বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং পরবর্তী বাংলাদেশ

4338

Published on আগস্ট 30, 2018
  • Details Image

ড. মোহাম্মদ হাসান খানঃ

হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এনে দিয়েছিলেন স্বাধীনতা। তিনি এ দেশের মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন। তার বিনিময়ে স্বাধীন দেশে কেউ তার রক্ত ঝরাবে, এটি ছিল তার কাছে সম্পূর্ণ অকল্পনীয় বিষয়। যার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েও অবাধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, সর্বত্র যাতায়াত করেছেন নির্দ্বিধায়। তার পরিবারের মানুষজনও রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিতে চাইতেন না। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামালসহ পরিবারের কেউই চাকচিক্য পছন্দ করতেন না। শিশু শেখ রাসেল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনের সড়কে একা একা সাইকেল চালাত। বরেণ্য সাংবাদিক এবিএম মূসা স্মৃতিকথায় লিখেছেন, শেখ রাসেল স্কুলে যাওয়ার সময়ও তার সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা বাহিনী থাকত না। কেবল শিশু রাসেল নয়, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাই এভাবে চলাফেরা করতেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বঙ্গভবনে থাকেননি। অনেক শুভাকাক্সক্ষী তাকে নিরাপত্তার জন্য বঙ্গভবনে যেতে বললেও তিনি যাননি। তিনি মনে করতেন, বঙ্গভবনে থাকলে তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হবে। স্বভাবতই তিনি জনগণ থেকে দূর থাকতে চাননি। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান। তার লেখা ‘ফ্যান্টম্স্ অব চিটাগং’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘এবারও আমি লক্ষ করলাম, তার বাসায় কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সব রকমের মানুষ সময়-অসময়ে যখন-তখন এসে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার চাইত। তার সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকদের কোনো বাছবিচার নেই। এ কথা তুলতেই তিনি বললেন, ‘আমি জাতির জনক, দিন বা রাতে কোনো সময়েই তো আমি আমার দরজা বন্ধ করে দিতে পারি না।’ বঙ্গবন্ধুর এমন সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিয়েছিল পঁচাত্তরের ঘাতকরা। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এ কথা বঙ্গবন্ধুকে জানালেও তিনি গুরুত্ব দেননি। জওহরলাল নেহরুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা আর এন কাও ১৯৮৯ সালের এপ্রিলের শেষদিকে সানডের সংখ্যায় লিখেছেন, ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে আমি নিজে ঢাকায় এসে মুজিবকে এ ষড়যন্ত্রের খবর দিই। কিন্তু মুজিব সেটি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘ওরা আমার সন্তান। আমার কোনো ক্ষতি ওরা করবে না।’ শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালের মার্চে কাও তার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ঢাকা পাঠান। শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি জানান, সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ অংশের দুটি ইউনিটে তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। এবারও বঙ্গবন্ধু এ সতর্কবার্তায় কান দেননি। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, যাদের জন্য তিনি প্রাণ বাজি রেখেছিলেন, যাদের তিনি সন্তান হিসেবে জানেন তারা তাকে কেন হত্যা করবে!

বঙ্গবন্ধু সবাইকে মহানুভবতা ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। এটিই শেষ পর্যন্ত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়’ রচনায় আবদুল মান্নান তথ্য-প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন এমন অনেকেই পঁচাত্তরে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এদের অনেকে ষড়যন্ত্র টের পেলেও তারা তা বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেননি। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাত আটটায় বঙ্গবন্ধু ধানম-ির নিজ বাসায় ফিরেছিলেন। তার সহকারী এএফএম মুহিতুল ইসলামের তথ্যমতে, সেদিন বঙ্গবন্ধু পরিবার রাত ১২টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাতে ঘাতকরা ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা চালায়। তাদের গুলিতে প্রথম শহীদ হন শেখ কামাল। সর্বশেষ ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় মাত্র দশ বছর বয়সী শেখ রাসেলকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মুহূর্তটি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্ণনা দিয়েছিলেন মুহিতুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শেখ কামালকে হত্যার পর হত্যাকারীরা বেপরোয়া গুলি চালিয়ে বাড়ির ওপরের দিকে যাচ্ছিল। ওপরে উঠেই শুরু হয় নির্বিচার হত্যাকা-। চারদিকে তখন শুধু গুলির শব্দ। ওপরে তো তা-বলীলা চলছে। চারদিকে একটা বীভৎস অবস্থা। ঠিক সে মুহূর্তে ওপর থেকে চিৎকার শুরু করল যে পাইছি পাইছি। এর পর বঙ্গবন্ধুর একটা কণ্ঠ শুনলাম। তিনি বললেন, তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস? এর পর ব্রাশফায়ার। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ আমরা আর শুনতে পাইনি।’ ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত অধ্যায় লেখা হলো। সপরিবারে নিহত হলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন তারা শুধু জাতির জনককে হত্যা করেনি, একই সঙ্গে হত্যা করতে চেয়েছিল বাঙালির সংস্কৃতি ও বাংলাদেশকে। তারা বাংলাদেশকে এবং বাঙালির কণ্ঠ রোধ করতে চেয়েছিল। তাদের প্রকৃত লক্ষ ছিল বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করা। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান তৈরি করা। তখন বাঙালি বোঝেনি ‘পিতা’ হারানোর বেদনা এত দুঃসহ হবে। পুরো বাঙালি জাতি যেন পিতৃহীন হয়ে গেল। ওই সময় বিদেশে ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তারা প্রাণে বেঁচে গেলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যায় যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর কাছে আস্থাভাজন ছিলেন। খোন্দকার মোশতাকরা এই আস্থার সুযোগ নিয়েই বেইমানি করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের আকাশ থেকে সবচেয়ে বড় নক্ষত্রটি অকালে বিদায় নিলেন। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার উদারতা, দক্ষতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন। দেশের অভ্যন্তরের শত্রুদের সম্পর্কেও তিনি সচেতন থাকবেনÑ এই প্রত্যাশা করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুব নিকটজনরা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অসচেতন ছিলেন। আমরা আশা করব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই ভুল করবেন না। আমরা চাই মুজিব থেকে যেমন হাসিনা, তেমনি হাসিনা থেকে জয়। বাংলাদেশ এই চক্রে আবর্তিত হোক। বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। কোনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, ইতিহাস বিকৃতকারী যেন আর কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, কোনো অশুভ শক্তি যেন এ দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে সে জন্য আমাদেরও সচেতন থাকতে হবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করলেই বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে।

জয় বাংলা।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত