ইনডেমনিটিঃ একটি কালো আইন - অধ্যাপক মোঃ রশীদুল ইসলাম

1619

Published on সেপ্টেম্বর 28, 2019
  • Details Image

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য এক মহা কলঙ্কের দিন, শোকের দিন। এই দিন বাংলাদেশ তথা স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা মৃত্যুর নেশায় বুঁদ হয়। নির্মমভাবে হত্যা করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদের। এই হায়নাদের থেকে রেহাই পায় নি শিশু রাসেলও। বিদেশে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। এই নির্মম ঘটনা আমরা সবাই জানি।

সেইদিনের মাত্র ৪১ দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হয় “ইনডেমনিটি” বা “দায়মুক্তি” আইন অধ্যাদেশ (যদিও তৎকালীন সাংবিধানিক আইনে প্রেসিডেন্ট কোনো অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা রাখে না) যার মাধমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারতো দূরের কথা, ঐ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার পথও বন্ধ করে দেয়া হয়। এই অধ্যাদেশকে আরো পাকাপোক্ত করার জন্য এবং হত্যাকারীদের চিরতরে বাঁচাতে   ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমান  ঘৃণিত সেই হত্যাকে স্বীকৃতি দেয় ৫ম সংশোধনী এনে এটাকে আইনে রূপান্তর করে।

সেই সময়ের অবৈধ সংসদের সংখ্যা গরিষ্ঠ সাংসদের দাপটে পাশ করা হয় “ইনডেমনিটি” আইন। এই আইনে আরো বৈধতা দেয়া হয় ১৫ আগস্ট,১৯৭৫-৯ এপ্রিল,১৯৭৯সাল পর্যন্তএই প্রায় ৪ বছর ৮ মাসের সংঘটিত সকল অবৈধ হত্যা, গুম ও ক্ষমতার। জাতীয় চার নেতার হত্যা থেকে শুরু করে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা, সেপাহী, আর্মি, নৌ-অফিসারদের হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত হয় স্বজন ও সর্বোপরি সকল বাংলাদেশি। এ দেশের এই চার বছর ১০ মাস ছিল এক অন্ধকার যুগ। একজন মানুষকে খুন করা হবে অথচ তার বিচার চাওয়া যাবে না। পক্ষান্তরে খুনীরা দম্ভভরে খুনের দায় স্বীকার করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদায় ভূষিত হবে কোনো সভ্য দেশে এসব ভাবাই যায় না।

এই ইনডেমনিটির কারণেই রাজাকারের বাংলাদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেল, বাংলার পতাকা ছিনিয়ে নিল, রাজনীতির আসন দখল করল। বাংলাদেশের ইতিহাস পাল্টে দেখা শুরু হল। শুরু হল বিচারহীনতার এক কলংকিত প্রশাসন।

আমরা সবাই জানি আব্রাহাম লিংকন হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় হয়েছিল ৩ মাসের মধ্যে, মহাত্মা গান্ধী হত্যার বিচার সময় নিয়েছিল প্রায় ২ বছর, এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার বিচার হয়েছিল ৪ বছরের মাঝেই। বাঙ্গালী জাতির দূর্ভাগ্য যে জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় পেতে সময় লাগল ৩০ বছর। দোষরদের চক্রান্তের ফলে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় বসতে দেয় নি এই বিচারের ভয়েই।

তবে আশার বিষয় এই যে, ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে সংবিধানের “ইনডেমনিটি” আইন বাতিল করা হয় যা দেশ ও জাতির এক ভয়ংকর কালিমা অপনোদনের দ্বার উন্মোচন করে।

ইনডেমনিটির বিষয়টা এখনও অনেক মানুষের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনেকের কাছেই এখনো অজানা ইতিহাসের এই কালো  অধ্যায়টি। নতুন  প্রজন্মের কাছে  সহজভাবে ইনডেমনিটির বীভৎসতা তুলে ধরার জন্য “ওয়ান বাংলাদেশ” এর আয়োজন করে সারা বাংলাদেশের ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে ২৬ সেপ্টেম্বর,২০১৯  বৃহস্পতিবার বিকাল ৫ টায় নাটক “ইনডেমনিটি” স্বস্ববিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হয় । বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ হলঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ও যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।  

 এখন সময় এসেছে এই জঘন্যতম হত্যার মদদদাতা, পরামর্শকারী এবং সহযোগীদের বিচার করার ।  

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত