সার্বজনীন বাঙালি

1360

Published on মার্চ 17, 2019
  • Details Image

এম নজরুল ইসলামঃ

মহাবিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে
নির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা
মৃত্যুরে না করি শঙ্কা।…

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিগুলো যে মহান বাঙালির জীবনে ধ্রুবসত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মৃত্যুকে পরোয়া না করে নির্ভয়ে পথ চলার উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সত্যকে ধারণ করেছিলেন বুকে।

একজন মানুষ যে দেশ ও জাতির সমার্থক শব্দ হয়ে উঠতে পারেন, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেই আমরা পাই, ‘…মানুষ হয়ে জন্মলাভ করে আবার চাইবে কে, বিশ্রাম পাব কোথায়। মুক্তি পেতে হবে, মুক্তি দিতে হবে, এই-যে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, এ কথাগুলো যে মহান বাঙালির জীবনে ধ্রুবসত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তিনি। আমাদের জাতির পিতা। আজ তাঁর জন্মদিন। একটি দেশ, একটি জাতি, একটি পতাকা- এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার নিভৃত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। গ্রামবাংলার সবুজ শ্যামল ও নিবিড় প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন রাজনীতি ও সমাজ সচেতনÑতাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও বিশ্লেষকদের লেখায় এর প্রমাণ আমরা পাই। অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার, প্রতিবাদী। টুঙ্গিপাড়ার খোকা নেতৃত্বের গুণে একদিন হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির প্রতীক। স্কুলজীবনেই অংশ নেন সক্রিয় রাজনীতিতে। কৈশোরেই কারাবাস শুরু। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদান করায় জীবনে প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে খ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা। আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জন এই স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই সংগ্রামে তিনি ছিলেন নেতা। তাঁর নামে পরিচালিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ তো একদিনের ব্যাপার নয়। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে একটি যুদ্ধের জন্য, একটি ভূখন্ডের স্বাধীনতার জন্য, স্বতন্ত্র জাতিসত্তার জন্য তৈরি করতে হয়েছে। প্রয়োজন হয়েছে রাজনৈতিক প্রস্তুতির। জাতিকে তৈরি করতে হয়েছে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ভেতর দিয়ে। বাঙালী জাতি বার বার তার স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছে। আলাদা জাতিসত্তার পরিচয় দিতেও পিছপা হয়নি। যে বাঙালি স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরে নিজেদের মতো করে, সেই বাঙালিকে সংগঠিত রাখার কঠিন কাজটি বঙ্গবন্ধু করেন দক্ষ হাতে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটায়। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা বাঙালির এই বিজয়কে মেনে নিতে না পেরে ৯২-ক ধারা জারি করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারী লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের একটি কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন। ওই ৬ দফা পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। শেখ মুজিবের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে জেনারেল আইয়ুব খান একটার পর একটা মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তানে ৬ দফার পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেই সময় রাজনীতির প্রধান আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ৬ দফা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সঙ্গীদের নামে আইয়ুব খান তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার জেনারেল আইয়ুবের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় গোটা বাঙালি জাতি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত করে আনে। বাঙালি জাতি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে।

এরপর যে ইতিহাস রচিত হলো, সে ইতিহাস সবারই জানা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ার পর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক তিনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদাতা। জাতির আত্মপরিচয় এনে দিয়েছিলেন বলেই জাতির পিতা তিনি।

এই বাংলার শ্যামল প্রান্তরে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর কথায় আশ্চর্য এক জাদু ছিল। আকৃষ্ট করতে পারতেন মানুষকে। ভালবাসতেন দেশের মানুষকে। তাঁর চিন্তা ও চেতনা জুড়ে ছিল বাংলা ও বাঙালি। আজীবন বাঙালির কল্যাণ চিন্তা করেছেন তিনি। বাঙালিকে বিশ্বের একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। জাতিকে তিনি সেই মর্যাদার স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিকে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে স্থির করতে পেরেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বদেশ বিষয়ক নিবন্ধের ভ‚মিকায় লিখেছেন, ‘মানুষের একটা দিক আছে যেখানে বিষয়বুদ্ধি নিয়ে সে সিদ্ধি খোঁজে। সেইখানে আপন ব্যক্তিগত জীবনযাত্রনির্বাহে তার জ্ঞান, তার কর্ম, তার রচনাশক্তি একান্ত ব্যাপৃত। সেখানে সে জীবরূপে বাঁচতে চায়। কিন্তু মানুষের আর-একটা দিক আছে যা এই ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে। সেখানে জীবনযাত্রার আদর্শে যাকে বলি ক্ষতি তাই লাভ, যাকে বলি মৃত্যু সেই অমরতা। সেখানে বর্তমান কালের জন্যে বস্তু-সংগ্রহ করার চেয়ে অনিশ্চিত কালের উদ্দেশে আতœত্যাগ করার মূল্য বেশি। সেখানে জ্ঞান উপস্থিত-প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়, কর্ম স্বার্থের প্রবণতাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপন স্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে যে বড়ো জীবন সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়।’ বঙ্গবন্ধুর জীবনে আমরা মানুষের জীবনের এই দিকটিকে খুঁজে পাই। তিনি ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে। অনিশ্চিত কালের উদ্দেশে তাঁর আত্মত্যাগ। মৃত্যু তাঁকে দিয়েছে অমরতা। এই একই ভ‚মিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরো লিখেছেন, “আমাদের অন্তরে এমন একজন আছেন যিনি মানব অথচ যিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম করে ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট:’। তিনি সর্বজনীন সর্বকালীন মানব।” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই সার্বজনীন ও সর্বকালীন বাঙালি, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যাঁর আকর্ষণে মানুষের চিন্তায় ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব।’

আজও সব সংকটে তিনিই প্রেরণা আমাদের। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণাদাতা, মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন আজ। আজকের দিনে তাঁকে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃত করে,

"কে সে। কে সে। চিনি নাই তারে।
শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর-পানে,
ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাতে, জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে
অন্তর-প্রদীপখানি। শুধু জানি, যে শুনেছে কানে
তাহার আবাহনগীত, ছুটেছে সে নির্ভীক পরানে
সংকট-আবর্ত-মাঝে, দিয়াছে সে সর্ব বিসর্জন,
নির্যাতন লয়েছে যে বক্ষ পাতি; মৃত্যুর গর্জন,
শুনেছে সে সংগীতের মতো।…"

লেখক: সভাপতি, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ। ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত