রাজনীতির পালে নতুন হাওয়া

639

Published on জানুয়ারি 20, 2023
  • Details Image

ড. প্রণব কুমার পান্ডে:

২০২৪ সালের অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের দ্বাদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। বিশেষ করে ২০২২ সালের শেষের দিকে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং তৎপরবর্তী ১০ই ডিসেম্বরে ঢাকার মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে এক ধরনের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। দেশের জনগণের মধ্যে ১০ই ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল পরবর্তীতে যা প্রশমিত হয়েছে কারণ মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে এমন কোনো ঘটনা দেশে ঘটে নিয়ে যা রাজনীতির গতি প্রকৃতিকে পাল্টে দিতে পারে।

১০ই ডিসেম্বর ঘিরে উৎকণ্ঠাটি তৈরি হয়েছিল মূলত বিএনপি নেতা আমানুল্লাহ আমানের দেয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি ঢাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে বলেছিলেন, ১০ই ডিসেম্বরের পরে বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হবে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে। তার সেই বক্তব্যের পরে স্বভাবতই সবার মধ্যে এক ধরনের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল এই ভেবে যে ১০ই ডিসেম্বর কি তাহলে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে? কিন্তু তার সেই বক্তব্য শুধু বক্তব্যই হিসেবে থেকে গেছে। দেশের রাজনীতিতে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি যার ফলে প্রশাসন পরিচালিত হবে বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে। যদিও পরিবর্তন ঘটবার মতো যৌক্তিক কোনো কারণ ছিল বলে আমার মত দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করেনি।

বিএনপির ১০ই ডিসেম্বরের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সরকারের তরফ থেকে বেশ শক্তভাবেই সামাল দেয়া হয়। সরকারের প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগ বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মাঠের রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ছিল। ফলে বিরোধী দলের সরকার পতনের ডাক কিংবা আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করার অভিপ্রায় বাস্তবে পূরণ হয়নি। বরং বিরোধী জোটের আন্দোলনে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে।

রাজনীতিতে এমন কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা ঠিক নয় যেটি পরবর্তীতে হাস্যকর বক্তব্যের পরিণত হয়। রাজনীতির মাঠে একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে পারে। ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কটের মাধ্যমে একই রকম ভুল করছিল বিএনপি। এই ধরনের অবাস্তব বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করবার জন্য ২০২৩ সালের শুরু থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনে যে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে তা নিশ্চিন্ত ভাবে বলা যায়। পাশাপাশি সরকারি দল দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করেছে। নতুন কমিটি দলকে সংগঠিত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

সার্বিকভাবে রাজনীতির প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাচ্ছে যে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের হালে নতুনভাবে পালা লেগেছে। গত বছরের শেষের দিকে যারা ভাবছিলেন যে সরকারি দলের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও নেতিবাচক হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তারাই এখন বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বলতে বাধ্য হবেন যে ২০২৩ সালে রাজনীতির হওয়া উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে, কারণ সরকারি দল ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করছে। তাছাড়া করোনা পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার কারণে সরকারও একটু ব্যাকফুটে ছিল। সময়ের সাথে সাথে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।

এ ছাড়া গত বছরের শেষের দিকে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতারা ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্যাংশন আরোপিত হতে চলেছে মর্মে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ডিসেম্বর মাস অতিবাহিত হলেও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশ সরকার কিংবা কোনো ব্যক্তির ওপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য কোনো দেশ নতুন ভাবে স্যাংশন আরোপ করেনি বিধায় বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতাদের ভয় দেখানোর কৌশল কার্যকর হয়নি। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক জোট আন্তর্জাতিক স্যাংশনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সমীকরণের কথা চিন্তা করছিল সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বরং সরকারের তরফ থেকে র‍্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ডোনাল্ড লু তার সফরকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য উপস্থাপনের সময় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে তার সরকারের সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করেন। এটি বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। কারণ বিশ্লেষকরা মনে করছিলেন যে মার্কিন সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে ডোনাল্ড লু এর বাংলাদেশ সফর সরকারের জন্য কিছুটা হলে স্বস্তিদায়ক।

২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলমান রয়েছে তার হাওয়া যেহেতু আওয়ামী লীগের পক্ষে বইতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের উচিত এই ইতিবাচক হওয়াকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে তাদের পক্ষে নিয়ে আসা। গত ১৪ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছেন সেই অভিজ্ঞতাকে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে এবং বিরোধী দলের দুর্বলতার বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে জনগণের সামনে উপস্থাপনের মাধ্যমে জনগণের আস্তা অর্জন করা সম্ভব। একই সাথে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন জরুরি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে দলের মধ্যে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে তা অতিসত্বর চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। দলে দুর্বৃত্ত এবং অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে। দলের সাথে যুক্ত যে সব নেতাকর্মী দুর্নীতির সাথে যুক্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতার রক্ষা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা অত্যন্ত জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর বাংলাদেশের জনগণের আস্থা রয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া।

সৌজন্যেঃ সময় নিউজ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত