বহুমাত্রিক প্রতিভার মূর্ত প্রতীক

130

Published on আগস্ট 6, 2021
  • Details Image

তাপস হালদারঃ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল। জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৪৯ সালে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রথম সন্তান, শেখ কামালের বড় আপা। তুরস্কের জাতির পিতা মহামতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নামানুসারে পিতা বঙ্গবন্ধু প্রথম পুত্রের নাম রাখেন শেখ কামাল।

শৈশবে পিতা বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য খুব কম পেয়েছেন শেখ কামাল। কারণ তখন পিতা মুজিব দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে প্রায় সময়ই জেলে থেকেছেন।

শেখ কামাল ছিলেন বহুমাত্রিক সৃজনশীল প্রতিভার মূর্ত প্রতীক। বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম বিদ্যাপীঠ ‘ছায়ানট’-এর সেতার বাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে নিয়মিত অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত ‘কবর’ নাটক কলকাতার মঞ্চেও মঞ্চায়িত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে তিনি বারবার অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। দিনের সকালটা শুরু হতো সংগীতে, ফুটবল ও ক্রিকেট নিয়ে দিনে ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যায় থাকতেন নাটকের মঞ্চে। স্পন্দন নামে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ব্যান্ডদল তিনিই গঠন করেছিলেন। এ গানের দলের মাধ্যমে পল্লীগীতি ও আধুনিক গানের মধ্যে সমন্বয় করে দেশের সংগীতজগতে ঘটাতে চেয়েছিলেন বিপ্লব।

ঢাকার শাহীন স্কুল ও পরে ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে প্রতিটি খেলায় অংশগ্রহণ করলেও ক্রিকেটের প্রতি টানটা একটু বেশি ছিল। নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর প্রচণ্ড গতির ফাস্ট বোলার হওয়ার কারণে খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর ছিল আলাদা কদর; কিন্তু প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি আর বঙ্গবন্ধুর সন্তান হওয়ার কারণে প্রথম বিভাগ পর্যন্ত খেলতে পেরেছেন, কখনো জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি। শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ প্রতিটি খেলায় ছিল প্রচণ্ড উত্সাহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র শেখ কামাল বাস্কেটবল টিমের হলের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি যত দিন হলের ছাত্র ছিলেন, তত দিন আন্তঃহল বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় সলিমুল্লাহ হল শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ‘ইকবাল স্পোর্টিং’ ফুটবল দল ও ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’ ক্রিকেট আর হকি দল কিনে এগুলোর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র। তিনিই ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠন, আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা।

ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি খেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন শেখ কামাল। বিশ্বাস করতেন একদিন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। নিজের মধ্যে আক্ষেপ ছিল, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি। সেই তাগিদ থেকেই বাংলাদেশকে বিশ্ব মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য বিদেশি ফুটবল কোচ বিল হার্টকে এনে রীতিমতো ক্রীড়াপ্রেমীদের বিস্মিত করেছিলেন শেখ কামাল। তখন ক্লাব পর্যায়ে তো দূরের কথা, এই উপমহাদেশের কোনো জাতীয় দলের বিদেশি কোচ ছিল না। ক্রিকেট ও হকি খেলায়ও তিনি নতুন দিনের সূচনা করেছিলেন।

খেলাধুলাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে জীবনসঙ্গিনী হিসেবেও বেছে নিয়েছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তুখোড় ক্রীড়াবিদকে। তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী ‘ব্লু’ খেতাবপ্রাপ্ত সুলতানা আহমেদ খুকি। ১৯৭৩ সালে খুকি ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় লংজাম্প ইভেন্টে পেয়েছিলেন রৌপ্যপদক। এটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক পদক।

শেখ কামাল যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে হয়তো বহু আগেই ক্রিকেটে সুপার পাওয়ার হতো বাংলাদেশ। ফুটবলের এই জীর্ণদশা হতো না। অন্ততপক্ষে ফুটবল ও হকিতে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করত বাংলাদেশ।

শেখ কামাল ছাত্রলীগের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ও দক্ষ সংগঠক হিসেবে ছয় দফা ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই সময় প্রতিটি আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করে মিছিলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উপস্থিত হতেন। বঙ্গবন্ধুর সন্তান হিসেবে তাঁর উপস্থিতি নেতাকর্মীদের জন্য ছিল তুমুল উত্সাহব্যঞ্জক। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো নেতা হতে চাননি। কর্মী হিসেবে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬১ জন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারের মধ্যে একজন ছিলেন শেখ কামাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনাবাহনী থেকে পদত্যাগ করে লেখাপড়া সমাপ্ত করতে আবার ফিরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শেখ কামাল ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী হতে পারেন, সেই সম্ভাবনা থেকেই ষড়যন্ত্রকারীরা ক্রমাগত তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা করে। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ক্ষমতালোভী জাসদের একটি অংশও টার্গেট করে শেখ কামালের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। হিমালয়সম বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করার সাহস না পেয়ে পরিবারের সদস্য শেখ কামালকেই ষড়যন্ত্রকারীরা টার্গেট করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় শেখ কামালের বিরুদ্ধে সবই ছিল মিথ্যা অপপ্রচার ও গভীর ষড়যন্ত্র।

শেখ কামাল বুঝতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইলে সংস্কৃতির ভিত মজবুত করতে হবে। সে জন্য তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে নিয়েছেন। উনসত্তরে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করলে শেখ কামাল তখন সংগীতশিল্পীদের সংগঠিত করে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। তখন প্রতিবাদের অহিংস ভাষা হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসংগীত।

তাঁর মতো ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক, মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রনেতা এ ভূখণ্ডে খুব কম পাওয়া যাবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, শেখ কামালের আদর্শকে এখনো আমরা দেশের যুবসমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারিনি। একজন তরুণের জীবন কতখানি কর্মময় হতে পারে, নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনে তা করে দেখিয়েছেন শেখ কামাল। ক্রীড়া, সংগীত, রাজনীতি, সংগঠন, মুক্তিযুদ্ধ, সেনাবাহিনী ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি সংক্ষিপ্ত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

আজ শুভ জন্মদিনে শহীদ শেখ কামালকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা

সৌজন্যেঃ দৈনিক কালের কন্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত