিত করবে গ্রাম্য ঐতিহ্য, ইকোট্যুরিজম এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। 

এমনকি গ্রাম্য ডিজিটাল উন্নয়ন কেন্দ্র গুলো তৈরি হতে পারে সেই গ্রামে উৎপাদিত সহজলভ্য উপকরণ এর মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে যদি সেখানকার সহজলভ্য উপাদানের মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলো তৈরি হয় তাহলে সেই উপকরণগুলো জনসম্মুখে উন্মুখ করলে এর বাজারজাতকরণের বিষয়টিও উন্মোচিত হবে। মোটকথা একেকটি গ্রামকে যদি আমরা সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারি তাহলে বাংলাদেশের গ্রামগুলো সামগ্রিক দেশের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির মূল উৎস থেকে পরিপূর্ণতা লাভ করে বহির্বিশ্বে দেশকে নতুন ভাবে উপস্থাপনা করতে পারে।

তবে একথা সত্য যে শুরুতেই হয়তোবা সবগুলো গ্রামকে একসাথে প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কিন্তু একটি গ্রামকে যদি মডেল হিসেবে দাঁড় করানো যায় এবং সেটি যদি সত্যই কার্যকর হয় তাহলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গ্রামগুলো এর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। সবশেষে বলতে চাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের একক হিসেবে গ্রামগুলোকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন। তাছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আবর্তিত হয় আমাদের গ্রাম গুলো ঘিরেই। এই বিষয় সর্ম্পকে তিনি সচেতন ছিলেন। একটি গ্রামকে কিভাবে তার ঐতিহ্য ইতিহাস অপরিবর্তিত রেখে সেখানকার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা যায় এই বিষয় সর্ম্পকে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। তাই বর্তমান বাংলাদেশের গ্রাম উন্নয়ন এর ভাবনায় যদি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা হয় তাহলে হয়তোবা বাংলাদেশের গ্রামগুলো শুধুমাত্র এই দেশের জন্যই রোল মডেল হবে না, ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরীর মাধ্যমে এই গ্রাম গুলোর বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে পড়বে দেশ থেকে দেশান্তরে। সবশেষে এই বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রাম পরিপূর্ণ হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে এই আশায় সামনের দিনগুলো এগিয়ে যেতে হবে।

লেখকঃ শিক্ষক ও স্থপতি (বর্তমানে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ স্থাপত্য-পরিবেশ বিষয়ক পিএইচডি গবেষক)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত