চেয়েছিল সার পেয়েছিল বুলেট, কিন্তু এখন!

938

Published on এপ্রিল 9, 2023
  • Details Image

ড. প্রণব কুমার পান্ডে:

কৃষকের মুখের এই হাসি মাত্র ১৫-২০ বছর আগে কি কল্পনা করা যেত? খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে চলছিল দেশ। আমরা কিন্তু ভুলে যেতে বসেছি সেদিনের কথা। মাঠ চৌচির হয়ে যেতো, বিদ্যুতের অভাবে সেচ দেয়া সম্ভব হতো না। ফসলের মাঠ বিবর্ণ হয়ে যেত সারের অভাবে। আখেরে উৎপাদন হ্রাস। চারদিকে হাহাকার।

সেই সময় বাজারে সারের ঘাটতি ছিল প্রচণ্ড। সরকারের সীমিত উৎপাদন ক্ষমতা এবং সার সরবরাহ চেইনের অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হত সরকার। ফলে বাজারে সারের ঘাটতি দেখা দিলে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও কালোবাজারি হত। ন্যায্যমূল্য দিয়েও কৃষক সার সংগ্রহ করতে পারতো না।

সার সংকটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল কৃষকের জন্য ঋণের অপ্রতুলতা। বাজারে সারের উচ্চমূল্যের কারণে ছোট ছোট কৃষকের জন্য সার কেনা কঠিন হয়ে পড়তো এবং ঋণ সুবিধার অভাব সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলত। উপরন্তু সারের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবও সেই সময়ের সার সংকটে ভূমিকা রেখেছে। অনেক কৃষকই সঠিক পরিমাণ এবং সারের ধরন জানতেন না। ফলে অতিরিক্ত ব্যবহার বা কম ব্যবহার হত এবং জমিতে ফলন কমে যেত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কৃষকদের সারের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়েছিল ১৯৯৫ সালে বিএনপির শাসনামলে।

সেই সময়ের কৃষক হত্যা বাংলাদেশের একটি দুঃখজনক ঘটনা। সারের ঘাটতি কৃষকদের ফসল ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছিল তার সারের ঘাটতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছিল। সরকার তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সার সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করতে পারেনি। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের বিক্ষোভ তীব্রতর হলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ডাকা হয়। পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশ ভিড়ের ওপর গুলি চালায়। এতে বেশ কয়েকজন কৃষক নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হয়। ঘটনাটি বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দেয়।

ঘটনার পর হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন রিপোর্টে উঠে আসে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বিষয়টি যা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রয়োগ করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য পরবর্তীকালে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সেই সময়ের ঘটনাটি কৃষকদের চাহিদা পূরণ এবং সারের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণে তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সাথে সেই বিষয়টি সরকারকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান জানানো এবং বিক্ষোভ মোকাবিলা করার সময় আনুপাতিক শক্তি ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

সেই সময় বিভিন্ন জেলায় কৃষক হত্যা শুধু কৃষকদের মধ্যেই ক্ষোভের জন্ম দেয়নি বরং সার সংকটের মানবিক মূল্যের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই বিষয়টি সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও ভালো করার এবং কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। বিএনপি আমলের সেই দুঃখজনক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবনে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং জনগণের চাহিদা মেটানোর গুরুত্বের একটি বেদনাদায়ক অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে।

সেই সময়ের সার সংকট বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিণতি বয়ে আনে। সারের ঘাটতির ফলে ফসলের উৎপাদন কমতে থাকে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। সেই সময়ে কৃষি উৎপাদন হ্রাস দেশের জিডিপিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে, যার ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। তা ছাড়া সেই সময়ের সংকট লাখ লাখ কৃষকের জীবিকাকে প্রভাবিত করেছিল, যারা কৃষিকাজ ত্যাগ করতে বা সারের প্রয়োজন নেই এমন ফসল উৎপাদনে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল। সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি সেই সময়। ফলে সারের উচ্চমূল্য এবং সার সরবরাহের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং বিশৃঙ্খলা কৃষি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশে সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সরকার সার সংকট মোকবিলা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বেশ কিছু নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। মূল উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি ছিল সার শিল্পের বেসরকারিকরণ যার মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সার আমদানি ও বিতরণের অনুমতি দেয়া হয়। এটি সার সরবরাহের প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা এবং উন্নত দক্ষতার আনয়ন করে। সার আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার জন্য সরকার কৃষকদের জন্য ব্যাপকভিত্তিক ভর্তুকি ও ঋণ সুবিধা প্রদান শুরু করে।

অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সরকার ইউরিয়া প্ল্যান্টসহ সার কারখানা সম্প্রসারণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সরকার সার শিল্পের উন্নয়নের তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রচারের জন্য বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনকে (বিসিআইসি) কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। সরকারের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং বাংলাদেশ ইউরিয়া উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশে অন্যান্য ধরনের সারের উৎপাদনও বেড়েছে। যেমন ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং মিউরেট অফ পটাশ (এমওপি) আগে আমদানি করা হলেও এখন আর আমদানি করা হয় না। কৃষকদের মাঝে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নত হয়েছে এবং সারের বাজার মূল্য কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু সরকার রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব সারের ব্যবহারকে বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে। জৈব সারের ব্যবহারে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং রাসায়নিক সারের পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে শেখ হাসিনা সরকারের প্রচেষ্টা দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতি এবং উদ্যোগগুলো সারের প্রাপ্যতা এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করেছে, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং টেকসই কৃষি অনুশীলনকে উন্নত করেছে।

দুই দশক আগেও বাংলাদেশে সার সংকটের কারণে শুধু কৃষি উৎপাদনই হ্রাস পায়নি বরং কৃষকদের জীবন ও জীবিকার ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে। কিছু ক্ষেত্রে, সারের জন্য আন্দোলনকারী কৃষকদের জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। সেই সময়ে নিহত কৃষকদের পরিবার আজও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি। তবে বর্তমান সরকারের কৃষক বান্ধব নীতির বাস্তবায়নের ফলে সেই ভয়াবহ ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি আর দেখা যায় না। কৃষককে এখন সারের জন্য আন্দোলন করতে হয় না। বরং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারী এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ কৃষকদের বাসায় স্যারের কার্ড পৌঁছে দিয়ে আসে।

সহনীয় মূল্যে কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক বিপ্লব সাধনের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। আর এই কারণেই বাংলাদেশ প্রায় সব ক্ষেত্রে কৃষি পণ্যে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বিধায় গত দুই বছর ধরে চলমান কোভিড-১৯ অতিমারির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের জনগণকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো কৃষি ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগের কারণে গত প্রায় ১৫ বছরে বাংলাদেশে সারের চাহিদার কারণে কৃষক মারা যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমনকি কৃষকদের সারের জন্য আন্দোলনে রাস্তায় নামতে হয়নি।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত