কর্মবীর ওয়াজেদ মিয়ার কর্মময় জীবনী

2124

Published on মে 9, 2021
  • Details Image

হামজা রহমান অন্তরঃ

আজ ৯ মে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জামাতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী মরহুম ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালের এই দিনে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। মরহুম আব্দুল কাদের মিয়া ও মরহুমা ময়জান নেছার সন্তান ওয়াজেদ মিয়া এলাকা ছাড়াও সারাদেশে ‘সুধা মিয়া’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চক করিম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯৫৬ সালে রংপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন রাজশাহী সরকারী কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান এবং ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। তিনি ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে ‘ডিপ্লোমা অব ইম্পেরিয়াল কলেজ কোর্স’ সম্পন্ন শেষে ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম শ্রেণীর এই বিজ্ঞানী তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগ দিয়ে চাকরী জীবন শুরু করেন। পরে আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে ইতালির খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাঁকে ‘এ্যাসোসিয়েটশীপ’ প্রদান করে।

১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরে ‘ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরি’তে পোষ্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন। ড. ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে শুরু করে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লীর ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন ।

বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। ১৯৬১ সালের প্রথম দিকে ছাত্রলীগে যোগ দেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাত হয়। ওই বছরই আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন ড. ওয়াজেদ মিয়া। আজন্ম সৎ, সম্পূর্ণ নির্লোভ, নিভৃতচারী ও নিখাদ দেশ্রপ্রমিক এই পরমাণু বিজ্ঞানী ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের সময় ড. ওয়াজেদ মিয়া জার্মানিতে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থাকায় তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। এই বিজ্ঞানীর দু’সন্তান। বড় ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় পেশায় সফটওয়্যার বিজ্ঞানী এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক উপদেষ্টা। ছোট মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম নিয়ে দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে কাজ করছেন। 

এক নজরে এই কর্মবীরের জীবনীঃ-

১৯৪২- ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া ১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা আব্দুল কাদের মিয়া এবং মাতা ময়েজুন্নেসা। তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ।
১৯৫২- তিনি রংপুর জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন।
১৯৫৬- তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকেই ডিসটিনকশন সহ প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন।
১৯৫৮- রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।
১৯৬১- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬১-’৬২ শিক্ষা বছরের জন্য ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
১৯৬২- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেন।
১৯৬৩- ১ এপ্রিল তিনি তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনের চাকরিতে যোগদান করেন।
১৯৬৭- লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে পদস্থ হোন। নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৬৯- ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে এসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এই সুবাদে তিনি ১৯৬৯-’৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ৬ মাস ধরে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৬৯- এবছর নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৭১- এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং এর আগে ও পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস শেখ পরিবারের সঙ্গে ওয়াজেদকেও অবরুদ্ধ ঢাকায় বন্দি জীবনযাপন করতে হয়েছিল।

১৯৭২ ও ১৯৭৩- তিনি পরপর দুবার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭৫- ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের ‘আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি পরপর তিনবার ওই বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলাদেশ পদার্থ বিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে দুবছর মেয়াদের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে দুবছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ – তিনি পরপর তিনবার বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১-১৯৯২- তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৯৪- বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ঢাকার বিক্রমপুর জগদীশ চন্দ্র বসু সোসাইটি তাকে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক প্রদান করেন।
১৯৯৯- ড. ওয়াজেদ মিয়া আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর নেন।

২০০৯- ৯ মে বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে দীর্ঘদিন কিডনির সমস্যাসহ হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ৬৭ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া স্নাতক পর্যায়ের বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইংরেজীতে লেখা গ্রন্থদ্বয়ের নাম Fundamentals of Thermodynamics এবং Fundamentals of Electromagnetics। তারঁ অন্যতম গ্রন্থ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ৪৬৪ পৃষ্ঠার সুপরিসর এই গ্রন্থে বাংলাদেশের বহল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তাঁর আরেকটি গ্রন্থের নাম বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র যা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি

প্রেস লিমিটেড কর্তৃক ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ড. ওয়াজেদ মিয়াকে কখনই ক্ষমতার কাছাকাছি দেখা যায়নি। এই কর্মবীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

লেখকঃ কলামিস্ট ও ছাত্রনেতা

সৌজন্যেঃ ইবার্তা২৪

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত