করোনা সঙ্কটঃ মানবিক এক পুলিশ বাহিনী

249

Published on মে 3, 2020
  • Details Image

রেজা সেলিমঃ

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রতিষ্ঠান পুলিশ বিভাগ করোনা সঙ্কটের শুরুকাল থেকে সশস্ত্র বাহিনীসহ অন্যান্য সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মাঠে ময়দানে জনসাধারণের পাশে থেকে উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালনকারী এই বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যবৃন্দ অকাতরে জীবন দিয়েছেন যা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ও থাকবে। আমরা অনেকেই হয়তো জানি মুজিবনগর সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্র সচিবও ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল খালেক, যাকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম আইজিপি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী ও এর কর্মকর্তাদের দেশ গঠন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে পুলিশকে তৈরি করা হয়েছিল রাজন্য পক্ষের ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে, যার ধারাবাহিকতা ছিল পাকিস্তান আমলেও। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পুলিশ জনগণের পাশে থেকে যুদ্ধ করে সে বিরূপ পরিচয় মুছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানবিক এক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

একটি দেশে পুলিশের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি কাঠামো দিয়ে পরিচালিত হলেও মূলত একজন পুলিশ সদস্য কাজ করেন একজন সমাজকর্মীর মতো। বাংলাদেশে পুলিশের এমন ভূমিকা গৌরবের। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলী ছাড়া পুলিশের মূল অংশ জনসাধারণের পাশে থেকেছে এমন উদাহরণই বেশি। জনগণের পাশে থেকে তাদের বিপদে-আপদে সে নিজেও আক্রান্ত হয়েছে, পরিস্থিতির শিকার হয়েছে এমনকি জীবনও দিয়েছে এমন দৃষ্টান্ত অঢেল। দুর্ভাগ্যবশত সেসবের অনেক বিবরণই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না বা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়।

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের একটি বিপুল অংশ গ্রাম বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবার থেকে আসা। উপরের সদস্যগণ কর্মকমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নানা স্তরে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এই উভয়ের সংমিশ্রণে একটি মানবিক বাহিনী গড়ে উঠেছে। ফলে বন্যা, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নৌডুবি থেকে শুরু করে সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিনির্বাপণ এমনকি ডাকাত দলের আগ্রাসী ভূমিকা থেকে জানমাল রক্ষা, রাজনৈতিক হিংসা ও দলাদলির সহিংস পরিস্থিতির মোকাবেলা সর্বত্রই পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই প্রতিটি পুলিশ সদস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পরিবার বা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা বা বৃদ্ধ বাবা-মা, জড়িয়ে আছে তাদের পারিবারিক সম্মান যার সকল কিছু মনের আড়ালে রেখেই তারা সমাজের শান্তি বজায়ে ত্যাগ স্বীকার করেন।

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর এই ত্যাগ স্বীকারের এক অন্যতম নজির স্থাপিত হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসজনিত সঙ্কটে। আমলাতান্ত্রিক প্রথা ভেঙ্গে পুলিশের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যগণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রীতি সীমানার বাইরেরও একটি জগত থাকে, পুলিশ সে সীমানার প্রান্তে এসে ভুখা নাঙ্গা ও বিব্রত-বিপর্যস্ত মানুষের পরিত্রাণে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। রাতের অন্ধকারে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের বাড়িতে কাঁধে করে খাবার পৌঁছে দেবার কাজ থেকে শুরু করে, চিকিৎসায় হাসপাতালে যাওয়া, জরুরী ওষুধ কিনে এনে লক ডাউনের মধ্যে কারও বাসায় পৌঁছে দেয়া, সন্তান সম্ভবা বিপন্ন মাকে কাঁধে করে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া এসব খবর জেনে যে কোন মানুষের মন উদ্বেলিত হবে সন্দেহ নেই।

সম্প্রতি চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বাড়িতে প্রবেশের বাধা দেয়ার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত ছাড়াই পুলিশ এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এমনও ঘটেছে রাতভর দুর্দশাগ্রস্ত ভিকটিম স্বাস্ব্যকর্মীদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে কোনরকম বল প্রয়োগ না করেই ধৈর্য ধরে বাড়িওয়ালাদের বুঝাতে চেষ্টা করেছে এরকম অন্যায় কাজ থেকে সরে আসতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এতে ফল পাওয়া গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় আইনের প্রয়োগ করতে হয়েছে বটে কিন্তু সর্বসাধারণের স্বার্থে এই আইনসিদ্ধ কাজ প্রশংসিতই হয়েছে বেশি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মানুষ যেন আক্রান্ত না হয় তার জন্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অন্যতম হলো যথাসম্ভব মানুষ যেন ঘরের বাইরে না যায় যার ফলে পারস্পরিক যোগাযোগে সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে কাজ করছে যাতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে ঘরে রাখা যায়। এতে যেসব মানুষের বাইরে যেতে না পারার কারণে দৈনিক আয়ের পথ রুদ্ধ হয়েছে তাদের বাড়িতে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেবার দুরূহ কাজটি একজন সমাজকর্মীর মতো করেই পালন করছে পুলিশের সদস্যগণ। এতে পুলিশের কর্মরত ওই সদস্যের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু কম নয়। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে সে তার বিবেকের দায়মথিত কাজটি করে যাচ্ছে দিবারাত্র। আর এর ফলে দুর্ভাগ্যবশত পুলিশের অনেক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন, এমনকি মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তাদের কাজ একটুও থেমে নেই।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশকে ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে থেকে মানুষের সঙ্গে মিশে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। যে কোন সমাবেশ ও লোকসমাগমে আইনি ব্যবস্থা, অপরাধ দমন, আসামি গ্রেফতার ও আদালতে পাঠানো, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যিক খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরী সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেয়া, দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য নিয়ন্ত্রণ, মজুদদারি ও কালোবাজারি রোধ, সরকারী ত্রাণ ও টিসিবির পণ্য বিতরণে অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়ন, খোলা স্থানে বাজার স্থানান্তর ও ব্যবস্থাপনাসহ নানা কার্যক্রম চালাচ্ছে পুলিশ। সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় জেনে শুনেই এসব কাজ করতে গিয়ে পুলিশের সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। যেহেতু করোনা বিস্তার রোধে পুলিশকে প্রতিটি কাজেই মানুষের খুব কাছে যেতে হয়, মিশতে হয়, তাই নিজের অজান্তেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন পুলিশের সদস্যগণ।

পুলিশ সদর দফতরের শুক্রবারের ব্রিফিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে তারিখ পর্যন্ত পুলিশের ৬৭৭ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন যাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন আছেন ৫২৮ জন। ইতোমধ্যে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের ১২ জনকে আইসিইউ সেবার অধীনে নিতে হয়েছে। তাছাড়া অফিসিয়াল কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১৭৪ জন সদস্য। পুলিশের তথ্যপত্র অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যগণই আক্রান্ত হয়েছেন বেশি যাদের সংখ্যা ৩৫৬। পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের আক্রান্ত সদস্যদের মধ্যে ১৬ জন নারী সদস্যও আছেন। এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, জেলার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এই লেখা লিখবার সময়ে সংবাদ এসেছে আরও একজন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। সব মিলিয়ে পুলিশের মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ। এই সংখ্যা অবশ্যই উদ্বেগজনক কারণ দেশে আক্রান্তের হার ক্রমাগত বাড়ছে। পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে সন্মুখ সারির অন্যতম যোদ্ধা হিসেবে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন প্রশাসন, সেনাবাহিনীর সদস্যগণ, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীবৃন্দ। এদের প্রত্যেকেরই সামাজিক সুরক্ষা বিধানের পাশাপাশি নিজেদের সুরক্ষা নিয়েও সচেতন থাকা দরকার।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যপত্র অনুযায়ী ১ মে পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে ইতোমধ্যে মোট মারা গেছেন ১৭০ জন। মোট শনাক্তের সংখ্যা ৮ হাজার ২৩৮। এই হার ক্রমাগত বেড়ে চলতে থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার এই যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেখানে এই যুদ্ধের প্রথম সারির সৈনিকদের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত পর্যায়ে না থাকলে যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন হবে।

আর এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে আমাদের বা সাধারণ জনগণের দায়িত্বই বেশি। আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে নিজেদের সুরক্ষায় সচেতন থেকে আমাদের সামনের যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করা। পুলিশ বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্য যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে দেশে আমার-আপনার বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা প্রতিটি মানুষের জীবন মূল্যবান। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে শতকরা ৭৫ভাগ মানুষ গ্রামে থাকেন। এই গ্রাম বাংলার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পুলিশ সদস্যগণ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন তাহলে আর অন্য সব পরিবারের মতই তাদের পরিবারেও নেমে আসবে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। আমরা নিশ্চয়ই তা চাইব না। তাই আমাদের সকলের কর্তব্য হবে পুলিশ যেন আমাদের পাশে থেকে তার মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে তার জন্য তাদের সহায়তা করা।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প

প্রকাশঃ দৈনিক জনকণ্ঠ (০৩ মে ২০২০)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত