তরুণদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি

74

Published on আগস্ট 5, 2022
  • Details Image


এম নজরুল ইসলামঃ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসে এখন আর তাকে দেখা যায় না। তিনি নেই ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগের অফিসে। প্রাণোচ্ছল সেই মানুষটির উপস্থিতি আজ আর চোখে পড়ে না। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে নাড়ির টানে দেশে যাই। ঢাকার ব্যস্ত জনপদে খুঁজি তাকে। তিনি নেই।

চোখের সামনে তিনি নেই। আজ যখন যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নতির শিখরে, তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কেবল স্মৃতিতে ভাসে সেই দীপ্তিময় চোখ দুটি। সেই প্রশান্ত মুখ ভুলে থাকি কী করে? দৃষ্টির সম্মুখে তিনি নেই, এটা ঠিক। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই সেই দীর্ঘ ঋজু দেহ।

পুরু গোঁফের নিচে প্রশ্রয়ের স্মিত হাসি। চোখে কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। এক উচ্ছল তরুণের প্রোফাইল আজও স্পষ্ট হৃদয়ের অ্যালবামে।

১৯৭২ সালের পর থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত এক প্রাণময় সময় কাটিয়েছি আমরা। তারুণ্যের সেই সূচনালগ্নে ভেসেছি প্রাণের উচ্ছ্বাসে। সদ্য স্বাধীন দেশে নিয়েছি বুক ভরে নিশ্বাস। ছাত্র রাজনীতি থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড-খেলার মাঠ থেকে নাটকের মঞ্চ, সর্বত্রই ছিল আমাদের প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি। সদ্য স্বাধীন দেশে আমরা ডানা মেলে উড়ছি তখন। এই আকাশ আমার।

এই বাতাসে আমাদের অধিকার। এই আলো, এই হাওয়া-সব যেন নিজের মতো করে পাওয়া। স্টেডিয়াম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ; টিএসসি থেকে মধুর ক্যান্টিন-আমাদের কলরবে মুখর তখন। আমাদের মুখর তারুণ্যকে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরিয়ে দেওয়া সেই মানুষটি শেখ কামাল, আমাদের কামাল ভাই।

স্মৃতির সেলুলয়েডে আজও দেখতে পাই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের ঠিক উলটো দিকে ৩০ মিরপুর রোডে ছিল ছাত্রলীগের অফিস।

দোতলা বাড়ির নিচতলায় মহানগর ছাত্রলীগের, দোতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অফিসে আমারও তো নিত্য যাতায়াত ছিল। বয়সে কনিষ্ঠ হলেও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি তখন। ছাত্র রাজনীতির সাংগঠনিক পরিচয়ের গণ্ডি পার হয়ে তার ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগেনি। আমার দিক থেকে সংকোচ যে ছিল না, তা নয়। সংকোচ ও ভয় দুটিই ছিল। স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তিনি।

স্বাভাবিকভাবেই একটি দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু কামাল ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব এবং মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে একটুও সময় নেয়নি। ব্যাপারটা শেষ অবধি এমন হয়-প্রতিদিন একাধিকবার দেখা হওয়াটাই ছিল নিয়মিত রুটিন।

শেষ কবে দেখিছি তাকে? না, সে হিসাব করা নেই। হিসাব রাখারও তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। রোজ যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, স্মিত হাসি দিয়ে পিঠের ওপর হাত রেখে কাজ করার সাহস জোগাচ্ছেন যিনি-তার সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছে, এমন হিসাব কষার তো কোনো প্রয়োজন নেই। কোথায় দেখিনি তাকে! সদ্য স্বাধীন দেশে তখন আমরা ডানা মেলে উড়ছি যেন। চারদিকে আনন্দের জোয়ার।

সেই জোয়ারে তিনি দক্ষ এক সংগঠকের ভূমিকায়। গানের আসরে তাকে পাই। নাটকের মঞ্চে তার সপ্রাণ উপস্থিতি। খেলার মাঠে তিনি তো আছেনই। রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়েও তিনি উপস্থিত। সকালে দেখছি তাকে। বিকালেও সেই হাসিমুখে টেনে নিচ্ছেন কাছে। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ যে কোনো মানুষকে অনায়াসে কাছে টানার শক্তি রাখতেন। জানতেন কী করে সংগঠনকে প্রাণবন্ত রাখতে হয়।

শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহী শেখ কামাল স্বাধীনতার পর আবির্ভূত হন ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে। উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ও আধুনিক ফুটবলের অগ্রদূত আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। রাজনীতিতে তার অবদান কম নয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসাবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য।

শাহাদতবরণের সময় ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদতবরণের সময় তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। জন্মেছিলেন আজকের বঙ্গতীর্থ টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৯ সালে। মাত্র ২৬ বছরের জীবন। ঘাতকের বুলেটে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তার মৃত্যু দেশের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে তো বটেই, রাজনীতির জন্যও এক অসামান্য ক্ষতি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যরকম একটা জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন শেখ কামাল। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির গুণগত মানের পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল তার। সরকারের প্রধান নির্বাহী এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছেলে হয়েও দলের উঁচু পদের দিকে তার কোনো মোহ ছিল না। সাধারণ কর্মী হিসাবেই কাজ করতেন তিনি। ছিলেন উদ্যমী পুরুষ। সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে খেলার মাঠ-সর্বত্র সমান দাপট।

এই প্রাণবন্ত তরুণ প্রতিভাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। মূল্যায়ন দূরের কথা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তার শিল্পী মনের পরিচয় কজনের জানা আছে? অনেকেই হয়তো জানেন না, শেখ কামাল চমৎকার সেতার বাজাতেন। ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের সংগীত জগতে পপ সংগীতের যে উত্থান, তার নেপথ্যেও শেখ কামালের অবদান খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে সেই সময়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন’ শিল্পীগোষ্ঠী-যে দলটি দেশের সংগীত জগতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিল সেই সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে। দেশের নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ছিলেন নাট্যচক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও। অভিনেতা হিসাবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

আজকের দিনে যখন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি, যখন স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করে চলেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, তখন শেখ কামালের মতো একজন দক্ষ সংগঠকের অভাব বোধ করি। আজ তার মতো নেতৃত্ব বড় প্রয়োজন এই দেশে।

তার আদর্শ অনুসরণের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। রাজনীতি যখন কারও কারও কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি, তখন শেখ কামালের দেখানো পথ ধরে রাজনীতিকে সত্যিকারের মানবকল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব। সব সম্ভবের দেশেও কেমন করে নির্মোহ থাকা যায়, শেখ কামাল তারই অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও কেমন করে সাধারণ্যে মিশে যাওয়া যায়, শেখ কামাল তার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।

আজ ৫ আগস্ট, জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই প্রাণময় তরুণকে, যার প্রেরণা একদিন আমাদের মতো তরুণদের উজ্জীবিত করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে।

 

লেখক -

এম নজরুল ইসলাম : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত