দুঃসাহসী শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল

5954

Published on জানুয়ারি 11, 2021
  • Details Image

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার, এনডিসি (অব.):

ডেটলাইন ২৭ জুন ১৯৭৫। স্বর্গীয় মাধুরীতে ভরা ইংল্যান্ডে এখন গ্রীষ্মকাল। প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের বন্যা বইছে। কিন্তু এর চেয়েও আনন্দের বন্যা আজ ব্রিটেনের রয়াল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টের ক্যাডেটদের মনে-প্রাণে। ছয় মাস কঠোর প্রশিক্ষণের পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রার্থিত সভরিন (পার্সিং আউট) প্যারেড। আজ প্যারেড রিভিউ করছেন রাজকুমারী এলিস। বিদেশি ক্যাডেটদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কমিশন লাভ করতে যাচ্ছেন তিনজন গর্বিত তরুণ। তাঁদের দুজন হলেন অফিসার ক্যাডেট আলাউদ্দিন মো. আবদুল ওয়াদুদ ও মাসুদুল হাসান। তৃতীয় তরুণের নাম শেখ জামাল। তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুুুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র। ১ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে স্যান্ডহার্স্টের রেগুলার ক্যারিয়ার কোর্স শুরু হবে। শেখ জামাল এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও অংশ নিচ্ছেন না। কারণ তাঁর দুই প্রিয় বন্ধু বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন। আর রয়েছে মায়ের জন্য গভীর টান। মাত্র দেড় মাস পর এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনকে তছনছ করে দেবে।

প্যারেডের শেষ পর্যায়ে অর্কেস্ট্রায় স্কটিশ বিদায় সংগীত ‘ওল্ড লং সিনস’-এর (পুরনো সেই দিনের কথা) সুর বেজে উঠেছে। ক্যাডেটরা সারিবদ্ধভাবে প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে মার্চ করে ওল্ড কলেজের সিঁড়ি অতিক্রম করলেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের তিন তরুণের ক্যাডেট থেকে কাঙ্ক্ষিত আর্মি অফিসারে রূপান্তর ঘটল। জামালের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। আনমনে ভাবলেন, ‘আব্বা যদি আজ প্যারেডে থাকতেন!’ ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের কমিশনপ্রাপ্ত তিন তরুণের ছবি ছাপা হলো। ছবিটি বিশ্বকে এক প্রতীকী বার্তা দিয়েছিল। লাখো প্রাণের বিনিময়ে সদ্যঃপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে চায়।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য কিশোর শেখ জামাল ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট ধানমণ্ডির তারকাঁটার বেড়া দেওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে ভারতে যান। ধানমণ্ডি থেকে পালিয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছানো ছিল রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ পথচলা। আগরতলা থেকে কলকাতা হয়ে শেখ জামাল পৌঁছলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের কালশীতে। মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) ৮০ জন নির্বাচিত তরুণের সঙ্গে শেখ জামাল ২১ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর শেখ জামাল ৯ নম্বর সেক্টরে যোগদান করেন। ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শেখ জামালের কক্ষে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে (সাতক্ষীরার) কালীগঞ্জ রণাঙ্গনে তোলা রাইফেল কাঁধে শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ছবি। ৯ নম্বর সেক্টরের ডেয়ার ডেভিল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগের স্মৃতিতে এখনো সমুজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো: ইছামতী নদী, হিংগলগঞ্জ ক্যাম্প, পারুলিয়া ব্রিজ, রণাঙ্গনে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, ক্যাম্পে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরের উদ্দীপনামূলক ভাষণ...। দেশ স্বাধীন হলে যুদ্ধের পোশাকেই যুদ্ধের ফ্রন্ট থেকে শেখ জামাল ঢাকায় ফেরেন ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

২৯ জানুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো। শেখ জামালের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রবল আগ্রহ দেখে মার্শাল টিটো তাঁকে যুগোস্লাভ মিলিটারি একাডেমিতে সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। ১৯৭৪ সালের বসন্তে ঢাকা কলেজের ছাত্র জামাল যুগোস্লাভিয়ার মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু একেবারে ভিন্ন পরিবেশ, প্রতিকূল আবহাওয়া আর ভাষার অসুবিধার কারণে সেখানকার প্রশিক্ষণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো শেখ জামালের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে মার্শাল টিটো শেখ জামালকে ব্রিটেনের স্যান্ডহার্স্টে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরামর্শ দেন।

স্যান্ডহার্স্ট একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের পোস্টিং হলো ঢাকা সেনানিবাসস্থ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ব্যাটালিয়নের চার্লি কম্পানির কম্পানি কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বীরপ্রতীক। ক্যাপ্টেন নজরুলের অধীনে শেখ জামালের রেজিমেন্ট জীবনের হাতেখড়ি হলো ‘কম্পানি অফিসার’ হিসেবে। ইউনিটে যোগদানের দিন সেনাবাহিনীর খাকি ইউনিফর্ম পরে বাড়িতে ফেরেন শেখ জামাল। মুগ্ধ চোখে স্মার্ট এক আর্মি অফিসারকে দেখেন পিতা শেখ মুজিব ও মা বেগম ফজিলাতুন নেছা।

দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলে জামালের চাকরিকাল ছিল প্রায় দেড় মাস। কিন্তু এই স্বল্প সময়ে অফিসার ও সৈনিকদের মাঝে তিনি অসাধারণ পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতার ছাপ রেখেছিলেন। কয়েক সপ্তাহেই জামাল অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে তাঁদেরই একজন হয়ে যান। সকালে পিটির সময় সৈনিকদের আগে থেকে দৌড়ে সবাইকে অবাক করে দেন শেখ জামাল। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে, রণকৌশলের ক্লাসে, অবস্টাকল ক্রসিংয়ে অংশ নিয়ে সৈনিকদের মুগ্ধ করেন। ব্যাটালিয়ন বক্সিং টিমের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেন। বিকেলে খেলার মাঠে ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে বাস্কেট বল খেলেন।

একদিন আদেশ হলো—গাড়িতে নয়, অন্য তরুণ অফিসারদের মতো মোটরসাইকেলে ক্যান্টনমেন্টে যাবেন শেখ জামাল। লক্ষ্মী ছেলের মতো মায়ের কড়া আদেশটি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট রাতে ব্যাটালিয়ন ডিউটি অফিসার হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে আসেন তিনি। একজন সুবেদার বলেন, ‘স্যার, অনেক রাত হয়েছে; আজ রাতে ইউনিটেই থেকে যান।’ কিন্তু রাতে আর সেনানিবাসে থাকা হয় না শেখ জামালের। তিনি ফিরে আসেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। বাংলাদেশের কলঙ্ক ‘ঘাতকদল’ ততক্ষণে প্রস্তুতি নিচ্ছে শতাব্দীর এক নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের জন্য। সমগ্র আরবের সুরভিত সুগন্ধি দিয়ে ধুলেও মুছবে না বীভৎস সেই কলঙ্কের দাগ...।

শেখ জামালের জীবন ছিল খুব সংক্ষিপ্ত, ২৮ এপ্রিল ১৯৫৪ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। শেখ জামাল এখন ঘুমিয়ে আছেন বনানী কবরস্থানে। আজকের এই দিনে একজন অকালপ্রয়াত কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা, বন্ধু অন্তপ্রাণ ও সাহসী তরুণের কথা স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধা ভরে।

লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, স্যালুট টু ইউ স্যার।

লেখক : বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার সাবেক ডেপুটি কমান্ড্যান্ট

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত