ডিজিটাল বাংলাদেশের গ্রামগুলো হবে আরও মানবিক

550

Published on জানুয়ারি 3, 2022
  • Details Image

সজল চৌধুরী:

একটা সময় ছিল যখন গ্রামে ভালো সুচিকিৎসা ছিলনা। গ্রামের কোন মানুষ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে যাওয়া হতো দূরের কোন হাসপাতালে। পথে থাকতো অনেক বাধা বিপত্তি। কিন্তু আজ দৃশ্যপট পুরোটাই অন্যরকম। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রামে আজ রয়েছে হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক। গ্রামের যে কোন মানুষ আজ খুব সহজেই তাদের সুচিকিৎসা পাচ্ছে তাদের নিজ গ্রাম গুলোতেই। খুব বড় কোন প্রয়োজন ছাড়া তাদেরকে দৌড়াতে হচ্ছে না স্বাস্থ্য সেবার জন্য দূরের কোন শহরে।

ঠিক একই অবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রেও। অতীতে দেখা যেত গ্রামের স্কুল কলেজ গুলোর তুলনায় শহরের স্কুল কলেজগুলোর ছাত্র-ছাত্রীদের রেজাল্ট অনেক ভালো। তাই গ্রামের যেকোনো ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণা ছিল গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো ভালো সুযোগ সুবিধা নেই। এক্ষেত্রেও দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। আজ বিভিন্ন পরীক্ষার রেজাল্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় গ্রাম এবং শহরের পড়াশোনার বৈষম্য নেই বললেই চলে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শহরের তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ এবং রেজাল্ট অনেকাংশেই ভালো। গ্রামে বসে যে কেউ শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মেধাবৃত্তির ব্যবস্থাপনা। যার মাধ্যমে গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাও উন্নত শিক্ষা সেবা নিজেদের ঘরে নিয়ে আসতে পারছে। আর উচ্চশিক্ষার কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ হবে একটি বিশেষ দৃষ্টান্তের দেশ। যেখানে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার ব্যবস্থা করেছে। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় নয় কারিগরি দিক থেকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বিভিন্ন ধরনের টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট অথবা কলেজ এখন এই গ্রামবাংলার মানুষের হাতের নাগালের মধ্যেই। উচ্চশিক্ষার এমন সহজলভ্যতা পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে বলে আমার ধারণা নেই!

এবার আসা যাক গ্রামবাংলার রাস্তাঘাটের কথা। একটা সময় গ্রাম বাংলার রাস্তাঘাট এর কথা বলতে গেলে মনের মধ্যে ভেসে আসত ধুলা কর্দমাক্ত রাস্তাঘাট। কিন্তু আজ গ্রামের যে প্রান্তেই যাই না কেন সেখানেই দেখা যায় পাকা সড়ক। নির্দ্বিধায় যেখানে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি-ঘোড়া চলছে। গ্রামের মানুষগুলো খুব সহজেই এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াত করতে পারছে। তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারছে। গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট গ্রাম্য বাজার। সেই গ্রাম্য বাজারে একদিকে যেমন গ্রামের মানুষেরা তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করছে অন্যদিকে তেমনি এই গ্রামের বাজারগুলো সেই সকল গ্রামের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আরও সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। এগুলো এখন আর রূপকথা নয়। কোন গল্প নয়। এই আবহমান গ্রাম বাংলা এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিণত হচ্ছে আরো বেশি মানবিক হয়ে। যেখানে গ্রামের যেকোনো নাগরিক খুব সহজেই তাদের হাতের কাছে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। আর এটিই হচ্ছে বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের গ্রামগুলোর রূপরেখা।

এই গ্রাম গুলো আস্তে আস্তে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। কৃষকেরা খুব সহজেই ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে ঘরে বসে পাচ্ছে নিত্যনতুন কৃষির উদ্ভাবনী টেকনোলজি। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তারা একই জমিতে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফসল উৎপাদন করতে পারছে। দেশের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারছে। তাছাড়া উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা আজ পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের দরবারে। গ্রামে বসেই ডিজিটাল সেবাকে ব্যবহার করে তারা তাদের অর্থনৈতিক অগ্রসরতা শহর থেকে বিশ্বের অন্যান্য উন্নত শহরে পৌঁছে দিচ্ছে। যা একসময় ভাবার অবকাশ ছিল না।

এই পথ চলা মোটেই সহজ ছিল না। মনে রাখতে হবে যেকোনো সফলতার পেছনে কোন না কোন গল্প থাকে। এমনকি কখনো কখনো কিছু ব্যর্থতাও থাকে। তবে দুঃখের বিষয় এই যে অতীতেও দেখা গিয়েছে বাংলাদেশ যখনই কোন সমস্যার সম্মুখীন হয় তখনই শুরু হয়ে যায় একশ্রেণীর মানুষের সমালোচনা। তারা বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে বাংলাদেশ ঠিক পথে যাচ্ছে না। অন্যদিকে আরেক শ্রেণীর মানুষ সবসময়ই বোঝানোর চেষ্টা করে সব ঠিক আছে। আর এই বৈপরীত্যের মধ্যে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। তারা বুঝতে পারে না সময়ের সঠিক পদক্ষেপ, যা যেকোনো বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সকলেই জানি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উদারতার অভাব নেই। তিনি দূরদর্শী সম্পন্ন। তার চিন্তার গভীরতা ব্যাপ্তি অনেক। তিনি সুদূরপ্রসারি। দেশের জনগণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা তার রক্তের মধ্যে মিশে আছে যার উদাহরণ আমরা সব সময় দেখতে পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে তার চিন্তার সুফল আমরা সেই সময়ে সঠিকভাবে পাব যখন তার চারপাশের নীতিনির্ধারকেরা সুস্থ মন মানসিকতা আর সুপরিকল্পনা নিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবেন এবং তার বাস্তবায়ন করবেন সাধারণ জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে। সময় উপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন হবে আমাদের দেশের জন্য এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি কার্যকর।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে প্রতিনিয়ত জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকলের সাথে বৈঠক করছেন গ্রাম ও শহর উন্নয়নের লক্ষ্যে, বিভিন্ন প্রতিনিধির সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলাপ আলোচনা করছেন যা একযোগে সবাই শুনতে পাচ্ছেন এবং দেখতে পাচ্ছেন ডিজিটাল প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে তা সত্যই আশার সঞ্চার করে। সাহস যোগায়। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রান্তে একজন সাধারণ নাগরিক খুব সহজেই জানতে পারছেন তার এলাকায় কি ধরনের সাহায্য সহযোগিতা বাংলাদেশ সরকার প্রদান করছে এবং তার প্রাপ্যতা সম্পর্কে সে প্রতিনিয়ত সজাগ থাকতে পারছেন। যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এ ধরনের কার্যক্রম একজন মানুষের মনোবল এবং সাহস ধরে রাখতে সাহায্য করবে। এজন্য বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে গ্রাম ও শহর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা যা সরকারের ভাবমূর্তিকে বিভিন্ন ভাবে নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে। যা বর্তমান সরকারের অনেক সুগঠিত কার্যক্রমের ভাবমূর্তিকে সমালোচনায় ফেলে দিচ্ছে, আলোচনায় নিয়ে আসছে। এই বিষয়গুলোর দিকে অবশ্যই দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বিপদে যারা সুযোগ নেবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাদের বিষয়ে সরকারের কঠিন পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি এই মুহূর্তে। আবার সেবাদানকারী ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান সকলেরই সুযোগ-সুবিধার কথা মাথায় রাখতে হবে। তা না হলে সেবাদান থেকে অনেকেই বিমুখ হবে। বাস্তবিক এই বিষয়গুলো সততার সাথে বিবেচনা করতে হবে দেশকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রেষ্ঠতম বাঙালি। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা- এ ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যই বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদী ভাবনার মূল কথা। বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তাকে তিনি কী বিপুলভাবে ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন, তা থেকে। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন- ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল।... আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের নিকট নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরম মিত্র ইন্দিরা গান্ধী বলেন - ‘শেখ মুজিব ছিলেন একজন মহান নেতা। তার অনন্যসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’ কিংবা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মতো বিশ্বনেতা বলেন - ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব এবং সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়।... শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’

বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার জনগণের ক্ষমতা, সংকল্প এবং পরিবর্তনের একান্ত ইচ্ছা রয়েছে। তাদের অভাব রয়েছে তা হলো প্রয়োজনীয় সমালোচনামূলক সংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং মূলধন। তাদের পাশে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের অংশীদারদের প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের সংস্থান এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এগুলোর সঠিক সহবস্থান হলেই গ্রাম বাংলার মানুষ সাফল্যের দিকে বেরিয়ে আসবে এই ডিজিটাল বাংলাদেশ এ। গ্রামোন্নয়নের বঙ্গবন্ধুর সেই মহান স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শহরের সুবিধাগুলোকে গ্রামে নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। হয়তো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ডিজিটাল বাংলাদেশের সবগুলো গ্রাম হয়ে উঠবে আরও মানবিক আরো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। তবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেতে হবে আরও অনেক দূর।

লেখকঃ শিক্ষক ও স্থপতি (বর্তমানে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ স্থাপত্য-পরিবেশ বিষয়ক পিএইচডি গবেষক)

 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত