মহামারীর ধাক্কা সামলে গতিময় সব 'মেগা প্রকল্প'

5004

Published on ডিসেম্বর 28, 2020
  • Details Image

নজিরবিহীন এক মহামারী বিদায়ী বছরে থমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে, উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটতে থাকা বাংলাদেশকেও এ সঙ্কট নাড়িয়ে দিয়েছে; তবে বাংলাদেশ পথ হারায়নি।

মহামারীর কারণে লকডাউন আর বিদেশি শ্রমিক-প্রকৌশলীদের অনেকে দেশে ফিরে যাওয়ায় এ বছর সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পের কাজ এগোতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত দ্রুততায়।

তবে বছরের শেষ দিকে এসে গতি পেয়েছে অধিকাংশ প্রকল্প। স্বপ্নের পদ্মাসেতু এই ডিসেম্বরেই পেয়েছে পূর্ণ অবয়ব।

মার্চে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ পরিস্থিতে চলে যায় পুরো দেশ। এ অবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজগুলোও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়।

লকডাউন উঠে যাওয়ার পর অক্টোবর থেকে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রকল্পগুলোতে আবার পুরোদমে কাজ শুরু হয়।

পদ্মাসেতু

চলতি বছরের শুরুতে প্রকল্পটিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন। মহামারীর শুরুতে চীনাসহ বিদেশি শ্রমিকরা চলে যাওয়ার পরও মার্চের শুরুতে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক ছিলেন। তাদের নিয়েই সীমিত পরিসরে কাজ চলছিল। বছরের শেষে এসে পুরোদমে কাজ শুরু হয় প্রকল্পটির কাজ।

দক্ষিণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল পদ্মার পাড়ে, তা পূর্ণ অবয়ব পায় গত ১০ ডিসেম্বর।

সেতুর ৪১তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর পুরো মূল কাঠামো দৃশ্যমান হয় সেদিন; তৈরি হয় রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের পথ।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ১০ মাস থেকে একবছরের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে। এর মধ্যে সেতুতে ঢালাইয়ের কাজ, সড়কের জন্য প্রস্তুত করা, রেলের জন্য প্রস্তুত করার কাজ শেষ করা হবে।

সব ঠিক থাকলে ২০২২ সালের প্রথমভাগেই এ সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে বলে সরকার আশা করছে।

প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিসেম্বর নাগাদ মূল সেতুর প্রায় ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বছর কাজ শেষ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

“তবে মহামারীতে কাজের যে গতি কমেছে, তা এখনো পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য সময় বেশি লাগছে।”

মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদী শাসনের কাজ করছে চীনের ‘সিনো হাইড্রো করপোরেশন’।

১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকায় ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু প্রকল্প শুরু হতেই সময় লেগে যায় ২০১৪ সাল। চারবার প্রকল্প সংশোধন করে এখন ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ৪১তম স্প্যান স্থাপনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ জনপদের মানুষের স্বপ্নের পদ্মাসেতু ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

বৃহস্পতিবার ৪১তম স্প্যান স্থাপনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ জনপদের মানুষের স্বপ্নের পদ্মাসেতু ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ বসানো হচ্ছে।

প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, মহামারীর প্রভাব প্রকল্পের কাজেও পড়েছে, আগের গতি এখনো ফেরেনি।

“ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের ৩১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। মাওয়া-ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল লিংকের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষে হয়েছে। আগামী বছর জুনের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করা যাবে বলে আশা করছি।”

২০১৬ সালে প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা, মেয়াদ ধরা ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর। কিন্তু ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের ব্যয় আরও চার হাজার ২৬৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩১ শতাংশের বেশি ভৌতকাজ এ পর্যন্ত শেষ হয়েছে।

মহামারীর কারণে অন্য অনেক প্রকল্প সাময়িক গতি হারালেও এ প্রকল্প সেভাবে বাধাগ্রস্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. শওকত আকবর।

এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজের ২৬ শতাংশের মত শেষ হয়েছিল মার্চে মহামারীর শুরুর আগে।

শওকত আকবর বলেন, “মহামারীর তেমন প্রভাব এ প্রকল্পে পড়েনি। আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের প্রথম রিঅ্যাক্টর, প্রেসার ভেসেল ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে।

“মালামাল পৌঁছে যাওয়ায় মার্চ মাসের তুলায় চার গুণ গতিতে কাজ চলছে এখন। যেভাবে কাজ এগোচ্ছে, তাতে নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।”

রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালের অক্টোবরে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এই প্রকল্পের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে ছিল।
প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, নভেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পে ৪৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।

বর্তমান সরকারের এ প্রকল্প গৃহীত হয় ২০১১ সালে। কিন্তু প্রথমে অর্থের সংস্থান ও পরে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পটি শুরু করতেই অনেক দেরি হয়ে যায়।

১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের জন্য শেষ পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়।
২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অংশ আগেই শেষ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। প্রকল্পটি স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে উদ্বোধন করার আগ্রহ প্রধানমন্ত্রীর।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, মহামারীর কারণে চীন থেকে বিশেষজ্ঞদের আসা বিলম্বিত হয়েছেভ ফলে কাজ এগোতে পারেনি।

“তবে ২০২২ সালের মধ্যে কাজ শেষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে এবং কাজ এখন সেভাবেইে এগিয়ে চলছে।”

দেরির কারণে এ প্রকল্পের খরচ বাড়ার তেমন সম্ভবনা নেই বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

মেট্রোরেল

মহামারীর মধ্যেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে দিনরাত কাজ চালিয়ে মেয়াদের তিন বছর আগে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের প্রথম মেট্রোরেল চালু করার নতুন লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে এখন।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেন, “মেট্রোরেলের কাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ করতে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশেষ করে রাতের বেলায় কাজ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। দিনের বেলায়ও যথারীতি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকছে।”

এমআরটি-৬ নামের এ প্রকল্পের উত্তরা থেকে আগারগাঁও ১১ দশমিক ২৯ কিলোমিটার অংশ পর্যন্ত ২০২১ সাল এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল।

গত নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক গড় অগ্রগতি ৫৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আগের বছরের নভেম্বরে সার্বিক অগ্রগতি ছিল ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর এ বছরের জানুয়ারিতে ৪০ দশমিক ৩৬ শতাংশ কাজ এগিয়েছিল।
মহামারীর কারণে প্রকল্পের খরচ বাড়ছে কিনা জানতে চাইলে এমএএন সিদ্দিক বলেন, খরচ বৃদ্ধির ‘তেমন সম্ভবনা’ নেই।

মেট্রোরেল-৬ বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ২২ হাজার কোটি টাকা, যার ৭৫ শতাংশ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান সরকারের সহযোগী সংস্থা জাইকা।

বঙ্গবন্ধু টানেল

‘ওয়ান সিটি-টু টাউন’ মডেলে চট্টগ্রাম শহরের সাথে আনোয়ারাকে যুক্ত করতে কর্ণফুলী নদীর তলদশে তৈরি হচ্ছে সাড়ে তিন কিলোমিটারের সুড়ঙ্গপথ।

চীনা অর্থায়নে চলমান বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে কাজ করছে চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)।

মহামারীর শুরুতে গত মার্চ পর্যন্ত এ প্রকল্পের মোট ৫১ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি ৬১ শতাংশ।

এরই মধ্যে নদীর তলদেশ দিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি টিউবের মধ্যে একটি খনন ও রিং স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর শুরু হয়েছে দ্বিতীয় টিউবের খনন কাজ।

নদীর তলদেশের নিচে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল, দুই মুখে সড়ক আর ওভারপাস বা সেতুসড়ক নির্মিত হচ্ছে।

২০১৫ সালে অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পে সময়মতো অর্থ ছাড় না করায় কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষের দিকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ হবে বলে তারা আশা করছেন।

বঙ্গবন্ধু টানেলের ব্যয় ধরা হয়েছে মোট নয় হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভবনা নেই বলে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন।

সৌজন্যেঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত