একাত্তরের পহেলা মার্চের স্মৃতি

835

Published on মার্চ 1, 2020
  • Details Image

বিভুরঞ্জন সরকারঃ

১৯৭১ সালে আমি দিনাজপুর সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমাদের কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন মনোনীত প্যানেল হেরে যায়। স্বভাবতই মন খারাপ। পরের দিন সকালে হোস্টেল থেকে বের হয়ে কলেজে না গিয়ে আমরা কয়েক বন্ধু ঢুকলাম চৌরঙ্গী সিনেমা হলে, মর্নিং শো দেখতে। ‘রোড টু সোয়াত’ নামের একটি উর্দু সিনেমা চলছিল । বেলা দেড়টা নাগাদ সিনেমা শেষে রাস্তায় বের হয়ে দেখি মিছিল। কি ব্যাপার? হঠাৎ মিছিল কিসের, কেন?

প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পরিচিত কাউকে না পেয়ে মিছিলে সামিল হলাম। কারণ তখন মিছিল আমাদের রক্তে। মিছিল দেখলে ভেতর থেকে কড়া নাড়ার শব্দ শুনতাম যেন। ঊনসত্তর থেকেই মিছিল যেন আমাদের অভ্যাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের পঠন-পাঠনের মতো মিছিলও নিয়মিত ব্যাপার ছিল। তবে একাত্তরের ১ মার্চের সেই মিছিল একটু অন্যরকম ছিল। মাথার ওপর গনগনে সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে মধ্য দুপুরে। মিছিলে পা মিলিয়েই কানে আসে নতুন স্লোগান। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘ইয়াহিয়ার মাথায় লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘ভুট্টোর মাথায় লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

তার আগে অনেক মিছিল করেছি, গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়েছি কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন করার স্লোগান কণ্ঠে উচ্চারিত হয়নি। বুঝলাম, বড়ো কিছু ঘটেছে। তবে কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। মিছিল সামনে অগ্রসর হচ্ছে আর তাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। কাউকে ডাকতে হচ্ছে না। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিচ্ছেন। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? তাহলে বাঙালি জাতি কি ততদিনে অমন মিছিল এবং স্লোগানের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল?

মিছিল গিয়ে জমায়েত হলো দিনাজপুর ইন্সটিটিউটের সামনের খোলা মাঠে। সেখানে গিয়ে জানলাম মিছিলের কারণ। ৩ মার্চ সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণের মাধ্যমে সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করার প্রতিবাদ বাঙালি রাস্তায় নেমে এসেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের কাছে যে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না তা স্পষ্ট হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতি।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্দেশ দেওয়ার আগেই, ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি রাস্তায় নেমে পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। অস্ত্র হাতে নেওয়ার স্লোগান দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন করার কথা বলেছে। অবশ্য বাঙালির মনে এই জাগরণ তৈরিতে একক ভূমিকা পালন করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

এই যে নেতার প্রত্যক্ষ পূর্ব নির্দেশনা ছাড়াই এভাবে পথে নামলো–এটাই ছিল একাত্তরের বড়ো শক্তি? এই ঘটনা কেবল ঢাকায় ঘটেনি, ঘটেছিল সারাদেশে শহরে-বন্দরে-গ্রামে, এক যোগে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য এটাই যে, তিনি তার ‘মানুষ’দের এভাবেই প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি ‘হুকুম দেবার না’ পারলেও মানুষ বসে থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের অনুকূলে স্লোগান দিতে বাঙালি কোনো সেনাকর্মকর্তার বেতার ঘোষণার অপেক্ষা করেনি। একাত্তরের মার্চ যারা দেখেছেন, তারা ইতিহাস বিকৃতির ফাঁদে পা দিতে পারেন না। যারা সব জেনেবুঝেও উল্টোগীত গান, তারা ভণ্ড, তারা জ্ঞানপাপী।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতলব যে ভালো না এটা বুঝতে সেদিন অধিকাংশ বাঙালির অসুবিধা হয়নি। ভোটের পর থেকে শাসকদের টালবাহানা দেখেই অনেকে বুঝেছিলেন, ওরা ক্ষমতা ছাড়বে না। তখন থেকেই যেন বাঙালি স্বাধীনতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েই ছিলো। তার প্রমাণ পহেলা মার্চের বিক্ষুব্ধ বাংলাদেশ এবং জনতার স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগান।

বিক্ষুব্ধ মার্চের প্রথম দিনই এটা স্পষ্ট হয়েছিলো যে পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। মৃত পাকিস্তানের কবরে অভ্যুদয় ঘটতে চলেছে এক স্বাধীন ভূখন্ডের, নাম তার বাংলাদেশ।

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

মার্চ মাসের প্রথম দিন যা ছিলো জনতার কণ্ঠে স্লোগান, ওই বছর ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ তাই বাস্তবে রূপ পেলো। এরমধ্যে নয় মাস জুড়ে রচিত হলো বাঙালির সাহসের ইতিহাস। ভেতো বাঙালি ঠিকই অস্ত্র ধরলো, লড়লো, মরলো। মরার দেশে বরাভয় আনলো এবং বাংলাদেশ স্বাধীন করলো।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশঃ বিডিনিউজ২৪.কম

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত