শেখ কামালের বহুমাত্রিকতা

135

Published on আগস্ট 5, 2022
  • Details Image

অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ঃ 

আজ শেখ কামালের জন্মদিন। গত বছর থেকে দিবসটি জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের টানা শাসনে বাংলাদেশে যে অসংখ্য-অজস্র প্রশংসনীয় অর্জন, আমার বিবেচনায় তার অন্যতম একটি হচ্ছে এই দিনটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শেখ কামাল শুধু জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্রই নন, তিনি ১৫ আগস্টের প্রথম শহীদও। একইভাবে তিনি শুধু একজন ক্রীড়া সংগঠকই ছিলেন না, বরং তার ব্যাপ্তি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। ব্যাপ্তিময়-দ্যুতিময় শেখ কামাল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। আর সে কারণেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ৫ আগস্ট তাকে স্মরণ করা আর তার পরের তিন শ’ চৌষট্টিটি দিন ধরে তাকে ধারণ করাটা এত বেশি জরুরী।

শেখ কামাল ছিলেন ১৯৭১-এ ভারতের ডুয়ার্সের জঙ্গলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট অফিসার। ট্রেনিংয়ের কঠিন সময়গুলোয় সারাদিনের কঠিন ট্রেনিং শেষে রাতে আবার সহযোদ্ধা ক্যাডেট অফিসারদের কমনরুমে হারিকেনের আলোয় হারমোনিয়ামে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করতেন শেখ কামাল। ট্রেনিং শেষে ফলাফল? বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচের কমিশনপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (অব) শেখ কামালের নাম ছিল মেধা তালিকায় পঞ্চম।

স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যুব সমাজকে সংগঠিত করার। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে যেমন সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি যুব সমাজকে খেলায়-গানে-নাটকে মাতিয়ে একটা সুন্দর সমাজের প্রত্যাশায় কাজও শুরু করেছিলেন। আবাহনী ক্রীড়া চক্রের যাত্রা শুরু তার হাতে ধরে, এ কথা জানা সবার। কিন্ত আমরা অনেকেই জানি না আধুনিক জার্সি পরে, আধুনিক বুট পায়ে, আধুনিক ফুটবল দিয়ে ছোট ছোট পাসে এদেশে আধুনিক ফুটবল খেলার জনকও তিনি। খেলতেন নিজেও।

খেলতেন ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল আর ভলিবল। খেলেছেন আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, আবাহনী ক্রীড়া চক্র আর স্পারস-এ। বিশ^াস করতেন একজন ক্রীড়াবিদের মাধ্যমেও একটি জাতি পরিচিতি পেতে পারে বিশ্বব্যাপী শুধু আবাহনীই না, তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব, ইস্ট এ্যান্ড স্পোর্টিং ক্লাব আর কামাল স্পোর্টিং ক্লাবেরও, যদিও এই ক্লাবটি তার নামে নয়। কারণটাও খুব সরল। আবাহনীর পাশাপাশি এই ক্লাবগুলোতেও তখন ছিল তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাধান্য।

তবে এই পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তিনি কখনই কোন বড় ব্যবসায়ীর কাছে ধরনা দেননি। অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন আবাহনীর জন্য চারতলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাবও। যারা শুধুমাত্র বিভিন্ন সময়ে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন শুধু তাদেরই অধিকার ছিল শেখ কামালের এই ক্রীড়াযজ্ঞে দশ-বিশ-একশ’ টাকা চাঁদা দেয়ার।

তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করার সুযোগে যাতে কেউ কোন ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা নিতে না পারে এ ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন তিনি বরাবরই। খেলার সঙ্গে রাজনীতির যোগাযোগও ঘটিয়েছিলেন তিনি অদ্ভুত দক্ষতায়। ইস্ট এ্যান্ড আর ব্রাদার্স ইউনিয়নে তার যোগাযোগের সুবাদে পুরো পুরনো ঢাকায়, বিশেষ করে ওখানকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে তার বিশাল অনুসারী বলয় তৈরি হয়, যার সুফল এখনও আওয়ামী লীগ ভোগ করছে। ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের হয়ে ব্যাট করতে নামার আগে রকিবুল হাসানের ক্রিকেট ব্যাটে জয় বাংলা লেখা স্টিকারটাও সেঁটে দিয়েছিলেন শেখ কামালই।

শেখ কামাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী। হারমোনিয়াম বাজিয়ে শুধু গান-ই গাইতেন না, বাজাতেন সেতারও। ইস্কাটনে স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠীর অফিসে রিহার্সালের জন্য নিজের ঊনসত্তর মডেলের টয়োটায় করে সারা ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে নিয়ে আসতেন শিল্পী আর যন্ত্রীদের। এদেশের প্রথম নাট্যদল ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতাও শেখ কামাল। স্বাধীন বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন ঢাকা থিয়েটারের এই শেখ কামালের হাত ধরেই।

এজন্য ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভাঙ্গাচোরা অডিটরিয়ামটা তিনি ঠিক করিয়েছিলেন অনেক তদ্বির করে। নাটক মঞ্চায়নের আগেরদিন রাত সাড়ে এগারোটায় চান মিয়া ডেকোরেটরকে অনুরোধ করে চেয়ারের ব্যবস্থা করেছিলেন দর্শকদের জন্য। আর প্রচ- বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের পাশাপাশি সয়লাব যখন অডিটরিয়ামটিও তখন নিজে হাত লাগিয়েছেন তা পরিষ্কারে।

এভাবেই মঞ্চায়িত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মঞ্চ নাটকটি। নিজেও তুখোড় অভিনেতা ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ নাটকের নাম জানতে চান? ‘ত্রিরত্ন’ মাত্র দুটি এপিসোড প্রচারিত হয়েছিল নাটকটির পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট পর্যন্ত। এর নির্দেশনায় ছিলেন শেখ কামাল, স্ক্রিপ্টও তারই। আর অভিনয়েও শেখ কামাল।

আবুজর গিফারী কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দিন শেখ কামালের গুলিতে আহত জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীর রক্তমাখা শার্ট-প্যান্ট নির্বাচনের পরদিন পল্টনের জনসভায় দেখিয়ে মায়া কান্নায় ভেসেছিলেন জাসদ নেতারা। অথচ জাসদের আগ্রাসী ভাবভঙ্গি দেখে নির্বাচনের দিন দুপুরের অনেক আগেই সেখান থেকে চলে যান তিনি।

দুপুরের পরে নির্বাচনের ফলাফল ছাত্রলীগের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে জাসদের বহিরাগত সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গোলাগুলি শুরু করে। কলেজের পাশের গলি থেকে তাদের গুলি ছুড়তে দেখেছেন অনেকেই। অথচ কি অবলীলায়ই না পরদিন জাসদের জনসভায় উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হলো!

আর আসলে কি ঘটেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকে যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন শেখ কামাল? শেখ কামাল সেদিন অনুসরণ করছিলেন সার্জেন্ট কিবরিয়া নামের একজন পুলিশ অফিসারকে। রাতের ঢাকায় কিছু কিছু নাশকতায় পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ ছিল এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে কমলাপুর রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে ব্রিক সোলিং একটি রাস্তা ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে পৌঁছান শেখ কামাল। সেখানে তখন একটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি ছিল।

ধূর্ত সার্জেন্ট কিবরিয়া এরই মাঝে রটিয়ে দিয়েছেন যে তাকে অনুসরণ করছে সন্ত্রাসীরা। ফাঁড়ির পুলিশ গুলি চালালে আহত হন শেখ কামাল। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে কি বিশ্বাস করতে চান-একজন শেখ কামাল ছয়স্তরের নিরাপত্তা ভেঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত দেশের তাবৎ টাকা আর স্বর্ণ একটা টয়োটাকারের বুটে ভরে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছিলেন?

আজ শেখ কামালের জন্মদিনে তাই বড় বেশি মনে হয়- আজকে এই দেশটায় একজন শেখ কামালের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। একজন শেখ কামালের শূন্যতা যে কি বিশাল শূন্যতার জন্ম দেয় তার উদাহরণ তো আমরা দেখছি আমাদের আশপাশে হরহামেশাই। শেখ কামালের জন্মদিনে আমার প্রত্যাশা আর আক্ষেপগুলো মিলেমিশে তাই একাকার।

 

লেখক : ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত