জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ

570

Published on অক্টোবর 27, 2020
  • Details Image

প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুরঃ

মানব সভ্যতার অস্তিত্ব নির্ভর করে জ্বালানি শক্তির ওপর। দেশের জন্য বর্তমানে জ্বালানি একটি অপরিহার্য সম্পদ। শুধু আমাদের দেশেই নয় জ্বালানি ব্যতীত পৃথিবীর গতিশীলতা স্তব্ধ হয়ে যাবে। সভ্যতার ক্রমবিকাশমান ধারার প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্বালানির প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সকল কর্মকা- জ্বালানি নির্ভর। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।

১৬ মার্চ ২০১৮ জাতিসংঘের উন্নয়ননীতি সংক্রান্ত কমিটি (ঈউচ) কর্তৃক বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সকল মানদণ্ড পূরণের স্বীকৃতি লাভ করে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। এই অবস্থায় দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়নে সবার আগে প্রয়োজন সরকারী ও বেসরকারী খাতে ব্যাপকহারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে সবার আগে প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশের বর্তমানে জ্বালানি সঙ্কট বিদ্যমান থাকলেও সরকার সফলতার সঙ্গে এ সঙ্কট মোকাবেলা করে জ্বালানি নিরাপত্তা বিধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আজকে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তায় যতদূর এগিয়ে এসেছে, তার সূচনা হয়েছে স্বাধীন বাংলার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মাণে তিনি জ্বালানি শক্তির ওপর গুরুত্ব দেন। ১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতি আদেশ নং-২৭ এর মাধ্যমে দেশের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ খনিজ তেল ও গ্যাস কর্পোরেশন গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে এর নামকরণ করা হয় পেট্রোবাংলা। তিনি জ্বালানি খাতকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে পেট্রোলিয়াম আইন ও পেট্রোলিয়াম পলিসি প্রণয়ন করেন। উক্ত আইন ও পলিসির আওতায় তিনি দেশীয় কোন মূলধন বা বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের লক্ষ্যে ‘উৎপাদন বণ্টন চুক্তি’ পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রবর্তন করেন। বর্তমানে এই মডেলটি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় হলেও ঐ সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশই এই মডেলটির গুরুত্ব অনুধান করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি আদেশ নং-৫৯ এর মাধ্যমে দেশের সর্বত্র বিদ্যুত সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিদ্যুৎখাত পুনঃগঠন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ESSO Eastern Inc. কে অধিগ্রহণ করে দেশে জ্বালানি তেল মজুদ সরবরাহ ও বিতরণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত এই সকল স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানসমূহই আজও এদেশের তেল সেক্টরের নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করছে।

১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এই দিনে তিনি জাতীয় স্বার্থে দেশের বৃহৎ পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র (তিতাস, বাখরাবাদ, রশীদপুর, কৈলাশটিলা ও হবিগঞ্জ। বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী বহুজাতিক তেল কোম্পানি- ‘শেল ইন্টারন্যাশনাল কাছ থেকে নামমাত্র মূল্য কিনে নিয়েছিলেন। জাতির পিতার এই পদক্ষেপ ছিল বাঙালীর মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসেবে জাতীয় স্বার্থে নীতিগত সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। ৫টি বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু তার দৃঢ় মনোবল, মেধা, সাহস ও সুকৌশলের মাধ্যমে মাত্র ১৭.৮৬ কোটি টাকায় বাংলাদেশের কাছে বিক্রয় করতে বাধ্য করেছিলেন। যার বাজার মূল্য বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকা। এটি কেবল আর্থিক মূল্য। এর অর্থনৈতিক মূল্য তার চেয়ে বহুগুণ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সংবিধানের ১৪০ (১) (খ) অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগর ও বাংলাদেশের মহিসোপানে অবস্থিত সকল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা গ্রামীণ উন্নয়ন এবং নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করার জন্য গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের বিষয়টিকে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেন (অনুচ্ছেদ-১৬)। বঙ্গবন্ধুর এই বৈপ্লবিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তৎকালীন তৃতীয় বিশ্বে এটি একটি অনুসরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

জাতির পিতা ১৯৭২ সালে সংবিধানের ১৪৩ (১) (খ) অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগর ও বাংলাদেশের মহিসোপানে অবস্থিত সকল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের সমুদ্র ও সমুদ্রসীমা রক্ষার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে The Territorial waters and Maritime Zone Act’ প্রণয়ন করেন। পরবর্তীকালের সরকারগুলো এই বিষয়ে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সমুদ্র ও সমুদ্রসীমা রক্ষায় জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালে জাতিসংঘের ১৯৮২ সালের সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুসমর্থন (Ratiffiation) করেন। এই সমুদ্র আইন অনুসমর্থনের ফলেই বঙ্গোপসাগরে আমাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ ও সাহসী নেতৃত্ব এবং সফল এনার্জি ডিপ্লোম্যাসির কারণে আমরা মিয়ানমার ও ভারতের দাবির বিরুদ্ধে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি।

পঁচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী শক্তি ক্ষমতাসীন হওয়ার কারণে বিদ্যুত জ্বালানি নিরাপত্তা অবহেলার শিকার হয়। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ (মধ্যম আয়ের দেশ) ও রূপকল্প ২০৪১ (উন্নত দেশের মর্যাদা) অর্জনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, গোটা উন্নয়নশীল বিশ্বের একমাত্র সরকার প্রধান, যিনি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০০৮ সালে ডিসেম্বরে মাথাপিছু বিদ্যুত উৎপাদন ছিল ২২৮ কিলোওয়াট, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৪৭০ কিলোওয়াট (দ্বিগুণের বেশি)। একই সময়ে বিদ্যুত সুবিধার আওতাভুক্ত ছিল ৪৭ শতাংশ, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৯৮ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর খুব কম দেশই এত সফলভাবে সমুদ্রের ওপর তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার এই সমুদ্র জয়ের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার নর্থ সি’ (North Sea of South Asia) খ্যাত বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস সম্পদ আহরণের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম কার্যকরী ও সুদক্ষভাবে পরিচালনা করছে। বর্তমানে এটি সমুদ্র ব্লকে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিসমূহ একক ও যৌথভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। দেশে তেল-গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ১৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট (২০০৮ সালে) হতে ২৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীতকরণসহ মোট গ্যাস সরবরাহ ৩২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এলএনজিসহ) উন্নীত করেছে। এ সময়ে সরকার ৪টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র (শ্রীকাইল, সুন্দরপুর, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ) আবিষ্কার করেছে। তেলগ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২০১১ সালে ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন করে, যার আওতায় দেশের গ্যাস সেক্টরে বর্তমানে ২১টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়া গ্যাস সেক্টরকে সার্বিক সহায়তার জন্য ২০১৫ সালে সরকার ‘এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ড’ নামে আরেকটি তহবিল গঠন করে।

বাংলাদেশ যাতে কয়লাভিত্তিক বৃহত্তর বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপন করতে না পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। এ সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকার জাতীয় স্বার্থে বৃহৎ কয়লাভিত্তিক প্রকল্পসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। জ্বালানিভিত্তিক এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার মহেশখালী ও মাতারবাড়ীতে একটি এবং পায়রাতে একটি এনার্জি হাব গড়ে তুলছে। বিদ্যুত ও জ্বালানি সেক্টরে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়েছে। পৃথিবীর কম দেশই এত অল্প সময়ে এ রকম সাফল্য দেখাতে পেরেছে।

এছাড়াও ভারতের ঝাড়খ- ও ত্রিপুরা থেকে যথাক্রমে ১৪৯৬ ও ৩৪০ মে:ও: বিদ্যুতসহ মোট ১৮৩৬ মে:ও: বিদ্যুত আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ক্রসবর্ডার ইন্টারকানেকশন স্থাপিত হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই ইন্টারকানেকশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, ভুটার ও নেপাল থেকে জল বিদ্যুত উৎপাদন ও আনার কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের এই উদ্যোগে ভারত, নেপাল ও ভূটান অংশীদার বা পার্টনার হিসেবে থাকছে। আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে জ্বালানিভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ‘সার্ক ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফর এনার্জি কো-অপারেশন (ইলেকট্রিসিটি)-তে যুক্ত হয় এবং বিমসটেক এর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে গ্রিড ইন্টারকানেকশন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর করে। জননেত্রী শেখ হাসিনার এই উদ্যোগের ফলে ২০৪১ সাল নাগাদ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিদ্যুত বাণিজ্য ও রিজিওনাল গ্রিড থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুত পাবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিপি) জ্বালানি তেল আমদানি, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ, মজুদ ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ প্রায় ১৩.২৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০০৯-২০১৮ সময়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি তরল জ্বালানি সুষ্ঠু নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও জ্বালানি তেল সরবরাহ কোন সঙ্কট বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি। দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে প্রাপ্ত গ্যাস কনডেনসেট সমৃদ্ধ হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রে শুরু থেকেই ফ্রাকসনেশন প্লান্টে কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন জাতীয় পেট্রোলিয়াম পদার্থ উৎপাদন করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে ২০১৭-১৮ (মার্চ পর্যন্ত) অর্থ বছরে ৬৬,১৮০ ব্যারেল পেট্রোল, ২,৬২,৭৭৩ ব্যারেল ডিজেল ৫৭,৫৬২ ব্যারেল কেরোসিন এবং ৪,১৩৭ ব্যারেল এলপিজি উৎপাদন করা হয়েছে।

জ্বালানি তেল আমদানি উৎস বহুমুখী করার লক্ষ্যে বর্তমানে ৫০ শতাংশ তেল জিটুজি ভিত্তিতে ১১টি দেশ থেকে এবং ৫০ শতাংশ তেল টেন্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করা হচ্ছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির একটি নতুন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপ লাইনের মাধ্যমে দ্রুত সহজ, নিরাপদ ও ব্যয় সাশ্রয়ীভাবে শোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাসের জন্য সরকার কুতুবদিয়ার নিকট (Single point moorning with double pipeline (SPM) স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়াও উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য পিতলগঞ্জ হতে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো পর্যন্ত জেট ফুয়েল পাইপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।

১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর দেশের প্রথম পানি বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার শুরু হয়। জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৮% অর্জনের জন্য সরকার ২০২০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালা ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কার্যক্রম পরিচালন, পরিকল্পনা প্রণয়ন বাস্তবায়ন, সম্প্রসারণ এবং এ সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারকির জন্য সরকার Sustainable and Renewable Energy Development Authority (SREDA) গঠন করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যে পাবনার রূপপুরে নির্মিতব্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি খাত চলমান। এ বিদ্যুত প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৩ সালে ১,২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে আরও ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

মানুষের জীবন ধারণের জন্য খাদ্য, পানি, বায়ু, আবাসন যেমন অপরিহার্য তেমনি বিদ্যুত-জ্বালানিও অপরিহার্য। যে কোন দেশের অর্থনীতি সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বিনিয়োগ পরিস্থিতি নির্ভর করে। জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে কোন দেশে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হয় না। ফলে অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় জনগণ বেকার হয়ে পড়ে। তাই বর্তমান সরকার রূপকল্প ২০২১ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করছে।

লেখক : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)

সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত