ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার

228

Published on জুলাই 29, 2021
  • Details Image

ড. সাজ্জাদ হোসেনঃ 

জয়। এই শব্দটি বাঙালী জাতির জন্য শুধু একটি শব্দ নয়, বরং জাতির অস্তিত্বের একটি অংশ বললেও ভুল হবে না। জয় শব্দটি কেন বাঙালী জাতির জন্য এত বিশেষ, তা বাংলাদেশের উদ্ভবের ইতিহাস ঘাটলেই খুঁজে পাওয়া যায় উত্তর। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’-এই ¯েøাগানে ১৯৭১ সালে মুক্তির পথে জেগে ওঠে মুক্তিকামী সমগ্র বাঙালী। স্বাধীনতা সংগ্রামে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও অগণিত নির্যাতিত মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ের পরেই এসেছে আমাদের জয়। এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তাঁর নেতৃত্বেই অদম্য বাঙালী ছিনিয়ে আনে বিজয় ও স্বাধীনতা। জয় হয় বাঙালীর, জয় হয় মানবতার। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। তার পরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু তাঁর কন্যাকে বলেছিলেন, যদি পুত্রসন্তান হয় তাহলে যেন তার নাম জয় রাখা হয়। জয়ের জন্ম হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েক মাস আগে। তার জন্ম যেন বাঙালী জাতির জন্য স্বাধীনতার আগমনী বার্তা হিসেবে এসেছিল। জয়ের জন্ম ছিল বাংলাদেশে নতুন যুগের সূচনার প্রতীক। জন্মলগ্ন থেকেই এদেশের মানুষের সঙ্গেই জয় বেড়ে উঠেছেন। হয়ে উঠেছেন আজকের শিক্ষিত, সুবিবেচক এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। ঠিক তেমনি বাংলাদেশও ধীরে ধীরে প্রগতির পথে অগ্রসর হচ্ছে। আর একারণেই জয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু এই রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল এদেশকে ঘিরে, যা তিনি তার জীবদ্দশায় পূরণ করে যেতে পারেননি। আর তাই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন তাঁর সুযোগ্যকন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর সব স্বপ্নই পূরণ করতে চলেছেন তাঁরই কন্যা। আর তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। জয় বিভিন্নভাবে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়তই। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করার রূপকার সজীব ওয়াজেদ জয়।

জয়ের জন্ম হয় ২৭ জুলাই ১৯৭১ সালে। তখন পুরো দেশ হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তির সশস্ত্র সংগ্রামে লীপ্ত । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও কারাগারে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এসে দেখেন তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে । তাঁর দৌহিত্রের নাম রাখা হয়েছে জয়। জয় নামটার মাহাত্ম্য তখনই বোঝা যায় যখন বাঙালীর চিরন্তন ¯েøাগান ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিত হয়। জয়ের জন্মের মাধ্যমেই একটি নতুন প্রজন্মের শুরু হয়, যে প্রজন্ম শুধু সামনের দিকে সফলভাবে এগিয়ে চলতে জানে। যার প্রমাণ আমরা সজীব ওয়াজেদ জয়কে দেখলেই পেয়ে যাই। জয় দুজন অসামান্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের সন্তান। তার পিতা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন একজন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, যার খ্যাতি রয়েছে বিশ্বময়। এমন অসামান্য দুজন মানুষের সন্তান অবশ্যই সবার থেকে বিশেষ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশ স্বাধীন হবার খুশি আর জয়ের জন্মের মাধ্যমে বেশ ভাল কাটছিল বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধপরবর্তী দিনগুলো। তবে অচিরেই একটি ঝড়ে ওলোটপালট হয়ে যায় সবকিছু। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জয়, তার মা, বাবা এবং খালা শেখ রেহানা পরম করুণাময়ের রহমতে প্রাণে বেঁচে যান। কারণ সে সময়ে তারা জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। এত শোকাবহ ঘটনা ঘটার পরও জয়, তার খালা এবং মা-বাবাকে দেশে ফিরতে দেয়া হয়নি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত । দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়েই জয়ের লেখাপড়া চলতে থাকে। তিনি ভারতের সেন্ট জোসেফ কলেজ এবং তামিলনাড়ুর কদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে লেখাপড়া করেন। এরপর তিনি ব্যাঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তার বিষয় ছিল কম্পিউটার সায়েন্স, পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত। আরও বিদ্যা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। সবশেষে তিনি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গবর্নমেন্ট থেকে জনপ্রশাসনে লাভ করেন মাস্টার্স ডিগ্রী।

জয়ের নিজের শিক্ষা, বাবা-মায়ের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা বংশানুক্রমে তার মাঝে থাকায় এসবই আজকের জয়কে তৈরি করতে সাহায্য করেছে। তিনি নেতৃত্বের ভ‚মিকায় অবতরণ করেন যখন জঙ্গীবাদ এবং যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের কারণে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থার সূচনা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা সত্তে¡ও ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছিলেন এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তার ওপর নির্মম গ্রেনেড হামলা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রাণে রক্ষা পেলেও বহু নেতাকর্মী এই ঘটনায় হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২০০৭ এবং ২০০৮ এ আরও একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়; যখন দেশ অনির্বাচিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে চলে যায়, যার পক্ষে সামরিক বাহিনীর সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। সে সময় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চক্রান্ত করা হয়। তাকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয় এবং কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ সময়েই তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন। তিনি ইউরোপ এবং আমেরিকায় আন্দোলনের প্রচার চালান। তার আন্দোলন শুধু তার মায়ের মুক্তির জন্য ছিল না, বরং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। তার আন্দোলন ফলপ্রসূ হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সমর্থনে গঠিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের পতন ঘটে। জয় আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি রংপুর বিভাগীয় আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ইচ্ছা পোষণ করলেই বড় কোন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি নেননি। সজীব ওয়াজেদ জয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।

সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের তরুণ প্রজন্মকেও বিভিন্নভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এবং তাদের নিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি তরুণদের বুঝিয়েছেন যে, দেশের সার্বিক কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যেই রাজনীতির প্রয়োজন অপরিহার্য। তবে কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে রাজনীতির ব্যবহার করা অনুচিত। জয় সবসময়ই তরুণ প্রজন্মকে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হওয়া সত্তে¡ও দেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ব্যবস্থা করেছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতামত প্রদানের সুযোগ দিয়েছেন। এই লক্ষ্যে জয় ‘Let’s Talk’ নামক একটি অনুষ্ঠান প্রবর্তন করেন, যাতে এদেশের তরুণ প্রজন্ম দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও দর্শন তুলে ধরার সুযোগ পায়। তিনি সেন্টার ফর রিসার্চ এ্যান্ড ইনফর্মেশন (ঈজও) এবং ‘Young Bangla’ নামে দেশের সবচেয়ে বড় ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন, যার মাধ্যমে যুব সমাজকে দেশের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং তরুণদের প্রতিভা অনুযায়ী তাদের বিকাশের ক্ষেত্রও তৈরি হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র জয় তার চিন্তাভাবনাগুলো লিখিত আকারে আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধ বিভিন্ন জার্নালেও প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত বøগেও তার বিভিন্ন আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার, দ্য ডিপ্লোম্যাট, দ্য ওয়াশিংটন টাইম্সসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার বেশিরভাগেই জয়ের রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং টুইটারেও তার মনোভাব প্রকাশ করে থাকেন। সজীব ওয়াজেদ জয় তথ্যপ্রযুক্তিতে অসামান্য ভ‚মিকার জন্য ২০১৬ সালে ওঈঞ ভড়ৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অধিৎফ পুরস্কারে ভ‚ষিত হয়েছেন। এ ছাড়াও ২০০৭ সালে ডড়ৎষফ ঊপড়হড়সরপ ঋড়ৎঁস কর্তৃক ণড়ঁহম এষড়নধষ খবধফবৎ হিসেবে নির্বাচিত হন।

এখন করোনাকালে দেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) বাড়তি সুফল পাচ্ছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচীর আওতায় গত ১১ বছরে গড়ে ওঠা তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোই এ কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজে লাগছে। জরুরী সেবাসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে। প্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে ফাইভ-জি চালুর প্রস্তুতিসহ ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো জয় শুধু একজন স্বপ্নদ্রষ্টাই নন, তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেও জানেন। তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে দলের একজন সদস্য হিসেবেই এসেছেন, কারণ তিনি শিখতে চেয়েছেন শূন্য থেকে। তার রয়েছে সৃষ্টিশীল নতুন নতুন ধ্যানধারণা, যা সফল উদ্যোক্তাদের মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি দেশের তরুণ প্রজন্মকে সবসময়ই নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে গতানুগতিক ক্যারিয়ার বাছাই না করে সৃষ্টিশীল কিছু করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি দেশের যুব সমাজকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অনুকরণ নয়, উদ্ভাবনী সক্ষমতা অর্জনের কথা বলেন। আমরা বিশ্বাস করি, তার নেতৃতেই ভবিষ্যত প্রজন্ম দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)
সৌজন্যেঃ দৈনিক জনকণ্ঠ 

 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত