চিরঞ্জীব শেখ রাসেল

510

Published on অক্টোবর 17, 2020
  • Details Image

শেখ ইমতিয়াজ আকাশ:

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটির উত্তর-পূর্বদিকের ঘরটি আলোকিত করে জন্মগ্রহন করেছিলেন তাঁর কনিষ্ট সন্তান শেখ রাসেল। শেখ রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চট্টগ্রামে ছিলেন। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন না থাকায় ল্যান্ডফোনই ছিলো একমাত্র ভরসা।রাতেই যাতে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর যায় সে ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বঙ্গকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা বলেন, " রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিলো ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেঝ ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেঝ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখবো। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালোচুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড় সড় হয়েছিলো রাসেল।"
 
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিখ্যাত বৃটিশ দার্শনিক সাহিত্যে নোবেল পুস্কারপ্রাপ্ত বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। বঙ্গমাতা বার্ট্র্যান্ড রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন। ছোট বেলা থেকই রাসেল ছিলেন প্রচন্ড সাহসী,ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু মত উদার হৃদয়ের, ছিলো মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ওনার সবকিছুই ছিলো ব্যাতিক্রম।শিশু রাসেলের মাঝে বঙ্গবন্ধুর সকল গুনবালিরই প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হয়েছিলো। শিশু রাসেলের সেই জ্বলজ্বলে সুতীক্ষ্ন চোখ দুটোই বলে দিয়েছিলো ঐ শিশুর মাঝে ছিলো ভিন্নকিছু।ঘাতকচক্র বুঝতে পেরেছিলো শেখ রাসেল জাতির পিতার যোগ্য উত্তরাধীকারতাই ছোট্ট নিস্পাপ শিশুটিকেও রেহায় দেয়নি।
 
৬ দফার পর থেকেই জাতির পিতা শেখ মুজিব কারাবন্দি। শিশু রাসেল তখন একবারেই ছোট। মায়ের কোলে চড়ে জেলগেটে গিয়ে ছোট্ট শিশুটি দেখা করে তার বাবার সাথে। ভাই শেখ রাসেলকে নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার এখনো মনে আছে; যখন আমরা আব্বার সাথে দেখা করতে জেলগেটে যেতাম, আমরা আব্বাকে, ‘আব্বা’ বলে ডাকতাম। রাসেল তখন আব্বাকে একবার ‘আব্বা’ বলে ডাকতো, আরেকবার মাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতো। কারণ, তার অবুঝ মন, মনের ব্যথা সে বলতে পারতো না কিন্তু বুঝতে পারতো যে, সে পিতৃস্নেহ বঞ্চিত।”
 
পরবর্তীতে ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তখনই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সাথে সাথে আক্রমন শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। কিছুদিন পর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, দেশরত্ন শেখ হাসিনা, বঙ্গকন্যা শেখ রেহানা, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেলকেও গ্রেপ্তার করে ১৮ নম্বর রোডের একতলা একটি বাড়িতে নিয়ে রাখে। শেখ কামাল তখন মুক্তিযুদ্ধে। ওই বাড়িতে দুটো কামড়ার মধ্যে বন্দি ছিলেন জাতির পিতার পরিবার। ছোট্ট রাসেল কিছুই বুঝতো না। সেখানে ঠিকমত খাবার-দাবার ছিলোনা, ছিলোনা তার খেলার কোন সাথি ; খেলনাগুলোও ছিলোনা কিন্তু এভাবেই তাকে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন।
 
এরপর, দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করি। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পরিবার তখনো মুক্তি পায়নি। মুক্তি পান ১৭ ডিসেম্বর।দেশ স্বাধীনের পর শেখ রাসেলকে রাজধানীর ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাত। তখন স্কুলের গানের আপা ছিলেন জাহানার ইসলাম। তার ভাষ্য মতে, খেলাধূলায় বেশি মনোযোগ ছিলো শেখ রাসেলের। সে জন্য গানের দিকে বেশি আগ্রহ ছিলো না। কিন্তু আস্তে আস্তে শেখ রাসেল গানের প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠে। যখন দেশাত্ববোধক গান হতো সেগুলো চিৎকার করে গাইতো শেখ রাসেল। তবে তখন যদি ছোট্ট রাসেলকে জিজ্ঞেস করা হতো, ‘বড় হয়ে তুমি কী হবে?’ তার উত্তর ছিল, ‘আমি আর্মি অফিসার হবো’। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে সেই স্বপ্নের অকাল মৃত্যু হলো।
 
বঙ্গবন্ধু যেমন নিজের জামা-কাপড় অন্যকে দিয়ে দিতেন, টুঙ্গিপাড়া গেলে ঠিক একই কাজ করতো শিশু রাসেল। খেলার সাথিদের জামা-কাপড় দিত ছোট্ট শিশু রাসেল,বানিয়ে দিতো ডামি বন্দুক, কিনে দিত বিস্কুট লজেন্স। যেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াই তার মাঝে ফুটে উঠছিলো। অসাধারণ মেধাবী ছিলেন শেখ রাসেল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাকে নিয়ে বিভিন্ন সভা সমিতিতে যেতেন,জাপান ভ্রমনের সময় করেছিলেন সফরসঙ্গী। শিশু রাসেলের কথা-বার্তা, আচার-আচরণে সর্বাদাই যেন পাওয়া যেত বাংলার মাটি ও মানুষের ছায়া। একেবারেই পিতার যোগ্য উত্তরাধিকারের মত। শিশু রাসেলের এসব গুনের খবর নিশ্চই পৌছেছিলো ঘাতকচক্রের কাছে।তাই শিশু রাসেলের বেঁচে থাকাটা কিছুতেই তারা নিরাপদ মনে করেনি।ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করেছিলো মূলত বাংলাদেশকে হত্যা করার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মহান স্বাধীনতাকে হত্যা করাই ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী পরাজিত ঘাতকচক্রের মূল উদ্দেশ্য।পৃথিবীর ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটেছে কিন্তু এমন নির্মম, নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোথাও ঘটেনি।ঘাতকরা জানতো যদি জাতির পিতার পরিবারে একজন সদস্যও বেঁচে থাকে তবে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাইত তাদের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহায় পাইনি অন্ত:সত্ত্বা নারী ; রক্ষা পায়নি এগারো বছরের শিশু রাসেল। জাতির পিতার দুই কন্যা সেদিন যদি বিদেশে না থেকে দেশে থাকতেন তাহলে আজ বাংলাদেশের অবস্থা কেমন হতো তা কল্পনা করা যায় না।
 
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে আজ সাতান্ন বছরে পা রাখতেন। কিন্তু পঁচাত্তরের ঘাতকচক্র তা হতে দেয়নি। অথচ শিশু রাসেল ত সেদিন বাঁচতে চেয়েছিল। বাঁচার জন্য ঘাতকদের কাছে আকুতি জানিয়েছিল বার বার। যেতে চেয়েছিলো পরম নিরাপদ আশ্রয় মায়ের কাছে। মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঘাতকরা শিশু রাসলকে হত্যা করেছিলো নির্মমভাবে। শিশু রাসেল আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু আজীবন নশ্বর হয়ে থাকবে তার স্মৃতি।
 
শেখ রাসেল আজ একটি চেতনার নাম- এই চেতনা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির চেতনা- এই চেতনা অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা-এই চেতনা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার চেতনা। যাকে ধারণ করেই এগিয়ে যাবে লাখো বাঙালি শিশু।

 

 লেখকঃ শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত