জনগণের সুখ-দুঃখের নিরন্তর সারথি ছিলেন শেখ মুজিব

132

Published on অক্টোবর 28, 2020
  • Details Image

ড. আতিউর রহমানঃ

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পঞ্চম খ-ে সংকলিত হয়েছে ১৯৫৮-৫৯ সালের শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কার্যক্রম। ১৯৫৮ সালটি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের জন্য অত্যন্ত বিষাদময়। এ বছরের শেষদিকে প্রসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করেন। সামরিক শক্তির বলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। আর শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ১৫ মাসের জন্য কারাবন্দি হন। তাকে জেলে একজন রাজনীতিবিদের মর্যাদাও দেওয়া হয়নি। এ সময় তার পরিবারের ওপরও নেমে আসে আর্থিক বিপর্যয়। মন্ত্রী ও টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রাপ্ত সরকারি ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৪ সন্তান নিয়ে তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা বড়ই বিপদে পড়েন। সামরিক শাসনের পদধ্বনি শেখ মুজিবুর রহমান আগে থেকেই টের পাচ্ছিলেন। ইস্কান্দার মির্জার শাসনব্যবস্থাকেও তিনি একনায়কতান্ত্রিক শাসন বলেই উল্লেখ করেন। বছরের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান ব্যস্ত ছিলেন আন্তঃজেলা আওয়ামী লীগ দল গঠনে। এ সময় তিনি জেলায় জেলায় ভ্রমণ করে মুসলিম লীগের তীব্র সমালোচনা করেন এবং জনগণকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এ সময়টায় তিনি পুরো প্রদেশ চষে বেড়িয়েছেন। জনতার দুঃখ-দুর্দশা স্বচোখে দেখেছেন এবং তা উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করেছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পঞ্চম খ-ের প্রথম প্রতিবেদনটি ১৯৫৮ সালের ১১ জানুয়ারি নথিভুক্ত। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কুমিল্লা ঈদগাহ ময়দানে জনসভা করেন। কুমিল্লা তখন ছিল ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত। আসন্ন ত্রিপুরা সদর উত্তর-পূর্ব নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জন্য ভোট চাইতে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনটিতে জানা গেছে, এ সময় দুজনই জনগণের প্রতি আহ্বান জানান- তারা যেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিনি এ দলটিকে জনগণের ভরসার ঠিকানায় পরিণত করতে সক্ষম হন।

২০ জানুয়ারির প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা গেছেন চিকিৎসার জন্য। তিনি অবশ্য কলকাতা গিয়েছিলেন আগের বছর ২৩ ডিসেম্বর, ফিরে এসেছিলেন ২৬ ডিসেম্বর। কোনো জরুরি খবর ছাড়া কেবল শেখ মুজিবুর রহমানের গতিবিধি স্মরণে রাখার জন্যই গোয়েন্দা বিভাগ ওই তারিখটি নথিভুক্ত করে ২০ জানুয়ারি।

২৫ জানুয়ারির প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ জানুয়ারি কক্সবাজার স্টেডিয়ামে জনসভা করেছেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার জেলার আন্তঃজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের শ্রম ও শিল্পমন্ত্রী মনসুর আলী, চট্টগ্রাম জেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রেসিডেন্ট এমএ আজিজ। ওই সভায় বক্তারা মুসলিম লীগ ও নিজাম-ই-ইসলামীর তীব্র সমালোচনা করেন। এ সময় তারা আসন্ন সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে জনগণকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

১৫ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান ৭ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরে জনসভা করেছেন। ওই সভাতেও তিনি আগের কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এসব পুনরাবৃত্তি পাঠকের জন্য ক্লান্তিকর হতে পারে। কিন্তু ঝড়ের আগে একটা গুমট অবস্থা বোঝার জন্য এসব প্রতিবেদন জানা দরকার বলে মনে করি। এর পর আরও কয়েকটি প্রতিবেদনে ওই একই পুনরাবৃত্তি। শেখ মুজিবুর রহমান জেলায় জেলায় গিয়ে মুসলিম লীগের সমালোচনা করছেন এবং জনগণকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আহ্বান করছেন। কখনো কখনো তার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

১৫ জুনের প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনা সফর করেছেন। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ। শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে এবার শুধু মুসলিম লীগ নয়, প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জারও তীব্র সমালোচনা করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সব দুঃখ-দুর্দশার জন্যই পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার দায়ী। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা হচ্ছেন মীরজাফরের বংশধর’ (গোয়েন্দা প্রতিবেদন, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা ১০)।

ময়মনসিংহের ডিআইবি সুপারিনটেন্ডেন্ট পুরো সফরটির একটি সংক্ষিপ্তসার পাঠান আইবি অফিসার এ. আহমেদের কাছে। সংরক্ষিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, ১৩ জুন দুপুর ১২টায় আপট্রেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান ও আবুল মনসুর আহমেদ ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে এসে পৌঁছান। গফরগাঁও থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনের লোকজন ভিড় করেছিল তাদের স্বাগত জানানোর জন্য। গফরগাঁও রেলস্টেশনে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল। গফরগাঁও রেলস্টেশনে সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে সোহরাওয়ার্দীর প্রশংসা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তিনি পূর্ববাংলার মানুষকে অনাহারে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। খাদ্য আমদানির জন্য তিনি ৮০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দীও বক্তব্যে সব সময় তার পাশে থাকার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানান। এই বলে নিশ্চয়তা দেন, তিনিও সব সময় জনগণের পাশে থাকবেন। তাদের জন্যই তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন (পৃষ্ঠা ১১)।

৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদনটিতে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের সফরসূচির বিবরণ। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটি সংরক্ষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ- ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান অদ্য (মঙ্গলবার) পিআইএ বিমানযোগে করাচি যাত্রা করিবেন। তিনি আগামীকল্য করাচিতে অবস্থান ও পরদিবস ফিল্যান্স কমিটির বৈঠকে যোগদান করিবেন। অতঃপর তিনি ১ জুলাই ঢাকা ত্যাগ করিয়া পরবর্তী দিবসে সিন্দিয়াঘাট উপস্থিত হইবেন ও তথায় বামুনডাঙ্গার এক জনসভায় বক্তৃতা করিবেন।’

‘জনাব মুজিবুর রহমান ১৪ জুলাই গোপালগঞ্জ, ১৬ জুলাই টুঙ্গিপাড়া জিনডাঙ্গা ঈদগাহ ময়দানে জনসভায় বক্তৃতা করিবেন।’

‘তিনি আগামী ১৭ জুলাই খুলনা ও যশোর হইয়া ঢাকা প্রত্যাবর্তন করিবেন। অতঃপর তিনি আগামী ১ জুলাই সাধারণ নির্বাচন সম্পর্কে তারিখ নির্ধারণের জন্য আহূত সর্বদলীয় সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশে আগামী ১৮ জুলাই করাচি যাত্রা করিবেন। তিনি তিন দিবস করাচি অবস্থান করিয়া আগামী ২২ জুলাই ঢাকা প্রত্যাবর্তন করিবেন’ (পৃষ্ঠা ১২)।

১৯৫৮ সালের ১৯ জুলাই নথিভুক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতা গোপালগঞ্জের বামুনডাঙ্গায় জনসভা করেছেন। ১৩ জুলাই মাদারীপুর এইচই স্কুলে কাউন্সিল মিটিং বসে। আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ব্যাপক প্রশংসা করে বলেন, তিনি এ সময়ের সবচেয়ে মহৎ নেতা। সভায় মাদারীপুর আন্তঃজেলা আওয়ামী লীগ কমিটি পুনর্গঠিত হয়। ২৪ জুলাই ঢাকার আরামবাগে জনসভা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এদিন তিনি মুসলিম লীগের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “মুসলিম লীগ যদি শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে, তা হলে তারা খুবই ভুল করবে। তাদের প্রকৃতির প্রতিশোধের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাদের জানা উচিত, ‘প্রতিটা ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে” (পৃষ্ঠা ১৬)।

করাচি থেকে ফিরে আসার পর শেখ মুজিবুর রহমান দৈনিক মর্নিং নিউজে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি সংরক্ষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ। ১৯৫৮ সালের ২৫ জুলাই নথিভুক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান তার সাক্ষাৎকারে বলেন- পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সাংবিধানিক সরকার চায়, কোনো একনায়কতন্ত্র নয়।

১৬ আগস্ট খুলনা জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের ওপর বক্তব্য রাখেন। মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যা করার, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্যই করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের দিকে তাদের কোনো নজরই নেই। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তারা পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের ওপর গুলি করেছে- এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না’ (পৃষ্ঠা ৩০)।

সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় পূর্ববাংলার দক্ষিণাঞ্চল। এ সময় সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। বন্যার্তদের জন্য যথপোযুক্ত ত্রাণ চেয়ে সোহরাওয়ার্দী, মনসুর আলী ও শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য রাখেন। সোহরাওয়ার্দী তার বক্তব্যে জানান, তিনি এখানে ভোট চাইতে আসেননি। বন্যার্তদের অবস্থা দেখতে এসেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে ছাত্রদের শান্ত থাকতে অনুরোধ করে বলেছেন, দরকারি সব সাহায্যের জন্য তারা সরকারের সঙ্গে আপ্রাণ দেনদরবার করবেন। তিনি অবশ্য এটিও স্মরণ করিয়ে দেন, দুই প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার আগ পর্যন্ত পূর্ববাংলার অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। সোহরাওয়ার্দীকে দ্রুত করাচি গিয়ে বন্যার্তদের মানবেতর পরিস্থিতির কথা জানানোর অনুরোধ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবেই প্রতিক্ষণ পূর্ববাংলার মানুষের সুখ-দুঃখের সারথি হয়েছেন তিনি। আর এ কারণেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষ মনে করত। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো তো তা-ই বলে।

লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

সূত্রঃ আমাদের সময়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত