অসাম্প্রদায়িক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব আইভি রহমান

1027

Published on আগস্ট 25, 2020
  • Details Image

ড. মুহম্মদ মনিরুল হকঃ 

আইভি রহমান ছিলেন মঞ্চের সামনের সারিতে, ট্রাকের পাশে। খোলা ট্রাকের ওপর মঞ্চ। ট্রাক ঘিরে মঞ্চের আশপাশে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর ভিড়। তারিখ ২১ আগস্ট, ২০০৪। সময় বিকেল প্রায় সাড়ে ৫টা। স্থান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা। ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শেষ করলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। ট্রাকের শেষ মাথায় লাগানো মই দিয়ে নিচে নামার জন্য তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ বিকট শব্দ! বিস্ফোরণ! গ্রেনেড হামলা! একের পর এক বিস্ফোরিত হতে লাগল গ্রেনেড। একপর্যায়ে থেমে যায় বিস্ফোরণের শব্দ। চারদিকে নিস্তব্ধতা। ছিন্নবিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকে হতাহত মানুষের ছবি। জ্ঞানশূন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ়, দিশাহারা সবাই। ভয়, কান্না, চিৎকার, আকুতি-মিনতির হাহাকার। কারো হাত, কারো পা, কারো নিথর-নিস্তব্ধ দেহ পড়ে আছে।

আইভি রহমানকে নেওয়া হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। নাজমুল হাসান পাপনের বক্তৃতা থেকে জানা যায়, সেদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইভি রহমানের কোনো চিকিৎসা হয়নি। তাঁকে হাসপাতালের বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছিল। তাঁর শরীর থেকে অনবরত রক্ত বেরোচ্ছিল। তাঁকে চিকিৎসা না দিতে ওপর থেকে নির্দেশ ছিল। ২১ তারিখেই তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরও মো. জিল্লুর রহমান আক্ষেপ করতেন—আজ যদি আইভি বেঁচে থাকত। আইভি রহমান ছিলেন জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী। রাজনীতি, পরিবার, সংসার, ছেলে-মেয়ে সব কিছুরই নিত্য সাথি। ১৯৫৮ সালের ২৭ জুন তাঁরা বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। আইভি রহমান তখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা তখন স্বনামধন্য শিক্ষক—ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। কথিত আছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁরাও বঙ্গবন্ধুর কাছে কৃতজ্ঞ থেকেছেন। আজীবন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাশে থেকেছেন। আইভি রহমানের বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। সে কারণেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তাঁদের নিবিড় সম্পর্ক।

আইভি রহমান ১৯৪৪ সালের ৭ জুলাই ভৈরব উপজেলার চণ্ডিবেড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা হাসিনা বেগম ছিলেন গৃহিণী। আট বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে পঞ্চম আইভি রহমান। বেড়ে উঠেছেন যৌথ পরিবারের আদর-শাসন-স্নেহে। জন্মভূমি ভৈরবে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও ১৯৬০ সালে তিনি এসএসসি পাস করেছেন ঢাকার বাংলাবাজার স্কুল থেকে। মেধাবী আইভি রহমান ১৯৬৯ সালে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে আইভি রহমানের সম্পৃক্ততা বাড়ে বিয়ের পর থেকে। ১৯৬৯-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধের সময় আইভি রহমান বেগম সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে রাইফেল ও ফাস্টএইড প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। অন্য নারীদের প্রশিক্ষণও পরিচালনা করেছেন। তিনি কাজ করেছেন জয় বাংলা বেতারেও। ভূমিকা রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও উদ্যম সৃষ্টিতে। ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে আইভি রহমান বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন। তিনি মহিলা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব ছিয়েছেন ২০০৩ সাল পর্যন্ত। 

নারী উন্নয়ন ও নারীর অধিকার বাস্তবায়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি পুনর্গঠনে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি যথাক্রমে জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও আইভি রহমান নিষ্ঠাবান ছিলেন পরিবার ও সন্তান-সন্ততির প্রতি দায়িত্ব পালনে। তাঁর একমাত্র পুত্র নাজমুল হাসান পাপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী। বর্তমানে তিনি ভৈরব-কুলিয়ারচর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। তাঁর বড় মেয়ে তানিয়া বখ্ত বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আইভি রহমান একজন মা, একজন সমাজকর্মী, একজন রাজনীতিবিদ, একজন স্ত্রী, সহযোদ্ধা, একজন নেতা—সর্বোপরি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ২১ আগস্ট সমাবেশের কিছুদিন আগেও তিনি ভৈরবের বন্যায় দুর্গত মানুষের পাশে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আইভি রহমানকে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার দেওয়া হয় ২০০৯ সালে। আজীবন সংগ্রামী, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব আইভি রহমানের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত