কথিত বিপ্লবের নেতা কে, আদর্শ কী? - মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

682

Published on নভেম্বর 7, 2019
  • Details Image

ক্যালেন্ডারের পাতায় আবার আরেকটি ৭ নভেম্বর উপস্থিত। প্রতিবছর এই দিনটি এলেই পত্রিকায় লিখতে হয় এবং তা লেখার জন্য যথেষ্ট সংগত কারণও রয়েছে। তা এই জন্য যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্য যে কলঙ্ক রচিত হয়েছিল তার অভিঘাত থেকে এখনো আমরা মুক্ত হতে পারিনি। শুধু মুক্ত হতে পারিনি তাই নয়, যারা ওই কলঙ্কের পরিণতি থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, তারা গোয়েবলসের মতো এখনো মিথ্যাচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তারা এ দিনটিকে মহিমান্বিত করতে চায় বিপ্লব বলে। কিন্তু এত দিনেও তারা যে মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি সেটি হলো, তাদের এই বিপ্লবের নেতা কে? তার পরিচয় কী, তার ব্যাকগ্রাউন্ড বা ক্রেডেনশিয়াল কী? কী সেই বিপ্লবের আদর্শ, সেটিরও কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেনি।

বাংলাদেশের মানুষ তো বিশ্বের বড় বিপ্লবী নেতাদের চেনে-জানে। লেনিন, ফিডেল কাস্ত্রো, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তাঁদের নীতি-আদর্শের সঙ্গে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের বিপ্লবী আদর্শ, ক্রেডেনশিয়াল ও দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এসব ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ জানে বলেই প্রশ্ন—ওই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের কথিত বিপ্লবের নেতা কে? সুতরাং যেহেতু বাংলাদেশে এখনো কথিত বিপ্লবের মাহাত্ম্য গাওয়ার গোষ্ঠী ও মানুষ রয়েছে, তাই সেদিন ৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল এবং তার পরিণতিতে বাংলাদেশে কী ঘটেছে—তার একটা ছোট বিবরণ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পরে দেশের ভেতরে যে চরম অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়, তা আরো ভয়াবহ রূপ নেয় ৩ নভেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা ক্যু ঘটার পর। এই ৩ নভেম্বর ভোরে খালেদ মোশাররফের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই খন্দকার মোশতাক এবং বঙ্গভবনে অবস্থানরত খুনি মেজরদের হুকুমে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জেলের ভেতরে হত্যা করা হয় চার জাতীয় নেতাকে। ওই সময়ে জেনারেল জিয়া খালেদ মোশাররফের অনুগতদের হাতে বন্দি। এই সুযোগে জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের (অব.) অতি বিপ্লবী আবেগে তাড়িত হয়ে ব্যাপকভিত্তিক প্রস্তুতি ছাড়া অস্থির হয়ে এবং অসংগঠিত অবস্থায় হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে খালেদ মোশাররফকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করার উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় ৭ নভেম্বরের পাল্টা ক্যু।

তাহের হয়তো ভেবেছিলেন, বিপ্লবী কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে জিয়ার সেনাপ্রধানের পদটিকে শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহার করবেন। কিন্তু তাহেরের অস্থিরতাই তাঁর জন্য কাল হয়ে ওঠে। ভাসমান পরিস্থিতিতে চতুর্দিকের সূক্ষ্ম ও সঠিক বিশ্লেষণ এবং তা অনুধাবনে তিনি ব্যর্থ হন। এর জন্য কর্নেল তাহেরকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। প্রহসনের বিচার করে তাহেরের ফাঁসির ব্যবস্থা করেন জেনারেল জিয়া, যেটিকে পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ৭ নভেম্বর সকালে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যখন সাক্ষাৎ ঘটে, তার অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের পরিপূর্ণ কবজায় চলে যান জিয়াউর রহমান। তাহের যখন এটা বুঝেছেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ভীষণ তৎপর হয়ে ওঠে, সেসব তথ্য-কাহিনি এখন বেরিয়ে আসছে বহুবিধ সূত্র থেকে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতের পুনরুত্থানসহ একাত্তরে পাকিস্তানি সহযোগী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের এবং বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিচার বন্ধের আইন সংবিধানে সন্নিবেশিত ও তাদের দূতাবাসে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে বোঝা যায় জিয়া মূলত আইএসআইয়ের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের নিজস্ব এজেন্ডা তো এগুলো হতে পারে না। তাই মানুষের ধারণা, ৭ নভেম্বর সকালবেলায় যখন তাহেরের সঙ্গে জিয়া করমর্দন করেন, তখন ছদ্মবেশে ও অদৃশ্যে জিয়ার কাঁধে ছিল আইএসআইয়ের বন্দুক। শেরেবাংলানগরে ১০ ইস্ট বেঙ্গলের অফিসের ভেতর সকালে নাশতারত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সাহসী সেক্টর কমান্ডার বীর-উত্তম খালেদ মোশাররফ, তাঁর সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা বীরবিক্রম কর্নেল হুদা ও বীর-উত্তম কর্নেল হায়দারকে হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমান প্রায় চার দিন বন্দি ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি টোকাও পড়েনি। ৬ নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতের পরপরই জিয়াউর রহমান মুক্ত হলেন। কিন্তু খালেদ মোশাররফসহ তিনজন সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা নিহত হলেন সকালে নাশতা করার সময়। জিয়াউর রহমান যথেষ্ট সময় হাতে পেয়েও তাঁদের রক্ষা করতে পারলেন না। কেন পারলেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া গেল না। এটাই ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজেডি এবং জাতীয় কলঙ্ক। আর এটাকেই জিয়াউর রহমানের অনুসারীরা বলছেন বিপ্লব। ৪৪ বছর পর সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরও এই জাতীয় কলঙ্ক এবং মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবসকে তারা কেন এখনো বিপ্লব দিবস বলছে তা শুধু তারাই জানে। কিন্তু বেদনা ও দুঃখের বিষয় হলো, এত দিনে জাতীয়, আন্তর্জাতিক গবেষকদের গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে এই দিবসকে গণতন্ত্রের হত্যাকারী সামরিক শাসনের গোড়াপত্তনের দিবস হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার পরও নিরপেক্ষতার নামে আমাদের গণমাধ্যমে তারা বিকৃত এবং অসত্য তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই দোষে শুধু গণমাধ্যমকে দোষী করা যাবে না। এর জন্য যদি কিছুকে দায়ী করতে হয় তাহলে পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিকেই দায়ী করতে হবে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠীর একটি অংশ সুযোগ পেয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাই সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ এবং ৭ নভেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারীদের বর্তমান যে প্রতিভূ—তাদের মধ্যে বড় পার্থক্যটা সহজে ধরতে পারছে না। তবে গত প্রায় এক দশকে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত—এই ১১ বছরে এ দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে সব সত্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে।

৭ নভেম্বরের কথিত বিপ্লবের ধারক-বাহক এবং একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী যুদ্ধাপরাধীরা একসঙ্গে জোট বেঁধে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তখনকার চিত্রটা বাংলাদেশের সব দলিল ও মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রেকর্ডভুক্ত আছে। তখন ক্ষমতার দাপটে যুদ্ধাপরাধীরা বলতে শুরু করল এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এই যুদ্ধাপরাধীরা এবং ৭ নভেম্বরের কথিত বিপ্লবের বাহকরা এখনো শক্ত জোট বন্ধনে আবদ্ধ। তাই লেখার শুরুতে যেমনটি বলেছি—বছর ঘুরে ৭ নভেম্বর এলেই লিখতে হয় এসব ছদ্মবেশী বাংলাদেশবিরোধীদের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য। আগামী দিনে আর কত ৭ নভেম্বরে এমন লেখা লিখতে হবে জানি না। তবে আমি আশাবাদী তার প্রয়োজন হয়তো আর বেশিদিন হবে না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা, বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ৭ নভেম্বরের কথিত বিপ্লবীদের সৃষ্ট পাহাড়সম রাষ্ট্রীয় জঞ্জাল এক এক করে পরিষ্কার করে চলেছেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় এই জঞ্জাল সরানোর গতিকে অবশ্যই তুলনাহীন বলতে হবে। সহজাত কারণেই সাধারণ মানুষ অনেক সময় ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের বড় বড় বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরাজমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় শেখ হাসিনা অসাধ্যকে সাধন করেছেন।

রাষ্ট্রীয় জঞ্জাল পরিষ্কারের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অভিযান শুরু করেছেন। আর তিনি এটা শুরু করেছেন নিজ ঘর অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ভেতরে। এই লেখায় একটু আগেই উল্লেখ করেছি, পঁচাত্তর-পরবর্তী দূষিত রাজনীতির দুর্গন্ধ আওয়ামী লীগের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। চলতি অভিযান যে ক্রমেই বিস্তৃত হবে তার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে দিয়েছেন। ঘর থেকে সেটি রাষ্ট্রের সব সেক্টরে বিস্তৃত হবে এবং বিরোধী দলের যাঁরা দুর্নীতি করেছেন তাঁরাও রক্ষা পাবেন না। বিরোধী দলসহ কেউ কেউ হতাশা ছড়াচ্ছেন এই বলে যে এসব অভিযান সব লোক দেখানো, কয়েক দিন পরই থেমে যাবে। আমি বলব, এ কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা এত দিনেও হয়তো শেখ হাসিনাকে চিনতে পারেননি, আর নয়তো উদ্দেশ্যমূলকভাবে হতাশা ছড়াচ্ছেন, যাতে অভিযানে নিযুক্ত সরকারি সংস্থার মধ্যে হতাশার জন্ম নেয়। ২০১০ সালে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়, তখনো এই চিহ্নিত গোষ্ঠী একই রকম কথা বলেছিল। কিন্তু সেই বিচার এবং আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকর করে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবের মেয়ে। সম্প্রতি তিনি যথার্থই বলেছেন, ভয় কথাটি তাঁর অভিধানে নেই, যেমনটি ছিল না তাঁর পিতার অভিধানে। তাই আশা করি, আগামী অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো আমরা পঁচাত্তর এবং তারপর সংঘটিত সব কলঙ্ক থেকে মুক্ত হব। তবে ইতিহাস রয়ে যাবে।

এখনো যাঁরা ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বলার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে সংগত কারণেই প্রশ্ন, বিপ্লব মানে কি এই যে জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার আইন করে বন্ধ করে দিতে হবে? হত্যাকারীদের উৎসাহিত করতে হবে বড় বড় চাকরির মাধ্যমে পুরস্কৃত করে? ২৩ বছরের সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধানকে রাতারাতি পরিবর্তন করে পরাজিত ও বিতাড়িত পাকিস্তানের আদলে সেই সংবিধানকে সাজাতে হবে? ইতিহাস বিকৃত করে নতুন প্রজন্মকে মিথ্যাচার শেখাতে হবে? পাকিস্তানের সক্রিয় দোসর জামায়াতের মতো যুদ্ধাপরাধীদের স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিতে হবে? এটাই কি বিপ্লব? এটি যিনি করেছেন, তিনিই কি ওই কথিত বিপ্লবের নেতা? আর ওই পাকিস্তানি আদর্শ কি সেই বিপ্লবের আদর্শ?

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত