শ্রদ্ধাঞ্জলি শহিদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল

713

Published on এপ্রিল 29, 2020
  • Details Image

অঞ্জন রায়ঃ

সেই কালরাতে খুন না হলে আজ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার ৬৭তম জন্মবার্ষিকী পালিত হওয়ার সময়ে তিনিও থাকতেন উপস্থিত। তবে এটিও নিশ্চিত—করোনাকালে তিনি সামান্য কোনো আয়োজনও করতে দিতেন না এবারের জন্মদিনের। কিন্তু তার সেই বেঁচে থাকাটাই বাংলাদেশের প্রতিপক্ষের কাছে ছিল হুমকি, যে কারণে ১৫ আগস্ট রাতে তিনিও ছিলেন বুলেটের নিশানা। হ্যাঁ, ২৮ এপ্রিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের জন্মবার্ষিকী। শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই অকুতোভয় মানুষটিকে, যে মানুষটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গৃহবন্দি হন। কিন্তু তিনি সেই অবস্থায় সব পাহারার চোখ এড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কমিশনপ্রাপ্ত কৃতী অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

শহিদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ঢাকার রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছিলেন। পছন্দ ছিল তার সুর; সে কারণেই গিটার শিখতে ভর্তিও হয়েছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানে, ক্রিকেটার হিসেবেও ছিল তার সুনাম। ছিলেন রাজনীতিতে আগ্রহী ও সচেতন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৫ আগস্ট ধানমন্ডির তারকাঁটা দিয়ে ঘিরে রাখা আর পাকিস্তানি বাহিনীর তীক্ষ নজর রাখা বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান শেখ জামাল। ভারতে পৌঁছে আগরতলা থেকে কলকাতা হয়ে শেখ জামাল উত্তর প্রদেশের কালশীতে মুজিব বাহিনীর ৮০ জন নির্বাচিত তরুণের সঙ্গে শেখ জামাল ২১ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

৯ নম্বর সেক্টরে যোগ দিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য। ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শেখ জামাল যে ঘরে থাকতেন, সেখানে রাইফেল কাঁধে শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ছবির দৃঢ়তা আর সাহসে ভরা একজোড়া চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, মানুষটির ভেতরের সাহস আর দেশপ্রেমের উজ্জ্বল সম্মিলন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই যুদ্ধের পোশাকেই শেখ জামাল ঢাকায় ফিরে আসেন স্বাধীনতার দুদিন পরে ১৮ ডিসেম্বর। ভাইকে কাছে পেয়ে বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলের পরম শান্তি, শান্তি বঙ্গমাতার চোখেও। তবে তখনো উদ্বেগ—জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্য। বাড়ি ফিরে সেদিন বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভায় যোগ দেন শেখ জামাল।

শেখ জামাল পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের আশীর্বাদ নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতার মুগ্ধ করে রেখেছিলেন সেখানে সবাইকে। সৈনিক থেকে সিনিয়র অফিসার—সবারই নয়নমণি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা আর অহংকারহীন জীবনযাপনে সবাইকে আপন করে নিতে তার তুলনা মেলা প্রায় অসম্ভব। আর সেই কারণেই তিনি তার পরিচিতদের কাছে হয়ে আছেন ইতিহাসের উজ্জ্বল অংশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হলো বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শিশু রাসেলসহ কেউই সেদিন ঘাতকের বুলেট থেকে রক্ষা পায়নি। পরিবারের সবার সঙ্গে সেই কালরাতে শহিদ হলেন শেখ জামাল। বাঙালির প্রগাঢ় বেদনার মধ্যেও সেই রাতে একটাই সান্ত্বনা— বাংলাদেশের বাইরে থাকাতে ঘাতকের বুলেট স্পর্শ করতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ হাসিনা, শেখ রেহানাকে। পারেনি বলেই বাংলাদেশ অনেক বেপথে ঘুরেও আজ আবার ধাবমান বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার দিকে। দেশটির হাল ধরে আছেন জাতির জনকের সন্তান শেখ হাসিনা।

শহিদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের জীবন দীর্ঘ নয়। ২৮ এপ্রিল ১৯৫৪ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জীবন যখন নির্মাণের ধাপগুলো স্পর্শ করছে, তখনই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। শহিদ শেখ জামাল আছেন বনানী কবরস্থানে—তার পাশেই আছেন স্ত্রী রোজী জামাল—হাতের মেহেদির রং আর রক্তে একাকার হয়ে যিনি শহিদ হয়েছিলেন সেই একই রাতে—একসাথে। ৬৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই শহিদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের প্রতি।

সৌজন্যেঃ দৈনিক ইত্তেফাক (২৮ এপ্রিল ২০২০)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত