ডিজিটাল সেন্টার :বাড়ির পাশে আরশিনগর

2147

Published on জুলাই 30, 2018
  • Details Image

মো. পারভেজ হাসানঃ

আমরা যদি ‘জনগণের দোরগোড়ায় সেবা’ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সর্বব্যাপী প্রচেষ্টাগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করি তবে দেখব যে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (তত্কালীন ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র) হচ্ছে ঐ রূপকল্প অর্জনের প্রথম ধাপ। নানাবিধ আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে ডিজিটাল সেন্টারের প্রাসঙ্গিকতা ও উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের আশাবাদী করে। আমরা দেখতে পাই যে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সাত বছরের মধ্যে সারাদেশের ৫২৮৬টি ডিজিটাল সেন্টার হতে সরকারি-বেসরকারি প্রদেয় সেবার সংখ্যা ১৫০টি, মোট সেবা প্রদান করা হয়েছে ৩৬৭ মিলিয়ন, মোট টাকা উপার্জন (উদ্যোক্তাদের) হয়েছে ৩২.৯৫ মিলিয়ন, ৭৫ মিলিয়ন অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, ৩৩০০ সেন্টারে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদান, ৮০০ সেন্টারে ই-কমার্স (একশপ) সেবা প্রদান, ০.২৯ মিলিয়ন গ্রামীণ নাগরিকের জীবন বীমা সেবা গ্রহণ, ৪ মিলিয়ন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান। (তথ্যসূত্র: এটুআই প্রোগ্রাম)

আমাদের ভাবনাটি এরকম যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ আসলে ‘ডিজিটাল উপায়ে সোনার বাংলাদেশ’। ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি সমস্ত কর্মকাণ্ডকে আরো বেশি জনবান্ধব করে তোলা, সরকারি দপ্তরের সেবাসমূহকে বিকেন্দ্রীকরণ করে তৃণমূলে পৌঁছানো এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত নয় কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নয় তাদেরকে সহায়তা করার জন্য প্রতিটি ডিজিটাল সেন্টারে একজন পুরুষ ও একজন নারী উদ্যোক্তা কাজ করছেন। সারাদেশে দশ হাজারেরও বেশি উদ্যোক্তা বিগত সাত বছরে এই প্রক্রিয়ায় ৩৬৭ মিলিয়ন সেবা প্রদান করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নে সামিল হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেবার মধ্যে রয়েছে জমির পর্চার আবেদন, পাসপোর্টের আবেদন, জন্ম নিবন্ধন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিবন্ধন ইত্যাদি।

সময়ের প্রয়োজনে ডিজিটাল সেন্টারকে প্রকৃত অর্থেই সকলের জন্য একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের মাধ্যমে এ সকল ডিজিটাল সেন্টারে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ আজ তাদের বাড়ির কাছেই ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার স্বাদ পাচ্ছেন। বিদ্যুত্ বিলের পেমেন্ট থেকে শুরু করে রেমিটেন্স গ্রহণ সবই হচ্ছে ডিজিটাল সেন্টারে। ব্যাংকে একটি একাউন্ট থাকায় মানুষ সঞ্চয়মুখী হচ্ছে আর এতে করে জাতীয় অর্থনীতিতে ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের অংশগ্রহণ বাড়ছে। স্যোশালসেফটিনেট প্রকল্পসমূহের আওতায় সারাদেশের ভাতাভোগীদের কাছে ডিজিটাল উপায়ে সরাসরি অর্থমন্ত্রণালয় হতে ভাতা ছাড়ের তথ্য (এসএমএস) পৌঁছে যাচ্ছে এবং ভাতার অর্থ প্রদান করছেন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা। এরকম একটি উদ্যোগের পাইলটিং চলছে এই মুহূর্তে দেশের পাঁচটি (কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজার) জেলায়। এছাড়াও ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ই-কমার্স সেবা চালু করা হয়েছে।

ডিজিটাল সেন্টার ঘিরে এতসব আয়োজনের পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে কলসেন্টার সেবা ‘৩৩৩’। এ ৩৩৩-তে কল করে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সরকারি সেবা পদ্ধতির তথ্য, কর্মকর্তা/ জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগের তথ্য, পর্যটন সম্পর্কিত তথ্যাদি এবং সামাজিক সমস্যা যেমন: বাল্যবিবাহ, মাদক, ইভটিজিং ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে। সেবাপ্রাপ্তি বা সরকারি দপ্তরের কাজসমূহকে আরো বেশি জনসম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ‘৩৩৩’ নম্বরকে ডিজিটাল সেন্টারের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এ সকল আয়োজন নিয়ে যখন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একটি ডিজিটাল সেন্টার; সেটি আর তখন শুধুমাত্র একটি সেবাকেন্দ্র থাকছে না; হয়ে উঠছে দুঃখী মানুষের শেষ ভরসাস্থল; লালনের আরশিনগর।

লেখক : যুগ্ম-সচিব, ন্যাশনাল কনসালটেন্ট ফর লোকাল ডেভেলপমেন্ট, একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম, আইসিটি ডিভিশন

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত